লক্ষ্যহীন অর্থনীতি!

Mar 16, 2015 08:52 am

 


সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

‘২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছি ৭.৩ শতাংশ। আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আমি অনেক বেশি আশাবাদী। ’


গত বছর (২০১৪) জুনে বাজেট বক্তৃতায় দেশের অর্থনীতি নিয়ে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কারণ তখন সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ভালো। আর রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ছিল শান্ত। তার বাজেট বক্তৃতায় তার সুরও লক্ষ করা গেছে, তিনি বলেছেন,‘ নির্বাচনোত্তর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। ফলে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে। দেশের উৎপাদন ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত প্রযুক্তিগত দক্ষতার উন্নয়ন ঘটায় উৎপাদনশীলতাও বাড়ছে। বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলোর মধ্যমেয়াদি দৃশ্যকল্পও নিকট অতীতের তুলনায় অনেক বেশি অনুকূল। কাজেই নিট রফতানি এবং প্রবাস আয় চ্যানেলেও প্রবৃদ্ধির গতি বাড়বে। ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, রফতানি ও আমদানি প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়েছে।’


বাস্তব চিত্র কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। অর্থবছরে ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে অর্থনীতির কোনো খাত থেকেই ভালো সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ছাড়া। এটি ঘটছে দেশে বিনিয়োগ না হওয়ার কারণে রফতানি প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে
ধরা যাক রফতানি বাণিজ্যের কথাই। এ খাতে প্রবৃদ্ধির অবস্থা বেশ খারাপ। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছর জুলাই-জানুয়ারি সাত মাসে রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। গত অর্থবছর একই সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ শতাংশ। মাসিক ভিত্তিতেও রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ শতাংশ। গত বছরের জানুুয়ারিতে যা ছিল ৮ শতাংশ।


ধাক্কা খাচ্ছে রাজস্ব আদায়
সে সময় কিন্তু অবরোধ-হরতালের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু হয়নি। কিন্তু তার পরও জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে রাজস্ব আদায় কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতায় জুলাই-ডিসেম্বর সময়কালে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে আদায় করা সম্ভব হয়েছে ৫৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। এ অর্থবছর এনবিআর আওতায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে এক লাখ ৪৯ হাজার ৭১২০ কোটি টাকা। 


বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘উন্নয়ন সমন্বয়’ বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে তাদের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ৩৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছুতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বর্তমানে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে চলদি অর্থবছরে প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের সাথে লক্ষ্যমাত্রার যে পার্থক্য তা বিগত অর্থবছরগুলোর তুলনায় বৃদ্ধি পাবে। এতে অর্থনীতিতে সরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে সামাজিক খাতে বরাদ্দ কমিয়ে দিতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে ব্যাহত করতে পারে।’ জাতীয় নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার অর্থবছরগুলোতে রাজস্ব আদায়ের সাথে লক্ষ্যমাত্রার পার্থক্যের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দেখায় যে, বর্তমান অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ঐতিহাসিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে প্রাপ্ত বর্তমান অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের সাথে লক্ষ্যমাত্রার সম্ভাব্য পার্থক্য ২৬ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে, যা বাজেট ঘাটতিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপির) ৭ শতাংশে উন্নীত করতে পারে।


বিনিয়োগ নেই, কিন্তু বাড়ছে আমদানি!
দেশে বড় কোনো বিনিয়োগ নেই। সেটি দেশী হোক বা বিদেশীই হোক। তারপরও বেড়ে চলেছে আমদানি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে চলতি অর্থবছরে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। গত অর্থবছরে একই সময়ে যা ছিল ৫দশমিক ৫৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদেরা আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন, দেশে দৃশ্যমান কোনো বড় বিনিয়োগ না হওয়া সত্ত্বেও আমদানি বেড়ে যাওয়ার ঘটনাটি রহস্যময়। আমদানি নামে দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। বিদেশী সংস্থা বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। 


সরকারি বিনিয়োগও শ্লথ
এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিকে সরকারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু তা-ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’ আশঙ্কা প্রকাশ করছে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা সম্ভব না-ও হতে পারে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ধীরগতিকে নির্দেশ করে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দেখায় যে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জুলাই-জানুয়ারি সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয়ের পরিমাণ ২৭৩০৫ কেটি টাকা হয়, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৩২ শতাংশ। 


কমছে রেমিট্যান্স
বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণও কমে আসছে। গত ডিসেম্বর মাসে দেশে রেমিট্যান্স যেখানে এসেছিল ১২৭ কোটি মার্কিন ডলার। সেখানে জানুয়ারি মাসে এসেছে ১২৩ কোটি মার্কিন ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রেমিট্যান্স কমেছে ২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। 


খাদ্যমূল্যস্ফীতিও বাড়ছে
চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় খাদ্যসূচকে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যাচ্ছে। ডিসেম্বর এ খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সেখানে জানুয়ারিতে এসে তা বেড়ে হয় ৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি যে আরো বাড়বে তা নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। 


জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন হচ্ছে না
চলতি অর্থবছরে বাজেটে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু এটি যে অর্জন করা যাচ্ছে না তা অর্থমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে এবার জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে ৬ শতাংশ। অন্য দিকে বিশ্বব্যাংকের হিসাব ৬.২%, আইএমএফ-৬.২%, এবং এডিবির হিসাব-৬.৪%। 


অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু তা কিভাবে তার কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সদ্যঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু তা অর্জন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ শতাংশ। কিন্তু ডিসেম্বর পর্যন্ত তা অর্জন হয়েছে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। বাকি ১ দশমিক ৩ শতাংশ অর্জিত হয়নি। গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল না। তার পরও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।


ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা হরতাল-অবরোধের কারণে তাদের এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই ধাক্কাটি দেশের অর্থনীতি কিভাবে তা এখন দেখার বিষয় বলে মত প্রকাশ করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।


এ দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সদ্যঘোষিত মুদ্রানীতি ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও তা অর্জন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ শতাংশ। কিন্তু ডিসেম্বর পর্যন্ত তা অর্জন হয়েছে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসের জন্য তা বাড়িয়ে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল না। তার পরও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।


পরিশেষে বলা যায়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা না দূরীভূত হওয়া পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি চাকা সঠিক পথে নিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে পরবে।