বাজেটে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা

Jun 14, 2015 09:06 am


সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

 

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেট বক্তৃতায় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাস চলতি মেয়াদ শেষেই বাংলাদেশের কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ব্যাপক হারে প্রসার ঘটবে, যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে, রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলো যানজটমুক্ত হবে, কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ব্যাপকভাবে প্রসারিত হবে এবং তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। আমরা জানি যে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ছাড়া কোথাও কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় না। তাই ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো আমাদের লক্ষ্য। শিক্ষায় দক্ষতা এবং স্বাস্থ্যসেবা সবাইকে পৌঁছে না দিলে জাতি এগোতে পারে না। সুতরাং এ ক্ষেত্রেও আমাদের অগ্রযাত্রা দ্রুতায়িত করতে হবে।’
আগামী ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী গত ৪ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট ঘোষণা করেন। আশা করতে দোষ নেই, কিন্তু সেই আশা যদি দুরাশার কাছাকাছি চলে যায় তবে সেখানেই বাধে সমস্যা। অনেকের মনেই হতে পারে অর্থমন্ত্রীর এই ‘সাহসী’ আশাবাদ সময় পরিক্রমায় না আবার দুরাশায় পরিণত হয়।
অর্থমন্ত্রী এবারকার বাজেট বক্তৃতার নামকরণ করেছেন, ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ : উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথ রচনা’। এখানে প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক উচ্চ প্রবৃদ্ধিটা আসলে কী? বাংলাদেশের জন্য এই প্রবৃদ্ধি হারটি হচ্ছে ৭ থেকে ৮ শতাংশ, যা দেশটি একবার ছাড়া (২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে সাত দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। কিন্তু সেটির হিসাব নিয়েও তখন বেশ বিতর্ক হয়েছিল) কখনোই অর্জন করতে পারেনি। দুই অর্থবছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা ছিল সাত শতাংশের ওপর। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল সাত দশমিক ২ শতাংশ এবং চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা রয়েছে সাত দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা গেছে এর ধারেকাছেও প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ছয় দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এবং চলতি অর্থবছরে সাত দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ছয় দশমিক ৫১ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও দাতা সংস্থার মধ্যে মোটা দাগের প্রশ্ন রয়েছে। সরকার কিন্তু এ বিষয়টি টের পেয়েছে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয়েছে। আর সেটির হার হচ্ছে সাত শতাংশ। কিন্তু তাও কী অর্জন করা সম্ভব হবে, এটি একটি ‘মিলিয়ন ডলার’ প্রশ্ন।
কারণ সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে যে পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার তা কিন্তু এখন পর্যন্ত হচ্ছে না। এখনো জিডিপির অংশ হিসেবে বিনিয়োগ ২৭-২৮ শতাংশের ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু এটিকে ৩২ শতাংশের ঘরে উত্তীর্ণ করতে না পারলে সাড়ে সাত ভাগ বা আট ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কখনোই সম্ভব নয়।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় প্রবৃদ্ধি না অর্জনের বিষয়টি নির্দ্বিধায় স্বীকারও করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই বিশ্ব অর্থনীতির শ্লথগতি, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ এবং ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের অপর্যাপ্ততার কারণে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে লক্ষ্য অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়নি। রাজস্ব খাতে ‘কর-আধুনিকীকরণ পরিকল্পনা’ এবং বিনিয়োগে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব শুরু হলেও আশানুরূপ গতি পায়নি। অন্য দিকে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আয় বাড়লেও তা ছিল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। অনেকগুলো প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়িত হলেও ভূমি অধিগ্রহণজনিত সমস্যার কারণে কোনো কোনো অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে।
বাজেট অনেক সময় সরকারের রাজনৈতিক দর্শন বলে বিবেচনা করা হয়। বাজেটে সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। কিন্তু এবারকার বাজেটে কিন্তু এই দর্শন বা প্রতিশ্রুতির বেশ খানিকটা ঘাটতি লক্ষ করা গেছে।
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে যা রয়েছে দুই লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। ফলে ব্যয় ও আয়ের ফারাক থাকছে ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা।
বাজেট ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত এই ফারাক মেটানোর জন্য আগামী অর্থবছরে সরকারকে মূল ভরসা করতে হবে তিনটি খাতের ওপর। এগুলো হলো ব্যাংকঋণ, বিদেশী সহায়তা ও সঞ্চয়পত্র। বেসরকারি খাত ঋণ পাক বা না পাক, বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে যা ছিল ৩১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশী ঋণ নেয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩২ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে যা রয়েছে ২৩ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। আর আগামী সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে যা রয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা।
এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যদি প্রত্যাশা অনুুযায়ী বিদেশী সহায়তা না পাওয়া যায়, সেটি খুবই স্বাভাবিক, তখন বাজেট ঘাটতি কিভাবে মোকাবেলা করা হবে। তখন কিন্তু সহজ উপায় হিসেবে সেই ব্যাংকিং খাত বা সঞ্চয়পত্রের ওপরই নির্ভরতা বাড়িয়ে তুলতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা কিন্তু ইতোমধ্যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকিং খাত থেকে যে পরিমাণ (৩৮ হাজার কোটি টাকা) ঋণ নেয়ার টার্গেট নেয়া হয়েছে তা যদি বাস্তবায়ন করা হয় তবে সে ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত কিন্তু ঋণপ্রাপ্তি বঞ্চিত হবে।

