নড়বড়ে ভিতের ওপর অর্থনীতি

Jan 28, 2015 06:16 am


সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

একটি নড়বড়ে ভিতের ওপর নতুন বছরে অর্থনীতি যাত্রা শুরু করল। এক দিকে দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিয়োগ নেই, বিদেশী সহায়তাও কমে আসছে। অন্য দিকে রফতানি প্রবৃদ্ধি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। রাজস্ব আয়ও শ্লথ গতিতে চলছে। এরপর আবার ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা। এ পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সরকার প্রক্ষেপিত সাড়ে ৭ ভাগের কাছাকাছি যাওয়া তো দূরের কথা, এটি ছয় শতাংশের ঘরে রাখা যাবে কি না তা নিয়ে এখনই রীতিমতো শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।


এখন পর্যন্ত অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধির চিত্র। চলতি ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) সময়কালে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র এক দশমিক ৫৬ শতাংশ। যা কি না গত পাঁচ বছরের একই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম। গত অর্থবছরে একই সময়ে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরগুলোতে যথাক্রমে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭, ১৪ দশমিক ৭২ এবং ৪১ শতাংশ। বর্তমানে রাজনৈতিক অচলাবস্থা যদি চলতে থাকে তবে এই প্রবৃদ্ধি আর কতখানি গতি পাবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।


এ দিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) তাদের সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে বলেছে, গত বছর প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত মাত্রায় হয়নি। বিনিয়োগও শ্লথ হয়ে গেছে। তবে এ সময় সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি স্থিতিশীলতা লক্ষ করা গেছে। তবে গত বছর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি, রাজস্ব আয় কাক্সিক্ষত মাত্রায় হয়নি। এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৮৫ ভাগ। কিন্তু এরপরও বাস্তবায়নের উৎকর্র্ষতা বাড়েনি, যা কি না একটা দুশ্চিন্তার বিষয়।


চলতি বছরে ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, এ সময় রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে সাড়ে ৯ ভাগ। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে হলে অর্থবছরের বাকি মাসগুলোয় রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হতে হবে গড়ে ৪০ শতাংশ, যা কি না প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। এ বিবেচনায় সিপিডি মনে করে চলতি অর্থবছর শেষে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি থাকবে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।
সিপিডি পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, দেশে ব্যক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিয়োগ হচ্ছে না।

কিন্তু মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৪৩ শতাংশ। এর মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছে শূন্য শুল্কে আমদানি করা পণ্য। এখানে কোনো শুল্কই দিতে হয় না। এ পণ্যগুলো আবার সরাসরি বিনিয়োগের সাথে সঙ্গতিপূর্ণও নয়। পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়কালে ‘বেস মেটাল ও আর্টিক্যালস অব বেস মেটালের’ আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬০০ শতাংশ (৫৯৫%)। গত অর্থবছরে একই সময়ে যা ছিল মাত্র আট শতাংশ (৮%)। একই সময় ইলেকট্রিক্যাল পার্টস আমদানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩৫ শতাংশ (১৩৫%)। গত অর্থবছরে একই সময়ে যা ছিল ৩৩ শতাংশ (৩৩%)। এখানে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না।


আমেরিকান গবেষণা সংস্থার পরিসংখ্যান উল্লেখ করে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ২০১২ সালে দেশ থেকে ১৪০ কোটি ডলার পাচার হয়ে গেছে। এর আগে ভারতীয় পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে বাংলাদেশ থেকে রেমিট্যান্স আকারেই ২০১৩ সালে ভারতে চলে গেছে ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার। আসলে তা রেমিট্যান্স আকারে চলে গেছে কি না এই বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। এ সময় ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এক দিকে দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে, অন্য দিকে তা বিদেশ ঘুরে বেসরকারি খাতে ঋণ দেখিয়ে দেশে নিয়ে আসা হচ্ছে। রফতানি ইনভয়েসের মাধ্যমে ভুয়া মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচার করা হচ্ছে। কোনো কোনো মহল থেকে আবার ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়ার দাবি জানানো হচ্ছে। তারা আবার আফ্রিকাসহ অন্যান্য জায়গায় এখন থেকে মুদ্রা নিয়ে বিনিয়োগও করতে চায়। এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য জরুরি।


সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন নতুন স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। যাকে ‘বাংলা রেট অব গ্রোথ’ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এটি হচ্ছে অনেক বছর ধরে, আমরা প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে রেখেছি। কিন্তু একে যদি ‘সুপার বাংলাদেশ রেট অব গ্রোথ’-এ রূপান্তর করতে হয় তবে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে ৮ থেকে ৯ শতাংশ হারে। আর সেটি তখনই সম্ভব যখন দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হবে জিডিপির ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ। বর্তমানে যা ১৮-১৯ শতাংশে রয়েছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না মূলত তিন কারণে। এক. বিদ্যুৎ, গ্যাস, জমি ও যোগাযোগের মতো প্রচলিত প্রতিবন্ধকতার কারণে। দুই. সংস্কারের অভাব। তিন. রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা।


বিনিয়োগ না হওয়ার বিষয়ে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, বিনিয়োগকারীদের কাছে অর্থ আছে। কিন্তু বিনিয়োগের সহায়ক উপকরণের সমস্যা রয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জমি ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয়নি। এটি বিনিয়োগ না হওয়ার অন্যতম কারণ।


শুধু যে বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে না তাই নয়, একই সাথে সরকারি বিনিয়োগও হচ্ছে না। দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি। চলতি অর্থবছরে এ খাতে সরকার ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ করবে বলে প্রাক্কলন করেছে। কিন্তু অর্থবছরের ছয় মাসে এই বিনিয়োগের চিত্র খুবই হতাশাব্যঞ্জক। এ সময় এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে তাতে বছরের বাদবাকি সময় এই বাস্তবায়ন চিত্র কতখানি হয় তা এখন দেখার বিষয়। আর এডিপি যদি কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাস্তবায়িত না হয় তবে তা দেশের কর্মসংস্থানের ওপর মারাত্নক বিরূপ প্রভাব ফেলবে।