বাবা ছেলে এবং মরুর ঈশ্বর

May 14, 2015 08:34 am


মূল : ইবরাহিম আলকোনি
অনুবাদ : ফয়সাল বিন খালিদ


এই বছর ও বারোতে পড়ল। তাই বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন এবার ওকে শিকারে নিয়ে যাবেন। মা একটা রুমাল নিয়ে নানান দোয়াদরুদ ও কুরআনের আয়াত পড়তে পড়তে তার হাঁটুতে বেঁধে দিলেন, ওর মাথায় চুমো খেলেন এবং চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন, বাবা তাকে মুহরির পিঠে জিনের পেছনে বসাচ্ছেন। কালো বিশাল একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন, দুনিয়ার ওপার পর্যন্ত বিস্তৃত মরু শূন্যতা তাদের গিলে ফেলা পর্যন্ত মা চলন্ত মুহরিটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন।



সন্ধ্যা নেমে এলো। বাবা কাঠ এনে আগুন জ্বালালেন। রাতের খাবার জোগাতে বসলেন, আটা গোলালেন এবং কয়লাগুলো সরিয়ে তপ্ত বালুর গর্তে আটাগুলো ঢেলে দিলেন। জ্বলন্ত কয়লার ওপর বসালেন চায়ের কেতলি। উঠে গিয়ে জব-দানাভরা এটা থলে আনতে আনতে বললেন
তোমাকে হরিণ শিকার শেখাব। হরিণ শিকার শিখতে চাও ?
ছেলেটা এতক্ষণ এক মনে বাবার কাণ্ডকারখানা দেখছিল। প্রশ্ন শুনে বলল
জানি না।
উটের সামনে একটা কাপড় বিছিয়ে তাতে থলির অর্ধেক জব ঢেলে দিলেন। উটটা হামলে পড়ে খেতে লাগল।
আগুনের পাশে বসতে বসতে বাবা বললেন
তোমাকে জানতে হবে সত্যিকার পুরুষরা সব সময় জানে তারা কী চায়। তুমি কি হরিণ ভালোবাসো না ?

জানি না। আমি তো কখনো জীবন্ত হরিণ দেখিনি। শুধু একটা জীবন্ত খরগোশ দেখেছিলাম। তোমার মনে আছে সেই ছোট খরগোশটার কথা, যা আমি জুআইফারি উপত্যকা থেকে ধরে এনে ছিলাম, তারপর তা পালিয়ে গেল !
বাবা হাসতে হাসতে বললেন পালানোটাই স্বাভাবিক। হরিণও তাই করে। এ কারণেই তুমি কখনো জীবন্ত হরিণ দেখোনি। আমি আমার গোটা জীবনে একটা হরিণও জীবন্ত ধরতে পারিনি। যদি তুমি কখনো কোনো হরিণ জীবন্ত ধরতেও পার তাহলে এক দিন না এক দিন যে কোনোভাবে তা পালিয়ে যাবে, বা... বা মরে যাবে।
কেন মরে যাবে বাবা ?
কারণ হরিণ মরুভূমি এবং অন্য হরিণদের ছেড়ে মানুষের সাথে একা একা বাঁচতে পারে না। তাই তা পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। না পারলে দুঃখে মরে যায়। এটাই হরিণের স্বভাব। আল্লাহ এভাবে হরিণ সৃষ্টি করেছেন।
ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কী জানি ভাবল, মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল
জানো বাবা হরিণের চোখ দু’টি কিন্তু খুব সুন্দর। তুমি শেষবার যে হরিণটা শিকার করে আনলে আমি তার চোখ দু’টি ভালো করে দেখেছি, খুব সুন্দর বাবা!
বাহ্ ! তার মানে হচ্ছে তুমি হরিণ ভালোবাসো। তুমি যদি ভালো হরিণ শিকারি হতে চাও তাহলে তোমাকে অবশ্যই হরিণ ভালোবাসতে হবে।
কেন বাবা ?
কারণ যে পুরষ হরিণ ভালোবাসে না সে কখনো হরিণ শিকার করতে পারবে না।
কিছুক্ষণ বাবা-ছেলে উভয়ে চুপ করে থাকল। তারপর ছেলেটা বলল
কিন্তু কেন বাবা ?
আমি ঠিক জানি না। কিন্তু আমার মনে আছে তোমার দাদা যখন আমাকে প্রথমবার যুদ্ধে নিয়ে গেলেন, তখন তিনি বলেছিলেন ‘তোমাকে অবশ্যই তোমার শত্র“দের ভালোবাসতে হবে এবং তাদের প্রতি দয়াবান হতে হবে। কারণ তুমি যদি তাদের ভালো না বাস, তাদের প্রতি দয়াবোধ না কর তাহলে তুমি কখনো তাদের বিরুদ্ধে জিততে পারবে না’। সম্ভবত ব্যাপারটাতে গায়েবি কিছু একটা আছে। হরিণের বেলায়ও এই নিয়মটা মানতে হবে।
আবার সংক্ষিপ্ত নীরবতা। নীরবতা ভেঙে ছেলেটা বলল
কিন্তু বাবা হরিণ তো আর শত্র“ না !
তুমি ঠিকই বলেছ এবং এই জন্যই তো তোমাকে হরিণ ভালোবাসতে হবে।
তিনি তপ্ত বালুর নিচ থেকে রুটিগুলো বের করলেন। পানি দিয়ে ধুয়ে কেটে কেটে একটা পশমি থলের ভেতর রাখলেন। এক টুকরো রুটি চিবোতে চিবোতে বললেন আগামীকাল সকালে সফর শুরু করার আগে আমরা বন্দুক ছোড়ার প্রাথমিক কিছু অনুশীলন করব। সুতরাং তোমার তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া উচিত। আমাদের যেতে হবে হামাদা হামরায়। আরো অনেক পথ বাকি।
ছেলেটা প্রতিবাদ করে বলল
ঘুমানোর আগে একটা কেচ্ছাও বললবে না ?
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন
ঠিক আছে। তবে একটাই কিন্তু, মনে থাকে যেন !



