আমরা শীতল যুদ্ধের মধ্যেই আছি

Jul 23, 2015 06:35 am

 

সাবেক মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিগনিউ ব্রেজিন্সকির মতে ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিনের বিপক্ষে দাঁড়ানো উচিত পশ্চিমাদের। স্পিগেল অনলাইনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের মূল্যটা খানিক বাড়িয়ে দেয়া উচিত আমাদের।’ ভাষান্তর করেছেন জুলফিকার হায়দার

আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের বহরটা আরেকটু বড় করতে চায় রাশিয়া। আর যুক্তরাষ্ট্র চায় পূর্ব ইউরোপের ন্যাটো সদস্য দেশগুলোতে ভারী অস্ত্রের ঘাঁটি গড়তে। সেই সাথে রাশিয়ার কথিত অস্ত্র হ্রাস চুক্তি খেলাপের জবাবে ইউরোপে পারমাণবিক ক্রুজ মিসাইল মজুদ করাও ওয়াশিংটনের ইচ্ছা। সব মিলিয়ে ইউক্রেন সঙ্কটের ডালপালা যে বেড়েই চলেছে, সেটা এখন পরিষ্কার।
স্পিগেল অনলাইনের সাথে এই নতুন শীতল যুদ্ধ নিয়েই কথা বলেন বিগনিউ ব্রেজিন্সকি। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ৮৭ বছর বয়সী ব্রেজিন্সকি এখন কাজ করেন ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) এর হয়ে।

 

স্পিগেল অনলাইন : জনাব ব্রেজিন্সকি, আমরা কি রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটা নতুন শীতল যুদ্ধের আশঙ্কা দেখতে পাচ্ছি?
ব্রেজিন্সকি : শীতল যুদ্ধের মধ্যেই আছি আমরা। সৌভাগ্যক্রমে এটা আরো উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কাটা বেশ খানিকটা কম।

স্পিগেল অনলাইন : আগের শীতল যুদ্ধটা ৪০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। এবার কি ততটা দীর্ঘ হবে?
ব্রেজিন্সকি : আমার তা মনে হয় না। ঘটনা এখন অনেক দ্রুত ঘটে। বাইরের চাপটার সাথে এখন ভেতরের চাপও বেড়েছে। যদি এটা জারি থাকে আর ইউক্রেনের পতন না হয় তা হলে রাশিয়ার ভেতর থেকেই চাপ সৃষ্টি হবে এটা বদলানোর জন্য। ক্ষমতায় যে-ই থাকুক তাকে বিকল্প ভাবতে হবে। আশার কথা, খুব বেশি দেরি হওয়ার আগেই যে বিকল্প ভাবতে হবে এটা বোঝার মতো বিবেচনা পুতিনের আছে।

স্পিগেল অনলাইন : তিনি কি যথেষ্ট সচেতন?
ব্রেজিন্সকি : বলা কঠিন। আমেরিকায় ‘স্মার্টস’ বলতে যেটা বোঝায় মানে এক ধরনের পরিস্থিতি আঁচ করার ক্ষমতা সেটা তার আছে। তিনি সত্যিকার অর্থেই এখানে দক্ষ। আমি বুঝি না কেন তিনি প্রায় গায়ে পড়ে ৪০ মিলিয়ন জনসংখ্যার একটা প্রতিবেশী দেশের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করছেন। অথচ সাম্প্রতিক সময় বাদ দিলে ওই দেশটি রাশিয়ার প্রতি কখনই বিরূপ ছিল না।

স্পিগেল অনলাইন : আপনার কী মনে হয় পূর্ব ইউরোপ ও বাল্টিক এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভারী অস্ত্রশস্ত্র পাঠানো সঠিক হচ্ছে?
ব্রেজিন্সকি : আপনার কী মনে হয় একটা স্বাধীন দেশে সেনা ও অস্ত্র পাঠানো, সেখানকার একাংশ দখলের পর সীমিত পরিসরে যুদ্ধ শুরু করা এগুলো কতটা সঠিক?

