সাবেক এফবিআই এজেন্ট

May 10, 2015 06:49 am


দুনিয়া জানে আমরা নির্যাতন চালিয়েছি

এফবিআইর সাবেক এজেন্ট আলী সুফান তাদের একজন, যারা সর্বপ্রথম, কিউবা দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত, গুয়ান্তানামো বন্দিশিবিরে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। পরে তিনি গুয়ান্তানামো ছেড়ে চলে যান এবং সিআইএর নির্যাতনপদ্ধতির সমালোচনা করেছেন।


আলী সুফান (৪৩) একজন মার্কিন নাগরিক। তিনি ২০০৫ সাল পর্যন্ত এফবিআইর স্পেশাল এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। এটা ছিল সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় সংস্থাটির প্রয়াসের অংশ। ২০০২ সালের মার্চ মাসে সুফান এবং তার এক সহকর্মী সর্বপ্রথম গুয়ান্তানামোতে সন্ত্রাসে জড়িত বলে সন্দেহভাজন, ব্যক্তিকে জেরা করেছেন। তার নাম আবু জুবাইদাহ। তখন তাকে গণ্য করা হতো আমেরিকার হাতে বন্দী, আলকায়েদার ‘সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ’ সদস্য হিসেবে। সুফানের জন্ম লেবাননে এবং তিনি আরবিভাষী। তিনি জেরার সময়ে প্রয়োজনে আল কুরআনের উদ্ধৃতি দিতে পারতেন। এসব কারণে তিনি ওই বন্দীর আস্থা অর্জনে সক্ষম ছিলেন। জুবাইদাহর কাছ থেকে ব্যাপক তথ্য বের করে আনা সুফানের পক্ষে ছিল সম্ভব। তবুও সিআইএ ঠিক করল, জুবাইদাহ হবে প্রথম বন্দী যার ওপর পরীক্ষা চালানো হবে ‘বর্ধিত জেরার কৌশলে’র। জুবাইদাহকে বাধ্য করা হলো ওয়াটারবোর্ডিংসহ বিভিন্ন ধরনের নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হতে। কমপক্ষে ৮৩ বার তাকে এর সম্মুখীন হতে হয়েছে। জুবাইদাহকে জেলে জেরার সময় সুফানের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে জেমস মিচেলের। সিআইএর জেরা কর্মসূচির যে দুই ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত, এই মিচেল ওদেরই একজন। যা হোক, বন্দীদের ওপর নির্যাতন করার প্রতিবাদে সুফান ২০০২ সালের গ্রীষ্মে গুয়ান্তানামো ত্যাগ করেন। গত ১৫ ডিসেম্বর সংখ্যা SPIEGEL সাময়িকীতে আলী সুফানের এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। এ দিকে এবার বের হয়েছে ‘গুয়ান্তানামো ডায়েরি’। মোহামেদু উলদ স্লাহি এটা লিখেছেন। তিনি গুয়ান্তানামোর প্রথম বন্দী যিনি সেখানে আটক থাকা অবস্থায়ই নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন এবং আজো রয়েছেন বন্দী। এই প্রেক্ষাপটে সুফানের সাক্ষাৎকারটির ইংরেজি ভাষ্য তুলে ধরা হলো। ভাষান্তর করেছেন মীযানুল করীম


স্পিয়েজেল : মি. সুফান, যখন আপনি এফবিআই এজেন্ট ছিলেন, বছরের পর বছর জেরা করে কাটিয়েছেন। গোপন মার্কিন কারাগারগুলোতে নির্যাতনের ওপর আপনি বইও লিখে ফেলেছেন। সিআইএর নির্যাতন প্রসঙ্গে মার্কিন সিনেট গোয়েন্দা কমিটির রিপোর্ট সম্প্রতি বেরিয়েছে। এতে কি আপনার অবাক হওয়ার মতো কিছু আছে?
সুফান : হ্যাঁ, এতে কিছু বিষয় রয়েছে, যা আমার জানা ছিল না। যেমন জুবাইদাহসহ বন্দীদের আমরা একটি বড় ক্যাম্পে রেখেছিলাম মোট ২৬৬ ঘণ্টা। এর মানে ১১ দিনের চেয়েও বেশি। আরো জানতাম না যে, আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন বন্দী (যে তখনকার একমাত্র কয়েদি যার উচ্চমূল্য ছিল) তাকে জেরা করে মূল্যবান তথ্যগুলো জেনে নেয়ার বদলে সর্বমোট ৪৭ দিন ধরে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ করে রাখা হয়েছিল।