বাবা ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠে পড়লেন।
মুহরির দড়ি খুলে দিলেন। উটটা একটা ঘন মরু ঝোপের কাছে গিয়ে পাতা খেতে লাগল। আগুন জ্বালিয়ে চা বানালেন। ছেলেটাকে জাগানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু ও বিড়বিড় করে কী সব বলে আবার নাক ডেকে যেতে লাগল। তিনি চায়ের গ্লাসে পানি নিয়ে ওর মাথায় ঢেলে দিলেন। ছেলেটা লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠে চোখ ডলতে ডলতে প্রতিবাদী সুরে বলল
কিন্তু দুনিয়া তো এখনো অন্ধকার !
তিনি ফেনার তাজপরা চায়ের গ্লাস এবং গত রাতের একটুকরো রুটি তার দিকে এগিয়ে দিয়ে শান্তভাবে বললেন
এখন ফজর। সত্যিকার পুরুষমানুষ ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠে পড়ে। তুমি আর শিশু নেই।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললেন
তোমার অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে, শেষ রাত পর্যন্ত জেগে থেকে কেচ্ছা শোনো এবং সকালে সূর্য ওঠার পর ঘুম থেকে ওঠো। এটা মেয়েমানুষের স্বভাব। পুরুষদের এমন করা উচিত নয়।
তারপর তিনি উঠে গিয়ে একটু দূরে গিয়ে বালুর ওপর একটা লম্বা পাথর বসালেন। ফিরে এসে ছেলেটার হাতে বন্দুক তুলে দিয়ে বললেন
আমাদের হাতে নষ্ট করার মতো সময় এবং অতিরিক্ত গুলি কোনোটাই নেই, সুতরাং প্রথমবারেই লাগাতে হবে।
ছেলেটা আমতা-আমতা করে বলল
কিন্তু পাথরটা তো অনেক দূরে এবং দুনিয়া এখনো অন্ধকার রয়ে গেছে।
অন্ধকারেও কিভাবে লক্ষ্য ভেদ করা যায় তোমাকে তা শিখতে হবে। ফজরের সময়টাই হচ্ছে হরিণ শিকারের সবচেয়ে মোক্ষম সময়। মুখে পানি দিয়ে এসো।
ছেলেটা হাঁটু গেড়ে বসল। বাবা বললেন
তোমাকে সব সময় যে কথাটা বলি সেটা মনে রেখ, তোমার গুলি লক্ষ্যে লাগবেই, সেটা নিশ্চিত হওয়ার আগে ট্রিগার চাপবে না।
ছেলেটা বন্দুক তাক করতে শুরু করল।
বাবা বললেনসাবধান ! কাঁপা যাবে না। হাত স্থির রাখো। ট্রিগার চাপার মুহূর্তে শ্বাস বন্ধ করে ফেলবে ! গর্জে উঠল বন্দুক, অনন্ত মরু গিলে ফেলল আওয়াজটা। পাথরটা অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে তার জায়গাতে। একটা গুলি বৃথা।
বাবা বললেন শেষ মুহূর্তে তোমার হাত কেঁপে গেছে। বাতাসকে দান করার মতো অতিরিক্ত গুলি নেই আমাদের কাছে। শেষবার চেষ্টা করো।
এই ঠাণ্ডা সকালেও ছেলেটার কপাল ঘামে ভরে গেল। পেটে বাট ঠেকিয়ে সে আবার নিশান তাক করল।
মনে রেখো শেষ মুহূর্তে শ্বাস বন্ধ !
গুলির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল এবং পাথরটা দুই ভাগ হয়ে ছিটকে পড়ল।
খুশিতে লাফিয়ে উঠল ছেলেটা।
দেখলে পাথরটাকে দুই ভাগ করে ফেললাম।
ভালো লক্ষণ। যে তার নিশানের পিঠ ভেঙে দিতে পারে সেই প্রকৃত পুরুষ। তার গুলি খুন করবেই, সেটা নিশ্চিত হওয়ার আগে সত্যিকার পুরুষরা গুলি ছোড়েন না হরিণ এবং শত্র“ উভয় ক্ষেত্রেই। আহত হরিণের দৃশ্যটা খুবই করুণ, যেমন তোমার গুলি যদি ঠিক সময় শত্র“র গা ভেদ না করতে পারে তাহলে সে তোমার জন্য অনেক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তারপর তিনি যাত্রার জোগাড় করতে লেগে গেলেন।



হামাদা হামরার নিম্নভূমি দেখা যাচ্ছে। শরৎ শুরু হয়ে গেছে, তারপরও উপত্যকাটা ভরে আছে সবুজ ঘাসে। গত শীতে নাকি এখানে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে। ঢলের উন্মত্ত পানি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে মানুষ ও গোবাদিপশু। ঢলের পানি নাকি পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে উঠে ছিল। গত শীতে এক মুসাফিরের কাছে তিনি খবরটা শুনেছেন। 


তারা রতমগাছ এবং হরিণের পায়ের ছাপেভরা বড় একটা উপত্যকায় রাত কাটাল। ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠে তিনি পাশের উপত্যকায় গেলেন হরিণের খোঁজ নিতে। তার চোখ চকচক করে উঠল, বড় এক পাল হরিণ নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে। তিনি কিছুক্ষণ দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর ফিরে এসে ছেলেটাকে ঘুম থেকে জাগালেন, ঠাণ্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে দিলেন, হাতে বন্দুক তুলে দিয়ে হাত ধরে তাকে নিয়ে গেলেন পাশের উপত্যকায়।


উপত্যকার ওপর ঝুঁকে থাকা টিলাটার ওপর চড়ে ছেলেটা হরিণের পালটা দেখতে পেল। তার জীবনের প্রথম জীবন্ত হরিণ দেখা। চোখ কচলে মুগ্ধ হয়ে সে তাকিয়ে থাকল খোদাতায়ালার এই আজব সৃষ্টির দিকে।
বাবা কনুই দিয়ে তাকে ছোট্ট একটা গুঁতো দিয়ে বললেন
শুরু করো ! সময় নষ্ট কোরো না।
ছেলেটা কিছু বলল না। তাকে কেমন দ্বিধান্বিত দেখাচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে অবশেষে বন্দুকে গুলি ভরতে লাগল।
তোমাকে বার বার যা বলি মনে রেখ সে কথাটা, ট্রিগার চাপার মুহূর্তে...
গর্জে উঠল বন্দুকটা, গুলির শব্দের প্রতিধ্বনি উঠল টিলায় টিলায় এবং ছুটন্ত হরিণের খুরের শব্দে ভরে গেল উপত্যকাটা। বাবা ছুটে নেমে যাচ্ছেন উপত্যকার নিম্নভূমের দিকে, তার হাতে ছুরি, ছেলেটা এখনো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে টিলার ওপর, বুঝতে চেষ্টা করছে কী ঘটল... ফজরের মিহি অন্ধকারে ও দেখতে পেল সুন্দর একটা হরিণ মাটিতে পড়ে ছটফট করছে