 

উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আদায়ে টার্গেট
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন,‘এবারে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হলো দুই লাখ ৮ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা এবং তাতে রাজস্ব বোর্ডের হিস্যা হলো এক লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এই অর্থ আদায় হবে চারটি সূত্রে আয়কর, মূসক, সম্পূরক শুল্ক এবং আমদানি শুল্ক খাতে। বর্তমান বছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই আদায়ের হার হবে ৩০.৬২ শতাংশ বেশি, সত্যিই উচ্চাভিলাষী। কিন্তু গত ছয় বছরে রাজস্ব বোর্ডের জনবল ও দফতর বেড়েছে ব্যাপকভাবে এবং তারা একটি বছরে আদায়ে প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের বেশি করতে সক্ষম হয়েছেন। এবার তাদের চ্যালেঞ্জ হলো ৩০.৬২ শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি। আয়কর বিভাগ এবার ৮৫টি উপজেলায় কাজ করতে পারবেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দক্ষতা অনেক উন্নীত হয়েছে বলে আমার মনে হয়। এখানে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক কার সময় এনবিআর ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল।
একটু পেছন দিকে তাকালে দেখতে পাব সামরিক বাহিনী সমর্থিত ২০০৯ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এটি সম্ভব হয়েছিল। আর তা কেন অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল তা সবাই জানে। কথায় আছে বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস!। এরপর কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১০ শতাংশের ওপরে যায়নি।

 

বাজেটের প্রকৃত আকার কত?
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের প্রকৃত আকার কত? এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এটি কী দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। নাকি দুই লাখ ৯৯ হাজার ৯৬ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটের মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা (জিডিপির ১৭.২ শতাংশ)। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর প্রায় তিন হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ বিবেচনায় নিলে বাজেটের আকার দাঁড়াবে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা’। কেন তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট বলা হলো না। কারণ একটাই বাজেট ঘাটতিকে জিডিপির ৫ শতাংশের ঘরে রাখতেই হবে। বাজেটের আকার তিন লাখ কোটি টাকা দেখানো হলে এই ঘাটতি ৫ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে যেত। চুপি চুপি অনেকে এ ঘটনাটিকে সংখ্যাতত্ত্বের ‘কারসাজি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বাজেট বক্তৃতার শেষে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘শত প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি, বৈরিতা এবং এক ধরনের নির্বোধ দেশশত্রুতার মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সব প্রতিবন্ধকতা তুচ্ছ করে আমাদের কর্মঠ, কষ্টসহিঞ্চু, সাহসী ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা সাধারণ জনগণ তাদের শ্রম, মেধা, প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতা দিয়ে এই অগ্রগতির চাকা সচল রেখেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের এই অগ্রযাত্রা থাকবে নিয়ত সঞ্চরণশীল। আমি বরাবরই এ দেশের অপরিমেয় সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। আবারো পুনরাবৃত্তি করব যে, আমি অশোধনীয় আশাবাদী। আলোকোজ্জ্বল, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই অভিযাত্রায় আসুন দেশের উন্নয়ন ও মঙ্গলের স্বার্থে আমরা সব বিভেদ ভুলে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাই। সব ধরনের অকল্যাণকর ও জনবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকি।’
কিন্তু অর্থমন্ত্রীর কাছে যদি প্রশ্ন করা যায়, তিনি যে ‘সব বিভেদ ভুলে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে’ যাওয়ার কথা বলেছেন, এই বিভেদ ভোলার জন্য তার সরকারের পক্ষ থেকে কি কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভেদ ভোলার জন্য কিন্তু আলাপ-আলোচনার বা সংলাপের প্রয়োজন হয়। প্রয়োজন হয় সরকার ও বিরোধী দলের (বর্তমান সংসদে বিরোধী দল নয়) মধ্য আস্থার সৃষ্টি ও পারস্পরিক বোঝাপড়া। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর সরকার তো স্বীকারই করতে চান না, দেশে কোনো রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে। তাই আলোচনা তো বহুদূর। আর আলোচনাই যদি না হয় তবে বিভেদ ভোলা যাবে কিভাবে। আর সে পর্যায়ে দেশের উন্নয়ন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধিটি কিভাবে কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছবে।