ইসলাম সরল ধর্ম এটাকে জটিল করবেন না

May 28, 2015 08:53 am


দীনা নাসার


আল কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘আমি আপনার প্রতি গ্রন্থ নাজিল করেছি; সেটি এমন যে, প্রত্যেক বস্তুর সত্য ও সুস্পষ্ট বর্ণনা; হেদায়াত, রহমত এবং মুসলমানদের জন্য সুসংবাদ (সূরা নাহল, আয়াত ৮৯)।
এটা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে সম্প্রতি পড়া, ফেসবুকের একটি পোস্ট সম্পর্কে। ভাবলাম, এটা কতই না সত্য; আবার ভুলে যাওয়াও সহজ। সমাজকে এমনভাবে তুলে ধরা হয় যে, খুঁজে বের করা হয় সমস্যার জটিল সমাধান। অথচ এর সুরাহা আগে থেকেই আমাদের সামনে করা আছে। বিশেষ করে, মুসলমানদের জন্য এতে শেখার বিষয় রয়েছে।

 

আল্লাহ আপনার জীবন সহজ করতে চান
এই ধর্ম (ইসলাম) সহজ, সুন্দর এবং সোজা কথায় পরিপূর্ণ। তবুও কেন বিভিন্ন বিষয়কে কঠিন করে তুলবেন? আল কুরআনের আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামের অনুসরণ করা সহজ। বরং, ইসলাম আমাদের উৎসাহ দেয় ধর্মীয় ব্যাপারগুলোকে সহজ করে তোলার জন্য। দুর্ভাগ্যের কথা, কিছু মুসলমান এই ভুল ধারণা পোষণ করেন যে, ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে তারা যত কঠোর হবেন, তত বেশি তারা পরহেজগার হতে পারবেন। আমাদের ধর্ম যে শিক্ষা দেয়, এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী ধারণা ওই দৃষ্টিভঙ্গি। ধর্ম সম্পর্কে উপলব্ধির অভাবে এমন ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হয়ে থাকে। তা মাঝে মাঝে কিছু লোককে ধর্ম থেকে সরিয়ে নেয়। কারণ ধর্মকে তাদের কাছে ভুল পন্থায় উপস্থাপন করা হয়।
কিছু ব্যক্তির লক্ষ্য হলো ধর্মকে এর সারবস্তু থেকে বিচ্যুত করা। ধর্মের সাথে তারা কঠিন আচার অনুষ্ঠান, এমনকি কুসংস্কার যোগ করে ধর্ম পালন করা থেকে মানুষকে বিরত রাখে। এসব আচার-প্রথা মানুষকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করেছে।
যা হোক, আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের বক্তব্য এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু হাদিস থেকে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা থাকলে ভালো মুসলমান হওয়া সহজ।


দুনিয়ার এই জীবনে আমাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে। ইহকালীন জীবনে আমরা যে বিশ্বাস পোষণ করি, যে নৈতিকতা অবলম্বন করে থাকি, সে মোতাবেক আল্লাহতায়ালা নির্ধারণ করবেন, আমাদের প্রকৃত জীবন আমরা কোথায় কাটাব জাহান্নাম নাকি জান্নাতে। আমাদের পরীক্ষাটা মোটেও কঠিন নয় : আল্লাহ চান, আমরা এ পৃথিবীতে যেন এমন জীবনযাপন করি যা প্রকৃত সুখ ও শান্তি বয়ে আনবে। সংক্ষেপে বলা যায়, আমাদের জীবন হতে হবে মধ্যপন্থা বা পরিমিতির অনুগামী।

 

চরমের দিকে যাবেন না
এটা জানা কথা যে, রাসূল মুহাম্মদ সা: ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ি বা চরম পন্থাকে সর্বদাই প্রতিরোধ করেছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর রা:-কে এক দিন তিনি বললেন, আমি কি এটা ঠিক শুনেছি যে, তুমি প্রতিদিনই রোজা রাখো এবং সারা রাত সালাত আদায় করো?’ তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ, আল্লাহর রাসূল সা:।’ তখন রাসূল সা: বলেছিলেন, তা কোরো না। রোজা রাখবে। আবার খাওয়াপিনাও করবে। সালাত আদায়ের জন্য দাঁড়াবে; আবার ঘুমাবেও। কারণ তোমার ওপর তোমার দেহের অধিকার আছে; তোমার ওপর তোমার চোখের অধিকার আছে; তোমার স্ত্রীর অধিকার রয়েছে তোমার ওপর; তোমার মেহমানেরও অধিকার আছে তোমার ওপর’ (আল বুখারি, ১২৭)।


এই হাদিস ইঙ্গিত দেয়, আমাদের মনোযোগ দিতে হবে যেসব বাধ্যবাধকতার প্রতি, সেগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর প্রতি, অন্যান্য মানুষের প্রতি এবং নিজেদের প্রতি দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে বৈকি। কুরআন শরীফের অনেক আয়াতে এ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে এবং জানিয়ে দেয়া হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা পরম করুণাময় ও দয়ালু।


(প্রাচীনকালের চীনা দার্শনিক) কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘জীবন প্রকৃতপক্ষে সরল। কিন্তু এটাকে কঠিন করে তোলার ওপর জোর দিই।’ এ কথা বারবার মনে প্রতিধ্বনি তোলে, যখন আমরা জানতে পারি যে, অনেক সময় মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়ে ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে। নানা ধরনের বিধিনিষেধের কড়াকড়ির দরুন তারা ভীত হয়ে পড়েছিল। তখন তারা মনে করেছে, ইসলামের সীমারেখার গণ্ডিতে তারা সুখী হতে পারবে না। এসব ভুল ধারণা দূর করা জরুরি। ভেবে দেখা দরকার, আমাদের প্রচলিত বিশ্বাসের উৎস কী? এটা কি কুরআন-সুন্নাহ থেকে উৎসারিত? নাকি এমন কোনো প্রথা বা রেওয়াজ আমরা অনুসরণ করছি, যার উৎস জানা নেই।
বাস্তবতা হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনিই জানেন, আমাদের জন্য সর্বোত্তম হবে কোন বিষয়। যারা এসব সত্য জানে না, তারা মনে করে, ইসলামের নির্দেশিত সীমারেখা তুলে দিলে আরো সুখী ও আরামদায়ক জীবনের সন্ধান মিলবে। আল্লাহতায়ালা কুরআনে বলেছেন ইহজীবন ও পরজীবন, দুটোরই কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করতে।


এ প্রসঙ্গে জীবন উপভোগ করার বিষয়ের উল্লেখ করতে হয় : আল কুরআনের সূরা আল আরাফের ৩১ ও ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে হে আদম সন্তানেরা! নামাজের সব সময় ও স্থানে তোমার সুন্দর পোশাক পরিধান করো; খাও, পান করো, তবে এসব অতিরিক্ত করে অপচয় ঘটাবে না; কেননা, আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। বলো : কে নিষিদ্ধ করেছে আল্লাহর সুন্দর উপহারগুলো, যেগুলো তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য তৈরি করেছেন এবং পরিষ্কার ও পবিত্র সেসব জিনিস, যা তিনি স্বয়ং তাঁর বান্দাদের জন্য উদ্ভাবন করেছেন।
ইসলামে যেসব বিষয় চর্চা বা প্রতিপালনের সাথে সংশ্লিষ্ট, সেগুলোর ব্যাপারে এই শিক্ষাই আমরা পেয়েছি, যতটা সম্ভব হয় ততটা অনুসরণ করতে হবে সত্যকে। আল্লাহ অঙ্গীকার করেছেন যে, মানুষের কাছে তাঁর প্রত্যাশা সহজ। সে প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে আমাদের উপলব্ধি প্রয়োজন। সে অনুসারে আমাদের জীবনকে সহজ সরল রাখতে হবে।


ইসলামের সুমহান বাণী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে আল কুরআনে মুহাম্মদ সা:-কে উপদেশ দেয়া হয়েছে, ‘এটা আল্লাহর করুণার অংশ যে, আপনি তাদের সাথে সব্যবহার করবেন। আপনি কঠোর বা কঠিন হৃদয় হলে তারা আপনার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে সরে যাবে (সূরা আলে ইমরান)।


এ প্রসঙ্গে আরো বলা প্রয়োজন, রাসূল সা: যখন তাঁর সাহাবিদের পাঠালেন জনগণকে ইসলাম শিক্ষাদানের জন্য, তিনি তাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘দ্বীন বা ধর্মের বিষয়গুলো মানুষের সামনে সহজ করে তুলে ধরো এবং সেগুলোকে কঠিন করে ফেলো না। পরস্পরকে মান্য করো, আর নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করবে না (আল বুখারী)।