রতম পাতার এটা পাটির ওপর রেখে হারিণের খাল ছাড়াতে ছাড়াতে বাবা বললেন
সন্দেহ নেই বিরাট সফলতা। তবে গুলিটা কিন্তু ঠিক জায়গায় লাগেনি। আমি যখন হারিণটাকে গিয়ে ধরলাম তখনো তা পায়ে ভর দিয়ে দৌড়াতে চেষ্টা করছিল।
কিন্তু ফজরের অন্ধকারে তো আমি ভালোভাবে দেখতেই পাইনি !
তাহলে হরিণ যখন বাতাসে তীরের মতো ছুটতে থাকবে তখন তার গায়ে কিভাবে গুলি লাগাবে ? !
সেটাও কি সম্ভব বাবা ?
অবশ্যাই। চেষ্টা অনুশীলন এবং অভিজ্ঞতার দ্বারা সব কিছুই সম্ভব করা যায়।
তার খাল ছাড়ানো শেষ। শুকানোর জন্য তিনি হারিণটাকে ইছেল গাছে ঝুলিয়ে রাখলেন। রতম গাছের একটা লাঠির আগায় কলজে ও নাড়িভুঁড়িগুলো গেথে আগুনে পোড়াতে লাগলেন... এবং তখনই তিনি হিসহিস শব্দটা শুনতে পেলেন। ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন একটা আফঈ (মরু সাপ) তার দিকে ছুটে আসছে। লাঠিটা ধরে থেকেই আরেক হাতে বন্দুক নিয়ে তিনি গুলি ছুড়লেন। ততক্ষণে সাপটাও ঝাঁপ দিয়েছে। তিনি অনুভব করলেন হাতে সূচের মতো কীএকটা ফুটল। তার মানে গুলিটা লাগেনি! অবার গুলি করলেন। সাপটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কিন্তু তার হাত জ্বালা করছে। অর্থাৎ সাপটা তাকে ছোবল মেরেছে।
ছুরি নিয়ে তিনি তাড়াতাড়ি ছোবলের জায়টা কাটতে লাগলেন। গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। ছেলেটা ভয় পেয়ে গেল। ভয়ার্ত স্বরে বললÑ
রক্ত বাবা ! রক্ত .. কী করছ ?
করতেই হবে।
সাপটা কি তোমাকে কেটেছে ?
হ্যাঁ। ভুলটা আমারই। আমি এক হাতে গুলি ছুড়তে গিয়েছিলাম। তাই হাতটা কেঁপে গেছে এবং গুলি লাগেনি। জিনের ওপরের কাপড়টা নিয়ে এসো। কাপড়ের টুকরাটা হাতে নিয়ে বাবা বললেন দেখলে ভুলের মাশুল? প্রথম সুযোগে ঠিক জায়গায় গুলিটা লাগাতে পারিনি, তাই শাপটা আমাকে কাটল।
কাপড়েরর টুকরাটা দিয়ে শক্ত করে হাতটা বাঁধতে লাগলেন, বিষটা যেন কলজে পর্যন্ত না পৌঁছতে পারে। তিনি ভয় গোপন করার কোনো চেষ্টা না করেই বললেন
সব গোছাও, আমাদের এখনই রওনা করতে হবে।