স্পিয়েজেল : যদিও মার্কিন গোয়েন্দা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে আপনি কয়েক বছর ধরেই জানেন, তবুও ওই রিপোর্টের বিশদ বিবরণ পড়ে কি চমকে উঠেছেন?
সুফান : এর কোনো কোনো অংশ পড়া আমার জন্য কঠিন ছিল। বিশেষ করে সর্বপ্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ বন্দীকে আমরা জেরা করেছি, সন্ত্রাসের সহযোগী সেই জুবায়দাহকে নির্যাতনের বয়ান পড়া সহজ হয়নি। রিপোর্টটিতে অপেশাদারিত্বের যেসব কাণ্ডকীর্তি তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো অবিশ্বাস্য। এটা সত্যিই চমকে ওঠার মতো। তবে বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। কারণ এই কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ কর্মসূচির ৮০ শতাংশই করানো হয়েছে বাইরের ‘ঠিকাদার’দের দিয়ে। জিজ্ঞাসাবাদের কোনো ‘ক্লু’ তাদের কাছে ছিল না। আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দীদের ছেড়ে দিয়েছিলাম শৌখিন লোকদের হাতে।


স্পিয়েজেল : আপনার কাছে কি এটা নতুন ব্যাপার?
সুফান : না, আগেই জানতাম এ সম্পর্কে। আফসোস, আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ওসব ঠিকাদারের থিওরি শুনতে হয়েছিল। আরো একটি কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো : ৯/১১’র পর আমরা এফবিআই এবং সিআইএর মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করতে চেয়েছি। আমরা চেয়েছিলাম সংস্থা দু’টির মধ্যবর্তী কথিত চীনা দেয়াল ছিঁড়ে ফেলতে। সবচেয়ে বড় কথা, তথ্য সরবরাহের ঘাটতি ৯/১১ সম্ভব করেছিল। অথচ উল্লিখিত রিপোর্টে এর সম্পূর্ণ বিপরীত বক্তব্যই পড়তে হচ্ছে এখন। বলা হচ্ছে, আলকায়েদা বন্দীদের জেরা করা থেকে এফবিআই এবং সামরিক বাহিনীকে দূরে রাখার ইচ্ছা ছিল স্পষ্ট।


স্পিয়েজেল : এসব লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র কি নতুন নতুন শত্রু বানিয়েছে?
সুফান : শত্রু তো শত্রুই। মনে হয় না যে, এর তেমন জোরালো প্রতিবাদ হবে। বিশ্বজুড়ে মানুষ জানত, আমরা কী করছিলাম। দুনিয়া জানে, আমরা নির্যাতন চালিয়েছি। আমাদের দুশমনেরা এর থেকে ফায়দা তুলেছে। ইসলামিক স্টেট, আলকায়েদা কিংবা আল শাবাব যে নামেই হোক, এখন পৃথিবীজুড়ে হাজার হাজার মানুষ ওসামা বিন লাদেনের অনুসারী। আমাদের কৌশল সঠিক ছিল না। মাঝে মাঝে মন্দ কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। আমরা বন্দীদের নিয়ে যা করেছি, এখন আমাদের শত্রুরাও নির্দোষ জিম্মিদের নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটাই করছে। হৃদয় ও মন জয় করতে নেমে আমরা সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ছি। আরব ও মুসলিম বিশ্বের মন এভাবে জয় করা যাবে না। কর্তৃত্ববাদী সরকার ও সন্ত্রাসবাদীদের প্রোপাগান্ডার মোকাবেলাও এভাবে করা সম্ভব নয়।


স্পিয়েজেল : ‘বর্ধিত জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি’ প্রয়োাগ করা হচ্ছে বলে প্রথম কখন বুঝতে পেরেছিলেন?
সুফান : ২০০২ সালের গ্রীষ্মকালে কোনো এক দেশের গোপন বন্দিশালায়। এর নাম আজো প্রকাশ করা সম্ভব নয়, কারণ এ তথ্যটি ঈষধংংরভরবফ যার তাৎপর্য হলো, গোপন। মনস্তত্ত্ববিদ আসার পরই ওই মেথড কার্যকর করার সূচনা। এর আগে আমরা (বন্দীর সাথে) ঘনিষ্ঠতা তৈরি করার ভিত্তিতে গতানুগতিক পদ্ধতিতে জেরা ও জিজ্ঞাসা করতাম। অর্থাৎ প্রথমে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন, এরপর তার মন জয় করা এবং তারপর সে মনের কথা বলে দেবে।


স্পিয়েজেল : সেটা করা হয় কিভাবে?
সুফান : বন্দীদের সাথে এক ধরনের মানসিক খেলা খেলতে হয় যাকে চড়শবৎ মধসব বলা যায় (এটা এক ধরনের তাস খেলা যাতে বাজি ধরা হয়)। তখন বন্দীর সাথে তার ভাষায় কথা বলতে হয়। অবিরাম তুলে ধরতে হয় তার অপরাধের তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ। কিন্তু সিআইএ নিয়োজিত বেসরকারি ঠিকাদারদের কেউ এটা করতে পারেনি। যেমন গুয়ান্তানামোতে আমি জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলাম বিন লাদেনের ড্রাইভার সলিম আহমদ হামদানকে। তাকে চা খাইয়েছি। তাকে সুযোগ দিয়েছি তার স্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলার। এসব ছিল তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতির ফল। তবে ওয়াদা রক্ষা করা হয়নি। জেরার সময় মেঝেতে তার পাশে শুয়ে কথা বলেছি। এটাই ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলার ক্লাসিক নজির।


স্পিয়েজেন : ২০০২ সালে আপনি উঁচুদরের বন্দী, জুবায়দাহকে নিয়ে কাজ করেছেন। তাকে সে বছর মার্চ মাসে পাকিস্তানে আটক করা হয়েছিল। তখন গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তাকে মারাত্মক ক্ষতের যন্ত্রণা সইতে হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের ঘটনাকে তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ একটি বিরাট বিজয় হিসেবে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। জুবাইদাহ প্রথম বন্দী, যার ওপর বর্ধিত জিজ্ঞাসাবাদপদ্ধতি (Enhanced Interrogation Methods) প্রয়োগ করা হয়েছিল।

সুফান : হ্যাঁ, প্রত্যেকেই তখন বেশ উত্তেজনা বোধ করেছে। ওয়াশিংটন থেকে সুস্পষ্ট বার্তা এলো, জুবাইদাহকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। এফবিআইর সহকর্মীদের নিয়ে আমি সবার আগে তার সাথে কথা বলেছিলাম। শুরু থেকেই সে সহযোগিতা করেছে।


স্পিয়েজেল : তার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ থাকার পরও?
সুফান : হ্যাঁ, অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে, পরে তাকে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। অতএব, আমাদের জেরার সময়ে সে মারা যেত না। নিশ্চয়ই এটা ছিল অস্বাভাবিক ব্যাপার। আমরা লড়ছিলাম একজন সন্ত্রাসীকে বাঁচাতে যার ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, আমেরিকানদের খুন করা। কিন্তু যেসব তথ্য জানা আমাদের জন্য জরুরি, সেগুলো তার কাছে ছিল। দিনের পর দিন আমি ও সহকর্মী তার বেডের পাশে বসেছি; তার দেখাশোনা করেছি; তার হাত আমাদের হাতে নিয়ে ধরে রেখেছি। ওর সাথে কথা বলেছি আরবিতে। যখন সে দুর্বলতার দরুন কথাই বলতে পারছিল না, আমরা আরবি বর্ণমালার চার্ট দেখিয়ে কথার কাজ সেরেছি। তখনো সে সহযোগিতা করেছে আমাদের।


স্পিয়েজেল : এ পদ্ধতিতে আপনারা কি দরকারি তথ্য বের করতে পেরেছেন?
সুফান : নিশ্চয়ই। আসলে অনেক আগেই জুবাইদাহর ওপর বিশেষ টেকনিক প্রয়োগ করা হয়েছিল। হাসপাতালের বেডে থাকার সময়ই সে বিভিন্ন তথ্য জানাতে শুরু করেছিল। সেই প্রথম শনাক্ত করেছিল খালিদ শেখ মোহাম্মদকে (ছদ্মনাম মুখতার) এবং বুঝিয়ে বলেছিল ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় খালিদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাকে অন্য একজনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে কিছু ছবি দেখানো হয়েছিল। তখন সে হঠাৎ বলে ওঠে, ওই যে মুখতার। এ ব্যক্তি সে লোক যার পরিকল্পনায় ঘটেছে ৯/১১। জুবায়দাহ সেসব লোকের পরিচয় আমাদের জানিয়েছিল যারা হামলার পেছনে কলকাঠি নেড়েছে। কোনো নির্যাতন, কোনো ওয়াটারবোর্ডিং ছাড়াই সে এসব কথা বলে দিয়েছে। এ জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয়নি।


