স্বার্থপর

Jun 26, 2015 08:28 am

দীলতাজ রহমান


আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। আমার বাবা সরকারের একজন ডাকসাইটে আমলা। অর্থবিত্ত, ব্যক্তিস্বাধীনতার কখনো কোনো অভাব ছিলো না আমার জীবনে। আমার বাবার একটিমাত্র ভাই ছিলেন। তিনি বহু বছর আগে মারা গেছেন নিঃসন্তান অবস্থায়। সেই সূত্রে আমার বাবা তার পৈতৃক সম্পত্তিরও একচ্ছত্র অধিপতি।


আর সেসব সম্পত্তি তিনি আগলেও রেখেছেন দোর্দণ্ড প্রতাপে। গ্রামের বিশাল বাড়িটিতে এতোদিন পাহারায় নিয়োজিত থেকেছেন আমার চাচার বিধবা স্ত্রী। সেখানে আরো আছে একদঙ্গল চাকর-দাসী, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী, কুকুর-বেড়াল। এদের সবার মধ্যে চাচীআম্মাই ছিলেন সর্বেসর্বা। কিন্তু কস্মিন কালে দামি গাড়িটি হাঁকিয়ে আমরা যখন গ্রামে যাই, আমার বাবা-মায়ের দাপটে বাড়ির মানুষগুলোও কুকুর-বেড়ালে পরিণত হয়ে যায়। বাবা অবশ্য হিসাব-নিকাশের অজুহাতে প্রায় প্রায়ই গ্রামে যান। আমার মায়ের তাতে ভীষণ আপত্তি। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি কম হয় না! কিন্তু আমার কান বাঁচানোর চেষ্টায় দুজনেই যে তটস্থ তা বুঝতে পারি।


যা-ই হোক, আর সবাই কুকুর-বেড়াল হয় হোক, চাচীআম্মার বেড়াল হয়ে যাওয়াটা মনে মনে আমি বরদাশত করতে পারতাম না। কেননা নিজ্ঝুম ওই পুরীটি তিনিই তো সরব রেখেছেন। গ্রামে আমার বাবার শত্রু ছাড়া একজনও মিত্র নেই। সেসব শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে টিমটিমে প্রদীপের মতো চাচীআম্মা যেনো নিজেই জ্বলেছেন আপ্রাণ চেষ্টায়।


বড় রাস্তা থেকে বাড়ি পর্যন্ত বাঁধানো রাস্তা। আমাদের গাড়ি বৃক্ষরাজিতে ঘেরা উঠোনের বিরাট ঘরটির দরজার কাছে গিয়ে থামে। গাড়ির পেছনে পেছনে জোয়ারের মতো ছুটে আসে নানান বয়সী মানুষের ঢল। ছেলে, বুড়ো, কিশোর, যুবক পুরুষ-মহিলা কে না থাকছে তার মধ্যে! বিকেল থেকে অধিক রাত পর্যন্ত আসে বড় বড় মেয়ে, বউ-ঝি, বৃদ্ধরাও। বোঝাই যায়, অশেষ কৌতুহল আর আমাদের গনগনে চুলায় চা নাশতার আয়োজনে সামিল হতেই সারাক্ষণ এদের এমন সরব আগমন। আন্তরিকতার লেশমাত্রও নয়।
এক কাতারে দাঁড়িয়ে এরাই আমার বাবার পিণ্ডি চটকায় জোরেশোরেই। আবার একজনের অগোচরে আরেকজন এসে আমাদেরই চাকর-বাকরের কাছে ফিসফিসিয়ে তার উদ্ধৃতি তুলে দিয়ে যায়। ভাগিস্য সামনে এসে বলার মতো সাহস তাদের কারো নেই। এসবের আঁচ অবশ্য আমার গায়ে ওঠার প্রশ্নই আসে না। আমার বাবা-মায়ের সতর্ক পাহারা এড়িয়ে আমি কোনোদিন ওই মানুষগুলার কাছাকাছি হতে পারিনি। আমি বুঝতে পারি ওদের কাছে আমি ধরাছোঁয়ার বাইরের কেউ। আমাকে দেখতে যেনো ওদের চোখে পলক পড়ে না। আর এমন সব সময় আমার কেমন ফুলপরী ফুলপরী মনে হয় নিজেকে।