স্পিগেল অনলাইন : আপনি ইউক্রেনে রাশিয়ার তৎপরতার কথা বলছেন...
ব্রেজিন্সকি : আপনাকে দুটো দিকই দেখতে হবে। এটা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ব্যাপার। এ যুক্তি মানতে আমি রাজি নই যে, আমরা যদি অন্যপক্ষের তৎপরতার বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া দেখায় তাহলে যুদ্ধে উসকানি দেয়ার দায়টা আমাদের। দায়টা বরং ওই পক্ষের। আমরা এটা না করলেই বরং যুদ্ধের আশঙ্কাটা আরো বাড়ে।

স্পিগেল অনলাইন : কিন্তু ন্যাটো কি পুতিনের পশ্চিমাবিরোধী অপপ্রচারের তালে নাচছে না?
ব্রেজিন্সকি : আপনি কি বলতে চাচ্ছেন কোনো সদস্য দেশের অভ্যন্তরে ন্যাটোর সেনা মোতায়েনের অধিকার নেই যখন আশপাশেই বিপদের সমূহ আশঙ্কা বিরাজমান?

স্পিগেল অনলাইন : প্রশ্ন হলো এ সিদ্ধান্তটা কতটা রাজনৈতিকভাবে সঠিক হচ্ছে যেখানে এই কারণ দেখিয়ে দেশের ভেতরে সমর্থন পাচ্ছেন পুতিন?
ব্রেজিন্সকি : হিটলার যখন সাডিটেনল্যান্ডে বা অস্ট্রিয়ার অশলাসে অভিযান চালান, তখনো ঠিক এই প্রশ্নটাই করা যেত।

স্পিগেল অনলাইন : আপনি কি পুতিনকে হিটলারের সাথে তুলনা করছেন?
ব্রেজিন্সকি : আমার মনে হয় কিছু মিল আছে। কিছু পার্থক্যও আছে অবশ্য। হিটলারের কখনই ব্যক্তিগতভাবে বিপুল সম্পদ গড়ার খায়েশ ছিল না। পুতিনের বিত্ত গড়ার একটা আগ্রহ আছে। এতে জীবনের আলাদা একটা মাত্রা হয়তো যোগ হয়েছে যেখানে মানুষের আবেগগুলো শান্ত হয়। কিন্তু বিপজ্জনক ব্যাপারটা হলো তিনি একজন জুয়াড়ি।

স্পিগেল অনলাইন : ধরে নেয়া যাক রাশিয়া বাল্টিক এলাকায় হামলা করল। ন্যাটো কি যুদ্ধে নামবে?
ব্রেজিন্সকি : যদি হামলা হয়, তাহলে অবশ্যই যাবে ন্যাটো। ন্যাটো গঠনের উদ্দেশ্যই সেটা, তাই নয় কি? বিশ্বকে আমরা বলতে পারি না : ‘আমরা আসলে যেটা বলেছি সেটা বোঝাতে চাইনি। যদি আপনি কিছু করেন, আমরা কিছুই করব না’। সেটা হবে অনেকটা বাইরে যাওয়ার সময় ঘরের দরজায় লিখে রাখা : ‘বাইরে যাচ্ছি। দরজায় তালা দেয়া নেই’। আপনার কি এই নিরাপত্তা কৌশলটাকে স্মার্ট বলবেন?