সারা দিন তিনি জিনের ওপর বসে থাকলেন। মধ্যরাতের দিকে ঝিমুনি এলো। কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম গড়াচ্ছে, বিশাল পাগড়িটা ঘামে ভিজে গেছে। তার প্রচণ্ড পানি পিপাসা পেল। পানির গ্যালন নিয়ে ছোট এক ঢোগ পানি খেলেন।
ছেলেটার তন্দ্রা ভেঙে গেল। আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল
কিন্তু তুমি না বললে সাপেকাটা মানুষের পানি খাওয়া উচিত নয় ?
হ্যাঁ, ঠিক। সাপেকাটা ব্যক্তি পানি খেতে পারবে না এবং তাকে ঘুমাতে দেয়া যাবে না।
তারপর যেন লজ্জিত কণ্ঠে বললেন
এক ঢোক মাত্র, পিপাসায় মরে যাচ্ছি !
মনে পড়ল, প্রথমবার যখন তাকে আফঈতে কাটে তখন তিনি ছোট। বাড়ির পাশের উপত্যকায় মেষ চরাচ্ছিলেন। দৌড়ে এসে দাদীকে বললেন। দাদী ছুরি দিয়ে জখমের জায়টা কাটলেন। পাশের কাবিলায় একজন লোক পাঠালেন মোরগ আনতে। তারা জোর করে তাকে মোরগের কাঁচা মগজ খাওয়াল। মোরগের গোশতের এক ধরনের স্যুপ তৈরি করে দিলো, তিনজন পুরুষ পালাক্রমে তার মাথার পাশে সারা রাত জেগে থাকল, তার ঝিমুনি আসার সাথে সাথে তারা মাথা ঝাঁকিয়ে, মুখ চাপড়ে তাকে জাগিয়ে দিত। এভাবে লাগাতার তিন দিন কাটল। এর মাঝে তিনি এক ঢোক পানিও খাননি এবং একবারও ঝিমুতে পারেননি। চতুর্থ দিন জ্বর নেমে গেল এবং তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
কিন্তু আজ এখানে মোরগও নেই এবং তাকে পানি পান আর ঝিমুনি থেকে বিরত রাখার সেসব পুরুষও নেই। জীনের ওপের বসে বসেই দু’বার প্রায় ঘুমিয়ে পড়লেন, বড় এক ঢোক পানি খেলেন। জ্বরটা সারা শরীরে ঘুরছে। বাড়িতে পৌঁছতে এখনো অনেক দেরি। অনেক পথ পড়ে আছে। তিনি জিনের ওপর স্থির হয়ে বসে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। কিন্তু সকালের দিকে ভেঙে পড়লেন। মাটিতে আছড়ে পড়লেন। মুহরিটা থেমে গেল। ছেলেটা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল। তিনি একটা মরু গাছ ধরে দাঁড়াতে চেষ্টা করলেন... কিন্তু এক বিন্দুও শক্তি নেই গায়ে।
ছেলেটা এগিয়ে এসে তাকে ধরতে চাইল। কিন্তু তিনি বললেন
আমকে পানি দাও, পানির গ্যালনাটা নিয়ে এসো!
কিন্তু বাবা তুমি তো বলেছ ...
তিনি কম্পিত স্বরে বললেন
সময় নষ্ট করো না, পানির গ্যালনটা দাও, আমি আর ....
ছেলেটা পানির গ্যালন নিয়ে এলো। তিনি লম্বা কয়েক ঢোক পানি খেলেন
কোনো লাভ নেই, আমাকে এখানেই থেকে যেতে হবে। তুমি বাড়িতে ফিরে যাবে।
ছেলেটা ভয়ার্ত স্বরে বলল
না না আমি একা বাড়ি যাবো না... তুমিও যাবে আমার সাথে...
তোমাকে একাই বাড়ি ফিরতে হবে। তুমি এখন পুরুষ। প্রথম গুলিতেই তুমি হরিণ মেরেছ।
তোমার মাকে বলো তোমার প্রথম গুলিটাই হরিণের গায়ে লেগেছে
তার আওয়াজ জড়িয়ে এলো
সে খুব খুশি হবে, তোমাকে নিয়ে অনেক গর্ব করবে ...
ছেলেটা কাঁদতে লাগল...
 না তুমি আমার সাথে না গেল মা খুশি হবে না... আমরা এক সাথে বাড়ি ফিরব।
অসম্ভব। তোমাকে একাই ফিরতে হবে। তুমি এখন পুরুষ... তোমাকে যা বলেছি সব সময় তা মনে রাখবে গুলিটা লক্ষ্য ভেদ করবে, তা নিশ্চিত হওয়ার আগে কখনো গুলি ছুড়বে না এবং যদি লক্ষ্য ভেদ করতে পারো...
তিনি থেমে গেলেন... আর কথা বলতে পারছেন না... ছেলেটা তাড়াতাড়ি বাক্যটা পূর্ণ করে দিলো
তাহলে গুলিটা যেন খুনি হয়, কিন্তু ...
যাও রওনা হয়ে যাও.. ভয় নেই, মুহরিটা তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে, সে তোমাকে ঠিক পৌঁছে....
তারপর যেন তিনি ধীরে ধীরে ডুবে যেতে লাগলেন।
ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে, তার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়াচ্ছে। হাঁটু গেড়ে বসে ও চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
আমি তোমাকে এখানে একা রেখে যাবো না.. ওঠো বাবা .. চলো বাড়ি যাই ...
সে তাকে জোরে ধাক্কা দিতে লাগল।
আমি তোমাকে রেখে যাবো না... আমরা এক সাথে ফিরব ... আমরা আবার এক সাথে হরিণ শিকারে বের হবো, তুমি আমাকে শেখাবে কিভাবে ছুটন্ত হরিণের গায়ে গুলি লাগতে হয়... আমি কথা দিচ্ছি প্রথম বারেই আমি ছুটন্ত হরিণের গায়ে গুলি লাগাতে পারব বাবা !! ..ওঠো ... ওঠো
কিন্তু কোনো নড়াচড়া নেই। দেহটা স্থির পড়ে আছে।
যখন ভোরের সূর্য উঠছে তখন মুহরিটা সেই বড় উপত্যকাটায় ঢুকল... ছাইরঙা একমাত্র তাঁবুটার দরজায় কালো চাদর গায়ে জড়িয়ে মা দাঁড়িয়ে আছেন।
হাতে মুখ ঢেকে ছেলেটা চিৎকার করে কেঁদে উঠল।