আমার মায়ের মেজাজ আমার বাবার থেকে কম নয়। কপাল কুঁচকে রাখতে রাখতে, ভাঁজগুলো স্থায়ী হয়ে গেছে। বাঘের মতো স্বামীকে কথার বাণে তিনি ঝাঁঝরা করেনমুড়িভাজা ঝাঁঝরের মতো। বাবা মাঝে মাঝে চটলেও তাকে আমার মায়ের সামনে ভুলেও মাথা তুলতে দেখিনি। আমার বাবার উত্তরণের উন্মেষটা আমার মায়ের বাবাই যে ঘটিয়েছিলেন! মাথা না তোলার কারণটি বোধহয় এই। প্রচ- দাপুটে ঘরের মেয়ে আমার এই মা, এই উন্নাসিকতায় গিলে খেয়েছে তার সবটুকু কমনীয়তা। কিন্তু গলদটা স্বয়ং বিধাতাই আমূল লেপে দিয়েছেন তার জীবনে।


চাচীআম্মাকে কোনোদিনও দেখিনি ঢাকায় আমাদের এ বাড়িতে আসতে। বাড়ির খবরাখবরের ব্যাপারেও লোকজন এসে আমার বাবার অফিসে যোগাযোগ করে। কতোদিন দেখেছি বাবা ফোন করে আমার মায়ের কাছে তাৎক্ষণিক পরামর্শ চাইছেন। কথাবার্তার ধরনে বোঝা যায় গ্রাম থেকে কোনো ব্যাপারে কেউ এসে সরাসরি আমার বাবার অফিসে উঠেছে। মা অবশ্য ঝামেলার কথা শুনতেও চান না। কিন্তু স্বামীর লাগাম টেনে রাখেন শক্ত হাতে।


বিত্তবান পিতার মেধাহীন সন্তান আমার মা। লেখাপড়ায় খুব বেশি দূর এগোতে পারেননি। শুধু ভালো খেতে-পরতে ভালোবাসেন। নির্ঝঞ্ঝাট, বিলাসী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত তিনি। আর সেই আয়েশী বর্ণনা শোনানোর জন্য তার আছে বিরাট পরিম-লও। বন্ধুর বেশে আসলে তারা এক একজন ঘোর প্রতিদ্বন্ধী! এছাড়া আলাদা করে শনাক্ত করা মতো আর কোনো পরিচিতি তিনি অর্জন করতে পারেননি। যার দরুণ বাড়তি জ্ঞান-গরিমা অর্জনের ধকল আমাকেও পোহাতে হয় না। মা আমাকে পুতুলের মতো সাজাতে ভালোবাসেন বলেই আমি সেজে-গুজে থাকি।


স্কুল-কলেজে, এখনকার প্রতিবেশীদের যতো ছেলেমেয়ের সঙ্গেই ভাব করি না কেন, আমার মা তা নিয়ে কখনো খবরদারি করেন না। কিন্তু আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে আমার মেশাটাই মা সহ্য করতে পারেন না। সেরকম হলে দুপক্ষকেই বিপর্যস্ত করে ছেড়ে দেন। এই বাধাটা টের পেয়েই ইদানিং আত্মীয়-স্বজন, গ্রাম এবং চাচীআম্মার প্রতি টানটি আমার অপতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলো। চাচীআম্মার ¤্রয়িমাণ মুখখানা মেঘ গলানো চাঁদের মতো ফুটি ফুটি করেও স্পষ্ট হয়নি আমার চোখে। কারণ তাকে কখনো ছুঁয়ে দেখা হয়নি আমার। মাকে রাগানোও আমার ধাতে সয় না। এছাড়া সব সময়ই যে মাকে আমার ভালো লাগে তা নয়।


মা এমনিতেই আমাকে কাছে কাছে রাখেন। কিন্তু গ্রামের বাড়িতে গেলে রাতে শিশুর মতো বুকে আগলে রাখেন। বাবা এবং আমার দিকে সমান নজর রাখতে তার তখন দাঁড়িপাল্লার মতো অবস্থা। আর নিজ্ঝুম পুরী আলোকিত করা প্রতিমার মতো চাচীআম্মা হয়ে ওঠেন প্রাণহীন, ফ্যাকাসে, তীরবেঁধা পাখির মতো। যন্ত্রের মতো তিনি তবু আরো তাড়িত হচ্ছেন। চালিত হচ্ছেন কাজের লোকদের সঙ্গে এক কাতারে মিশে গিয়ে।


কতোবারই আমার মনে হয়েছে চাচীআম্মা আমাকে ডাকছেন। তার বোবা আর্তনাদ নিঃশব্দে চৌচির করে দিতো আমার পাঁজর। আকাশে-বাতাসে আমি তার আর্তনাদের প্রতিধ্বনি শুনতে পেতাম। কিন্তু শিশুকাল থেকেই যে আমার হাত ধরে বসে আছেন আমার মা। তিনি আমাকে পঙ্খিরাজে উড়ে চলা রাজকুমারের স্বপ্নে বিভোর করেন। প্রয়োজনে দৈত্যের ভয়ও দেখান। হাঁটা চলার ত্রুটিগুলো খুঁটে খুঁটে মুক্ত হতে শেখান।
যার দরুন আমার অন্তদৃষ্টি কোনোদিন চোখের পাতা ভেদ করতে পারেনি। অজানা আশঙ্কায় ছিন্নভিন্ন আমার মা তার কৌশলি তৎপরতায় আমার সবটুকু মনোযোগ তাই কেবল তার দিকেই নিবিষ্ট করে রাখতে পেরেছেন। সন্তানদরদী উদারচেতা বাবাও আমার চাওয়া-পাওয়াতে কোনোদিনও তারতম্য ঘটতে দেননি। তাই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সন্দেহের মতো কোনো বৈরি বোধই এক ঝাপটা বাতাসের মতো অবকাশ কখনো পায়নি। আমার চেতনার শিখাটিকে গনগনে করে তুলতে।


জীবনে এই প্রথম আমি বাড়িতে মাকে ছাড়া একা। চাচীআম্মার অসুখের খবর শুনে বাবা-মা দু’জনই তাকে দেখতে গেছেন। আমাকে কেনো নেননি তারা? অনার্স ফাইনাল দিলাম। আমার হাতে এখন প্রচুর সময়। এ বয়সে কী এমন অসুখ চাচীআম্মার হতে পারে? চাচীআম্মার বয়য় চল্লিশের কাছাকাছি, যা আমার মায়ের সমান। কী নিটোল স্বাস্থ্য আমার মায়ের। দুধে আলতা গায়ের রং। কিন্তু চাচীআম্মা সারাক্ষণ খাটতে খাটতে শরীরটাকে কালসিটে, শীর্ণকায় করে ফেলেছেন। নিজের দিকে কোনো খেয়াল তার নেই।


চাচা যেহেতু স্ত্রীকে কিছু লিখে দিয়ে যাননি সেহেতু তিনি স্বামীর সম্পত্তির কিঞ্চিৎ যা পেতেন তা আর কতোটুকু? আর আমার বাবার হাত গলিয়ে সেটা বের করে নেয়া সহজ ছিলো না। তা তারই সন্তান হিসেবে আমি হলফ করে বলতে পারি। শুনেছি চাচীআম্মার বনেদী বাবার বাড়ির লোকদের জমিজমা থাকলেও তারা হীনবল। বহু বছর যাবৎ তার বাবা নেই। ভাইয়েরাও যে যার মতো। আর পায়ে অগ্নি-ঘুঙুর বাঁধা থাকলেও এই সোনার খাঁচাটির ওপর চাচীআম্মার টানটি ছিলো অপরিসীম। তাই বুঝি একদ-ও ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকেননি।


চাচীআম্মাকে আমি কোনোদিন হাসতে দেখেনি। তবে আমার চোখে চোখ পড়লে তিনি হাসি দিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইতেন। আমি দৃষ্টি না সরানো পর্যন্ত তিনি তা স্থির করে রাখতেন এটুকু অবশ্য ঘটতো নাগালের বাইরে দূর থেকে। আমার মায়ের স্বপ্নেরও অগোচরে। চাচীআম্মার ব্যর্থ, করুণ চেষ্টাটুকু মনে পড়ে আমার টলায়মান সত্তাটি আরো বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। জানালা খুলে আমি পথের দিকে তাকিয়ে আছি। কার অপেক্ষায় আছি আমি? আমার অভিধানে অপেক্ষা বলে তো কোনো শব্দ নেই! তাহলে?


রিকশা থেকে কে যেনো বাড়ির গেটে নামলো। ঝাপসা মুখখানি চেনা চেনা মনে হতেই দৌড়ে গেলাম। ততোক্ষণে দারোয়ান গেট খুলে দিয়েছে। হোঁচট খেতে খেতে মতি চাচা আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমাকে দেখেই সে ময়লা, জীর্ণ পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বের করে আনলো দুগাছি সোনার চুড়ি, এক ছড়া চেইন, দুটো মাকড়ি। যা আমার স্বল্প শিক্ষিত, আটপৌরে চাচীআম্মা পরে থাকতেন।


মতি চাচা আমাদের বাড়ির ভৃত্য। আমার বাবা-চাচারই বয়সী। আমার দাদা জীবিত থাকতে সে শিশু বয়সে এসে আমাদের সংসারে ঢুকেছিলো। পরে আমার বাবা এবং চাচা মিলে আমাদের বাড়ির পাশের একখ- জমি তাকে লিখে দিয়েছেন। মতি চাচা সপরিবারে সেখানেই থাকে। মতি চাচার বড় ছেলেটিকে বাবা কোথায় যেনো পিয়নের চাকরিতে ঢুকিয়েছেন।


মতি চাচা গহনাগুলো আমার দুই হাতে যেভাবে গুঁজে দিলো, তাতেই দুলে উঠলো আমার পৃথিবী। তখনই কেনো যেনো আমি বুঝতে পারলাম ওই চাচীআম্মাই আমার মা! আর আমার এই মা পরের ধনে গোলা ভরার মতো অন্যের সন্তানে ভরেছেন নিজের শূন্য বুক।


জমাট হৃদয়ের অর্গল ভাঙার আগেই মতি চাচা বলে গেলো ‘আমার আর এখানে থাকা ঠিক হবি না মা! তোমার বাবা জানলি রক্ষে থাকপে না। তোমার বাবা তার মরা ভাইয়ের বিধবা বউকে বিয়ে করে বন্দি করে রেইখেছিলেন শুধু একটি সন্তান আর তার গেরস্থালি আগলে রাখপার জন্যি...।


মুহূর্তে কৃত্রিম জলজে ঘেরা অ্যাকুরিয়ামের রঙিন মাছের মতো মনে হলো নিজেকে। নিয়তি যাকে তার অবিচ্ছিন্ন গতি থেকে তুলে এনেছে কাচের ক্ষুদ্র বলয়ে। যেখান থেকে তার হাহাকার, দীর্ঘশ্বাস কোনোদিনই পৌছবে না সমুদ্রের মহাপ্রাণে। যার পাখনার খর্ব শক্তি ওই স্বচ্ছ আবরনণটুকুতে আপ্রাণচেষ্টায়ও ধরাতে পারবে না এতোটুকু চিড়, সামান্য ক’টি বুদবুদ তৈরি ছাড়া। আমি আমার মায়ের গহনাগুলো বুকে চেপে ধরি।


আমি আমার মায়ের ঘ্রাণ নিতে লম্বা করে দম নিই তাতে। শ্রাবণের আকাশ আমার মায়ের মুখের বিষণœতার মতো মেঘগুলো লুকোতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে যেনো আর লক্ষ্যহীন ভেসে যাওয়া সেই মেঘে চোখ ভাসিয়ে বৃষ্টি ঝরাই আমি। ম্লান সূর্যের মতো আমার মায়ের মুখের এক ঝলক আলোর প্রপাত শুধু খুঁজে নিতে।


নিঃশব্দে সেই অধরা’র উদ্দেশ্যে বলি, আমাকে কাছে টেনে নিতে না পারার ব্যর্থতায় নিজে ভুগে কষ্ট পেয়েছো। অধিকার ঘোষণার সাহস তোমার ছিলো না। নিশ্চয়ই বহুমাত্রিক সংশয়ে বিদীর্ণ হয়েছো তুমি। ব্যর্থতার ভার দুঃসহ হয়ে ওঠায়-ই বুঝি অসময়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে পালালে, আমার সুখটুকু হরণ করে। স্বার্থপর!