স্পিগেল অনলাইন : পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে ৫৮ শতাংশ জার্মান নাগরিক মনে করেন না কোনো ন্যাটো দেশ রাশিয়ার হামলার শিকার হলে সেখানে জার্মানির সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা উচিত।
ব্রেজিন্সকি : দেখেছি আমি জরিপটা। প্রশ্ন হলো কত শতাংশ জার্মান নাগরিক মনে করবে যে জার্মানি যদি হামলার শিকার হয়, তাহলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের এগিয়ে আসা উচিত হবে না?
স্পিগেল অনলাইন : সম্ভবত সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ চাইবে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করুক।
ব্রেজিন্সকি : অবশ্যই চাইবে। সেটাই মানুষের প্রকৃতি। সেজন্যই এসব জরিপ নিয়ে আমি খুব বেশি চিন্তিত নই। কারণ পরিস্থিতির সাথে সাথে মানুষের প্রকৃতি বদলায়। লিথুয়ানিয়া ছোট্ট দেশ। দেখুন তারা ঘোষণা দিয়েছে নিজেদের আত্মরক্ষা করবে। তাদের দেখে জার্মানির লজ্জা পাওয়া উচিত। সত্যি কথা হলো, আমি মনে করি জার্মানি যুদ্ধ করবে। মার্কেল লড়াই করবেন। আর প্রতিপক্ষও লড়াই করবে।

স্পিগেল অনলাইন : ইউক্রেনের সঙ্ঘাতে জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেলকে নেতৃত্বে পাঠিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এটা কি ভালো সিদ্ধান্ত?
ব্রেজিন্সকি : আমি মনে করি চ্যান্সেলর মার্কেল দারুণ ভালো করছেন। ওবামার আরো কিছু বিষয়ে নজর দিতে হচ্ছেÑ যেমন মধ্যপ্রাচ্য।

স্পিগেল অনলাইন : মার্কেল মনে করছেন ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানোর সিদ্ধান্তটা ভুল। সঙ্কটের সমাধানটা সামরিক উপায়ে হবে বলে মনে করছেন না তিনি। আপনার কি মত এখানে?
ব্রেজিন্সকি : রাশিয়ার জন্য অস্ত্র ব্যবহারের মূল্যটা আমাদের বাড়িয়ে দেয়া উচিত। আমার মতে, ইউক্রেনের প্রধান শহরগুলোকে রক্ষা করতে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র পাঠানোটা যুক্তিগ্রাহ্য যেমন মর্টার এবং ট্যাংক বিধ্বংসী রকেট। আপনি যদি কোনো বড় দেশ দখল করতে চান, তাহলে বড় শহরগুলো দখল করতে হবে আগে। আর জনগণ যদি প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে যেকোন বড় শহর দখল করা হবে খুবই কঠিন।

স্পিগেল অনলাইন : কোনো সমাধান কি আপনার জানা আছে যেখানে পরিস্থিতির আরো অবনতি এড়ানো যায়?
ব্রেজিন্সকি : আমি বিশ্বাস করি এই সঙ্কটের চূড়ান্ত সমাধান হবে কিছু বোঝাপড়ার মাধ্যমে। এই বোঝাপড়ার ভিত্তি হতে হবে সেই সব মূলনীতির ভিত্তিতে যেগুলোর ভিত্তিতে কয়েক দশক ধরে রাশিয়া ও ফিনল্যান্ডের মধ্যে স্থিতিশীলতা ও শান্তি বিরাজ করছে।
নিজের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়, রাজনৈতিক দর্শন নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবং ইউরোপের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে ইউক্রেনের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকতে হবে। কিন্তু একই সাথে রাশিয়াকে গ্রহণযোগ্য উপায়ে আশ্বস্ত করতে হবে যে, ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হবে না। আমি এখনো মনে করি, এটাই সমস্যার সমাধান।
স্পিগেল অনলাইন : সাম্প্রতিক সময়ে এনএসএ নিয়ে অনেক কিছু শুনছি আমরা। আপনি যখন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন তখন কি এনএসএ জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট স্মিথের কথাবার্তায় আড়ি পেতেছিল?
ব্রেজিন্সকি : আমার সাবেক পদের ব্যাপারে কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই এ ব্যাপারে আমি কোনো কথা বলব না।