স্পিয়েজেল : প্রেসিডেন্ট বুশ পরে বলেছেন, ‘বর্ধিত জেরার টেকনিক’ অবলম্বন করায় জুবায়দাহ এসব তথ্য দিয়েছে। সিআইএ আজো একই কথা বলছে।
সুফান : তা সত্য নয়। সিআইএর ঠিকাদাররা (জেরার কাজে নিযুক্ত বাইরের লোকজন) তখনো গোপন কারাগারে আসেনি। নির্যাতন চালিয়ে প্রাসঙ্গিক কোনো গোপন তথ্য জানা সম্ভব হয়েছে বলে আজ পর্যন্ত আমার জানা নেই।


স্পিয়েজেল : হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর জুবাইদাহর ভাগ্যে কী ঘটেছিল?
সুফান : সে হাসপাতালে থাকার সময়ই সিআইএ আমাদের জানিয়ে দেয়, তার ব্যাপারে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হবে। ওকে এখন থেকে কেবল সিআইএর ঠিকাদাররা জেরা করবে। তখন সে রুমে এফবিআইর কেউ থাকবে না। আমরা ইতোমধ্যেই যা কিছু সাফল্য অর্জন করেছিলাম, কৌশলের এই পরিবর্তন ছিল এর সাথে সাংঘার্ষিক। আমরা ঠিকাদারদের সাথে সমঝোতায় আসতে চেয়েছি। কোনো কথাবার্তা ছাড়াই সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। এখন ঠিকাদারের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, জুবায়দাহ এযাবৎ যত তথ্য দিয়েছে, সেগুলো অপ্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো সে তার মনে গোপন রেখেছে।


স্পিয়েজেল : তখন সিআইএর নতুন ঠিকাদার, মনস্তত্ত্ববিদ জেমস মিচেল এই গোপন কারাগারে এলেন। তাই না?
সুফান : হ্যাঁ, যদিও নামটি নিশ্চিত করতে পারছি না। এফবিআইর একজন সাবেক এজেন্ট হিসেবে, গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করতে আমি এখনো বাধ্য। তা ছাড়া সে মনস্তত্ত্ববিদদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে গোপন রয়ে গেছে। এটা অবাস্তব হলেও বাস্তব। আমার বইয়ে এই মনস্তত্ত্ববিদের নাম দিয়েছি বরিস। তাই চলুন, সে নামেই ওকে সম্বোধন করি। জুবায়দাহ হাসপাতাল ত্যাগ করার পর অবিলম্বে বরিস তার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। ওকে নিয়ে যাওয়া হলো এমন একটি রুমে, যা পুরোপুরি সাদা। কোনো জানালা নেই। দিনের আলো ঢোকার নেই কোনো উপায়। কেবল চারটি হ্যালোজেন লাইট আছে সিলিংয়ে। রুমের এক অংশ সাদা পর্দা দিয়ে আলাদা করা হয়েছে সেখানে জেরা করার জন্য। সেখানে যত লোক এসেছে, সবার পোশাক কালো। ইউনিফর্ম, বুট, গ্লাভ, গ্লাস সব কিছুই কালো রঙের। আমাদের জানানো হলো, জুবায়দাহর সাথে কোনো মানুষের সংস্পর্শ থাকবে না, তার সেবাকারী ছাড়া।


স্পিয়েজেল : আপনি কি বরিসের সাথে কথা বলেছিলেন?
সুফান : হ্যাঁ। তিনি আমাকে বলেছিলেন, জুবায়দাহকে সত্যি স্বীকার করতে বাধ্য করব। জেরাকারীকে সে এক ধরনের বিধাতারূপেই দেখা উচিত। তিনি জুবায়দাহর দুর্ভোগ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম। বরিস বললেন, এভাবে এই বন্দীকে ‘সাইজ’ করা যাবে। বরিসের কথা হলো, জুবায়দাহকে বুঝতে হবে যে, সে আমাদেরকে সহযোগিতা করার সুযোগ নষ্ট করে ফেলেছে এবং আমাদের সাথে তার আর খেলার সময় নেই। আমি বরিসকে জানাই যে, জুবায়দাহ এর মধ্যেই তথ্য প্রকাশ করেছে। কিন্তু বরিস আমার এ কথাকে গুরুত্ব দেয়নি।


