বেহাল সরকারি ব্যাংক

Dec 20, 2014 07:33 am



সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের অবস্থা নাজুক। না, হলো না, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের অবস্থা বেশ নাজুক। এই নিবন্ধের শিরোনামটি এভাবে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হয়, ‘নাজুক’ শব্দের জায়গায় ‘বেহাল’ শব্দটি বেশি যথোপযুক্ত হবে। কারণ আর কিছু নয়, রাষ্ট্রীয় খাতের প্রধান কয়েকটি ব্যাংক কয়েক বছর ধরে যেভাবে চলছে তা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে এগুলোকে দেখার কেউ যেন নেই।


রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো কেমন চলছে তা কিছুটা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক এর ওপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদনও তৈরি করে। সেখানে মোটা দাগের ১৬টি অনিয়ম খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো নিয়মনীতির বালাই নেই, ঋণ গ্রহীতার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা যাচাই করা হয়নি, ব্যবসায়ীর ব্যাংকের লেনদেন রয়েছে কি না তাও দেখা হয়নি, এমনকি পর্যাপ্ত জামানত গ্রহণ না করেই ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। শুধু অনুমোদনই করা হয়নি, ঋণের সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে এমনকি নবায়নও করা হয়েছে। আর এসবের বেশির ভাগই করা হয়েছে রাজনৈতিক মদদপুষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সম্মতিতে।


এখানে শেষ নয়, প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাব বইতে বিপুল পরিমাণ হদিসবিহীন ঋণ উদঘাটন করা হয়েছে। ঋণ গ্রহীতার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, লেনদেন ও পর্যাপ্ত জামানত গ্রহণ না করেই ঋণ অনুমোদন, বর্ধিতকরণ ও নবায়ন করা হয়েছে। ঋণ অনুমোদনের বিষয়ে শাখা ও প্রধান কার্যালয় ক্রেডিট কমিটির ঋণপ্রস্তাবে সুস্পষ্ট নেতিবাচক মন্তব্য থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক তা আমলে নেয়া হয়নি। বরং অপরিপালিত বিষয়বলি ভবিষ্যতে পরিপালন করার আশ্বাসে ঋণ অনুমোদন করা হয়।


বিশদ পরিদর্শন প্রতিবেদনে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রমের সমালোচনা করে বলা হয়েছে, ব্যাংকের পর্ষদ কর্তৃক বিশেষ বিবেচনায় প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে গৃহীত জামানতকে অতিমূল্যায়ন করে জামানত বৃদ্ধি করা হয়েছে। ঋণ বিতরণের পর গ্রহীতাকে ইচ্ছৃকতভাবে ঋণের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারে সাহায্য করা হয়। ঋণ অনুমোদনের পর সহায়ক জামানত হিসেবে উল্লেখিত জমি মর্টগেজ না করেই কিংবা আংশিক মর্টগেজ করে ঋণ অনুমোদনপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এবং গ্রাহকের ইচ্ছামাফিক ঋণের জামানত পরিবর্তনও করা হয়েছে। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও ব্যাংকের নিজস্ব ঋণ নীতিমালাও পরিপালন করা হয়নি।


সিএল (শ্রেণীকৃত ঋণ) বিপরীতে বিরূপ শ্রেণীকরণ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রহীতার ঋণ হিসাবে কোনোরূপ ব্যবসায়িক লেনদেন না থাকা সত্ত্বেও এবং নবায়নকালে ঋণ হিসাবে সীমাতিরিক্ত বকেয়া থাকা সত্ত্বেও একের পর এক ঋণ নবায়ন ও বর্ধিতকরণ করা হয়েছে। সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) রিপোর্ট প্রাপ্তির আগেই ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষ সিআইবিতে গ্রাহক খেলাপি থাকা সত্ত্বেও তাকে ঋণ দেয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