 

ইবরাহিম আলকোনি
বর্তমান আরবি সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিকদের অন্যতম বরং বলা যায় প্রধানতম। সমালোচকরা মনে করেন, নানা কারণে আলকোনি নগিব মাহফুজের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরব ঔপন্যাসিক এবং সম্ভবত আলকোনিই হবেন দ্বিতীয় নোবেল বিজয়ী আরবি লেখক। লিবিয়া, সুজাইজারল্যান্ড, ফরাসি সাহিত্য পুরস্কারসহ তিনি ইউরোপ ও আরব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন।

আলকোনি প্রধানত ঔপন্যাসিক। তবে তিনি প্রচুর ছোটগল্প লিখেছেন। তা ছাড়া ইতিহাস, ভাষা সমালোচনা নিয়েও তার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। ইবরাহিম আলকোনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৭ সালে লিবিয়ার গাদামিছে। গাদামিছে প্রাথামিক পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি রাশিয়া চলে যান এবং গোর্কি ইনস্টিটিউটে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। সে থেকে আলকোনি রাশিয়াতেই আছেন। আলকোনি প্রায় নয়টি ভাষা জানেন এবং ৪০টিরও বেশি ভাষায় তার লেখা অনূদিত হয়েছে।
আলকোনি প্রচুর লেখিছেন এবং এখনো বিরামহীন লিখে যাচ্ছেন। এ নাগাদ তার ৬৫টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোÑ (উপন্যাস) ‘অগ্নি উপাসক’, ‘জাদুকর’, ‘মুখ’ ‘পাথরের রক্ত’ ‘স্বর্ণ রেণু’ ‘রাতের ঘাস’ ‘পুতুল’ ইত্যাদি।
(গল্প) ‘খাঁচা’, ‘রতম বৃক্ষ’ ‘আছমানী স্বপ্নের দেশ’ ‘অগ্নি পূজকের জীবনের কিছু হারানো ঘটনা’ ‘মরু গদ্যের কাব্যলেখা’ ‘এক ঢোক রক্ত’ ইত্যাদি।