স্পিয়েজেল : রিপোর্ট অনুসারে, সিআইএ তার জিজ্ঞাসাবাদে নতুন মেথড ২০০২ সালের মধ্য এপ্রিলে কার্যকর করেছি। তখনো কি আপনি ওখানে ছিলেন?
সুফান : রুমটিতে ছিলাম না সেখানে থাকলেও। প্রথমেই ওরা জুবায়দাহকে নগ্ন করল। এটা ছিল তার অবমাননা। বরিসের বক্তব্য ছিল, নিজের পোশাক ফিরে পাওয়ার জন্য সে সহযোগিতা করবে। জুবায়দাহর কানের ওপর জোরে জোরে মিউজিক বাজানো তার কাছে বোমার মতো মনে হচ্ছিল। এই আওয়াজ বন্ধ করতে বলেছিল সে। একই রক সঙ্গীত বাজানো হলো সারা দিন। এমনকি পর্যবেক্ষণ কক্ষেও আমরা এই মিউজিকের তাণ্ডবে অসুস্থ বোধ করছিলাম। এবার বরিসের ফন্দি ছিল, জুবায়দাহকে ঘুমাতে না দেয়া। এতেও সে ব্যর্থ হলো। কারণ জুবায়দাহ তার সাথে সহযোগিতা করার ইচ্ছা করেনি। আমাদের জন্য সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার হলো, এমন সব মেথড বা পদ্ধতির প্রয়োগ দিনের পর দিন আমাদের দেখে যেতে হয়েছিল, যা রুচিশীল কোনো জেরাকারী কখনো বিবেচনা পর্যন্ত করবেন না।


স্পিয়েজেল : আপনি একাই কি তখন এসব কিছু দেখে এমন বোধ করছিলেন?
সুফান : না; আমার সহকর্মীসহ সিআইএর অনেক কর্মকর্তাই একই দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা ল্যাংলিতে অবস্থিত সিআইএ সদর দফতরে যোগাযোগ করেছিলেন এ বিষয়ে নির্দেশনা পাওয়ার জন্য।


স্পিয়েজেল : পরে জুবায়দাহকে আর দেখেছেন কি?
সুফান : হ্যাঁ, তার ব্যাপারে সিআইএর কোনো মেথড কাজে না আসায় আবার আমাদের সুযোগ দেয়া হয় ওর সাথে কথা বলার জন্য। ব্যাপারটা ছিল কঠিন। কী ঘটছিল, তা সে বুঝাতে পারছিল না। আমরাও বুঝতে পারিনি। জুবায়দাহর পরনে কিছুই ছিল না। তাকে একটা তোয়ালে দিলাম, যেন নিজেকে ঢাকতে পারে। বসতে চেয়ার দেয়া হলো। পানি খেতে দিয়েছিলাম। সে আমাদের সাথে কথা বলল। খুলে বলেছিল কিছু কথা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে নাকি ‘নোংরা বোমা’ বানাতে চেয়েছে। ওই দিনের পর ঠিকাদার গোয়েন্দারা তাকে আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিল। গোটা বিষয়টাই হতাশাব্যঞ্জক- শুধু আমাদের জন্য নয়; সেখানে উপস্থিত সিআইএর লোকজনের জন্যও। বারবার আমরা ঊর্ধ্বতনদের কাছে লিখে জানিয়েছি, এভাবে চলতে পারে না। সিনেট রিপোর্টে আমাদের এই প্রতিবাদপত্রগুলো আছে। রিপোর্টে আরো উল্লেখ আছে যে, পরে গোয়েন্দা ঠিকাদাররা জুবায়দাহকে ওয়াটারবোর্ডের নির্যাতন করতে দেখে সিআইএর লোকজনের চোখেও পানি এসেছিল। এতকিছু সত্ত্বেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।


স্পিয়েজেল : কখন আপনি এসব ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
সুফান : মে মাসের শেষ দিকে এফবিআই হেডকোয়ার্টারে ফোনে জানাই ঘুম থেকে বঞ্চিত করে নির্যাতনের কথা। জানিয়েছি সেই বড় বাক্স আর প্রচণ্ড শব্দ করে গান বাজানোর ব্যাপারও। হেডকোয়ার্টার দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দেয় : আমরা এসব কাজে লিপ্ত হই না। ফিরে আসো।’ এ অবস্থায় সম্পূর্ণ হতাশার সাথে আমরা বিমানে যুক্তরাষ্ট্র ফিরি।