প্রতিবেদনে উদাহরণ টেনে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সব নতুন গ্রাহককে ঋণ প্রদান করা হয়েছে তাদের সমসাময়িক সময়েই বেশ বড় অঙ্কের টাকা টিওডি (টেম্পরারি ওভার ড্রাফট) হিসেবেও প্রদান করা হয়েছে। প্রদত্ত টিওডি বেশির ভাগ সময়েই নগদে উত্তোলন করা হয়েছে, যা খুবই সন্দেহজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে শ্রেণীকৃত ঋণ হিসাব অশ্রেণীকৃত হিসেবেও প্রদর্শন করা হয়েছে।
এখানে শেষ নয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের শাখার খোলার জন্য মাত্রাতিরিক্ত আগাম ও অস্বাভাবিক ভাড়া প্রদান করা হয়েছে। এতে করে বিপুল সরকারি অর্থের অপচয় করা হয়। কোনো গ্রাহকের কয়েক বছরের যথাযথ ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই বিপুল ঋণ মঞ্জুর ও বর্ধিতকরণ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এমনকি ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনাও যথাযথভাবে মেনে চলা হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।


রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের কিভাবে প্রশাসন ও রাজনৈতিক মদদে হরিলুট চলছে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই প্রতিবেদনে অনেকটা ফুটে উঠেছে।
এত গেল রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন। এখন দেখব এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কী বলে।


একটি ভয়াবহ তথ্য দিয়েছে ব্যাংকিং বিভাগ। এই বিভাগ বলছে, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক প্রকৃত তথ্য আড়াল করছে। এই ব্যাংকগুলোতে ‘করপোরেট শাসন’-এর কোনো উন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৪৮ শতাংশ রয়েছে রাষ্ট্রীয় ছয় ব্যাংকে। সরকারি ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ঋণ প্রদানেই আগ্রহী বেশি। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে দেয়া ব্যাংকিং বিভাগে এই প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক সম্পর্কে অনেকটা ভয়বাহ তথ্য দেয়া হয়েছে।

 

বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের তৈরি করা এই প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণকে অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে ‘চলতি বছরের ৩০ জুন রাষ্ট্রীয় ছয় ব্যাংকে (সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল) মোট শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৪৮ শতাংশই এই ছয়টি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত রয়েছে।’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘মোট খেলাপি ঋণের ৮০ শতাংশই মন্দ শ্রেণীভুক্ত ঋণ হওয়ায় রক্ষিতব্য প্রভিশনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কি না মূলধনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ’


এখানেই শেষ নয়, রাষ্ট্রীয় এই ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালাও অনেক সময় মেনে চলছে না বলে ব্যাংকিং বিভাগের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন উপেক্ষা করে এই ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের ঋণ প্রদানের সুপারিশ, সিঙ্গেল বোরোয়ার ইক্সপোজার লিমিটের বেশি ঋণ প্রদান এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রুডেনশিয়াল গাইডলাইন না মেনে ঋণ প্রদানের সাধারণ প্রবণতা ব্যাংকগুলোর মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানে যতটুকু আগ্রহ দেখায়, ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ততটুকু আগ্রহ দেখায় না। এ ছাড়াও ঋণের যথাযথ পর্যালোচনা ও গুণগত মান বিবেচনা না করেই বড় ঋণ মঞ্জুর করার প্রবণতাও লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ (এসএমই) প্রদানের চেয়ে বড় ঋণ দেয়ার বেশি আগ্রহী দেখা যায়।’


বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকিং বিভাগের তৈরি করা এই প্রতিবেদনকে ‘টিপস অব আইসবার্গ’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তার নিচে রয়েছে আরো বলা অনিয়ম ও দুর্নীতি। তার প্রমাণ, সোনালী ব্যাংকের ‘হলমার্ক’ কেলেঙ্কারি। বেসিক ব্যাংকের ‘যেমন খুশি তেমন লুটপাট’। জনতা ব্যাংকের ‘বিসমিল্লাহ’ গলদ। এগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের অবস্থা সত্যিই বেহাল। সর্বশেষ পরিসংখ্যান চলতি বছরে ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) সময়ে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫৭ হাজার কোটি টাকা। প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তরই তা আরো বেড়ে যাচ্ছে। এক অর্থনীতিবিদ বলেছেন, অবলোপনকৃত ঋণের হিসাব ধরলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।