মানুষের জন্য যা মেনে চলা সহজ এবং যা নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ হওয়ার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন এই দুয়ের মধ্যে আল্লাহ প্রাকৃতিক ভারসাম্য তৈরি করে দিয়েছেন। এর একটি দৃষ্টান্ত যখন আমরা ‘কোনো পণ্যের দাম বাড়াই’ অর্থাৎ ধর্মের বিভিন্ন ব্যাপারে আরো কঠোরতা অবলম্বন করি, তখন পণ্যের গ্রাহক কমে যাওয়ার মতো ধর্মের দিকে আগ্রহী মানুষও কমে যাবে। অবশ্য আমাদের মনে রাখা চাই, আল্লাহ’র নির্দেশিত পন্থায়ই ইসলামকে সহজভাবে উপস্থাপন ও পালন করতে হবে। এই ‘সহজ’ হওয়ার অর্থ, ঢিলেমি দেয়া হয়।
আমি নিজে এবং সবাইকে স্মরণে রাখতে হবে যে, কোনো কোনো সময়ে শয়তান আমাদেরকে ধর্ম থেকে, আল্লাহতায়ালার আদেশ-নিষেধ থেকে বিচ্যুত করতে অপপ্রয়াস পায়। শয়তান চেষ্টা করে আমাদেরকে অনৈতিক পথে নিতে; এমনকি ঈমান পর্যন্ত নস্যাৎ করতে।
শয়তান আমাদের চিন্তা-চেতনায় ভিত্তিহীন সন্দেহের বীজ বপন করে এবং আমাদের কথা ও কাজের মাধ্যমে আমাদেরকে ইসলাম থেকে সরিয়ে নিতে চেষ্টা চালায়। শয়তান নানা ধরনের ফাঁদ পেতে ইসলামের অনুসরণ করাকে আমাদের জন্য কঠিন করে তোলে। শয়তান আমাদের দুশমন। কুরআনে বর্ণিত আছে তোমরা, যারা ঈমানদার, ইসলামে প্রবেশ করো পরিপূর্ণরূপে। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না; সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু (সূরা বাকারা)।

 

ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম
ইসলামের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। যখনই রাসূল সা:-কে বেছে নিতে হতো দুটো জিনিস বা বিষয়ের মাঝে যে কোনো একটি, সব সময় তিনি বেছে নিতেন সহজটি, যদি না তা নিঃসন্দেহে নিষিদ্ধ কিছু হতো। এটা ইসলামের সৌন্দর্যের একটি নজির এবং আমাদের প্রতি আল্লাহর রহমত বটে।


মানুষের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আমার উপলব্ধি হলো, আমাদের জীবনকে সহজ এবং ‘বস্তুগত বোঝা’ হালকা করে এটা সম্ভব করা যায়। এ জন্য দরকার আমাদের আধ্যাত্মিক ও মানসিক চাহিদার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া। দারিদ্র্য অবলম্বনের কথা বলছি না। বলছি বস্তুগত সম্পদ আহরণের প্রবণতা হ্রাসের পক্ষে। সেটা হবে এই পৃথিবীতে একটি সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ কাজ এবং পরকালের পুঁজিতুল্য ভালো কাজ।


আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন এবং ইসলামের একটি ‘স্তম্ভ’ বা রুকন বাস্তবায়নের উপায় হচ্ছে জাকাত প্রদান করা। এভাবে আমরা তাদের সুখী করতে পারি, যারা আর্থিকভাবে কম সৌভাগ্যবান। আমরা সন্তানদের এ শিক্ষাই দেবো এবং নিজেদের মনে করিয়ে দেবো যে, আমাদের যা আছে, তা থাকার সার্থকতা দান করার মাঝে। আখেরাতে এটা সুফল দেবে।


ব্যক্তিগত অধিকার ও দায়িত্বের মাঝে ভারসাম্য আনতে গিয়ে আমরা দেখি, ইবাদাত-বন্দেগিসহ সবকিছুকে সহজ করাই প্রয়োজন। আমরা যদি চূড়ান্ত গন্তব্য, তথা জান্নাতের দিকে অব্যাহত পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে চাই, তা হলে এটাই আমাদের করণীয়।
মনে রাখতে হবে, আমাদের ভুল হলে অন্যেরা যাতে তা সংশোধন করে দিতে পারেন, সে সুযোগ দিতে হবেই। যা হোক, আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন, কারো সাধ্যাতীত কোনো কিছুর জন্য তিনি কাউকে দায়ী করবেন না। যারা তওবা করে, তাদের ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন।
সৌজন্যে : অন ইসলাম ডট নেট


ভাষান্তর : মীযানুল করীম