স্পিয়েজেল : যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দীকে জেরা করার জন্য সিআইএ বাইরের অযোগ্য মনস্তত্ত্ববিদকে নিয়োগ করেছিল এবং গোয়েন্দা সিস্টেমের সব চেক অ্যান্ড ব্যালান্সই ব্যর্থ হয়েছে। এই বাস্তবতাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
সুফান : গোটা সিআইএ এতে জড়িত নয়। চূড়ান্ত বিচারে, আমি বিশ্বাস করি অল্প কয়েকজনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। রাজনীতি, নিরাপত্তা আর ব্যবসার কারণে তারা এই পথ বেছে নিয়েছিল। আমি যেমন শিউরে উঠেছি, সিআইএর অনেক অফিসারই তেমন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তাদের ব্যাপক অভিযোগের ফলেই ২০০৪-এ তদন্ত হয়েছিল এবং সিআইএর ইন্সপেক্টর জেনারেল জন হেল্জারসন একটি রিপোর্ট দিয়েছিলেন যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


স্পিয়েজেল : কিন্তু আজ পর্যন্ত সিআইএ তার ওসব অপকর্ম থেকে সরে আসেনি। বরং এসব মেথড সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় দরকার বলে সাফাই গেয়ে চলেছে।
সুফান : হ্যাঁ, তারা ওই দু’জন মনস্তত্ত্ববিদকে মাসের পর মাস যাচ্ছেতাই করার সুযোগ দিয়েছিল। এরপরই যে, গোটা ব্যাপারটিকে ব্যর্থ ও বর্বরতা হিসেবে পরিত্যাগ করেছে, তা নয়।
ওই দুই লোক চারটি বছর কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে তাদের জেরা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিল-২০০২ থেকে ’০৬ সাল অবধি। এটা করে এই দুই আদমি ৮০ মিলিয়ন ডলার কামিয়ে নিয়েছে। অবিশ্বাস্য ঘটনা।


স্পিয়েজেল : সিনেট রিপোর্ট থেকে কী উপসংহার টানা যায়?
সুফান : ভালো দিক হচ্ছে, এই রিপোর্ট বাতিল করা যাবে না। এটা রাজনৈতিক প্রতিবেদন নয়। মনে ছাপ ফেলার মতো সত্য ঘটনার বিবরণ এটা। কয়েক লাখ ডকুমেন্ট এবং সিআইএর নথিপত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রিপোর্টের পৃষ্ঠাসংখ্যা ছয় হাজার ৮০০। এতে পাদটিকা আছে ৩৮ হাজার! এটা বিশাল অবদান। এ যাবৎ আমরা এর ৬০০ পৃষ্ঠাও দেখে নিতে পারিনি। অর্থাৎ দশ শতাংশও দেখা হয়নি, এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। তবে জাতি হিসেবে আমরা দেখিয়েছি আমাদের ইতিহাসের এই অন্ধকার দিক ব্যাপকভাবে আলোচিত করতে আমরা প্রস্তুত। দুই দলের ভোটের ফলে এই তদন্ত হয়েছে। দুই দলের ভোটেই রিপোর্টটি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাই এটা শুধু (ডেমোক্র্যাট) সিনেটর ডিয়ানে ফেইনস্টেইনের একার সিদ্ধান্ত নয়। তিনি এবং (রিপাবলিকান) সিনেটর জন ম্যাককেইন, সেই সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যরাও এই সঠিক কাজটি করে বিপুল রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছেন। সে জন্য তাদের ধন্যবাদ দিতে হয়।


স্পিয়েজল : যারা এই নির্যাতন চালিয়েছে এবং যারা এর অনুমোদন দিয়েছে, তাদের কি আদালতে বিচার হওয়া উচিত?
সুফান : বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই অধ্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নয়। যা হোক, জিজ্ঞাসাবাদে এমন পদ্ধতি আর যাতে প্রয়োগ করা না হয়, তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্যই দল নির্বিশেষে আমাদের সবাই রিপোর্টটি গভীরভাবে পড়তে হবে; বিষয়টি সিরিয়াসলি নিতে হবে এবং শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।