আমি কসাই নই, জিহাদ করছি

Aug 18, 2015 11:32 am

 

দেড় বছর আগে আবু আবদুল্লাহ বাগদাদে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর আত্মঘাতী বোমা হামলাগুলো সংঘটনের দায়িত্বে ছিলেন। এই নবগঠিত দুর্ধর্ষ ও ভয়ঙ্কর সংগঠনটির যে দু-চারজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে জীবিত আটক করা সম্ভব হয়েছে, তাদের একজন এই আবদুল্লাহ। ইরাকের রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংবলিত একটি কারাগারে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ‘স্পিয়েজেল’ পত্রিকার ক্রিস্টোফার রিউটার। ভাষান্তর করেছেন রাইসা রাহনুমা

ভারী গেটটা আস্তে আস্তে খুলে গেল। প্রহরীরা সদর দফতরে যোগাযোগ করে সাংবাদিক টিমটির পরিচয় এবং রাত ১০টায় তাদের সাক্ষাতের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার আগে গেট খোলা হয়নি। ভেতরে কিন্তু একটা প্রতিবন্ধক ছিল। তা হচ্ছে ৪ মিটার বা ১৩ ফুট উঁচু কংক্রিটের দেয়াল। তা ছাড়া, ‘হামভি’ যানগুলো মোতায়েন ছিল তাক করা মেশিনগানসহ। এর পরেই কারাগারের মূল ফটক।
এই বন্দিশিবির বাগদাদে অবস্থিত ঠিকই; কিন্তু এর নাম ও অবস্থান প্রকাশ করা যাবে না। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাসিন্দার সাক্ষাৎকার নেয়ার শর্তই ছিল এটি। বন্দী মানুষটির বয়স চল্লিশের কিছু কম। হ্যাংলা-পাতলা এই লোক পরিচিত ছদ্মনাম ‘আবু আবদুল্লাহ’ দিয়ে। দেড় বছর ছিলেন বাগদাদে আইএসের সুইসাইড অ্যাটাকের লজিস্টিকস বিভাগের প্রধান। তাকে জীবিত পাকড়াও করা সম্ভব হয়েছে যা আইএসের বেলায় বিরল ঘটনা। সাধারণত আইএস নেতারা ধরা পড়ার আগেই বোমায় নিজেদের উড়িয়ে দেন কিংবা আগে থেকেই সাথে রাখা বিষের ক্যাপসুল গিলে আত্মহত্যা করেন। এই বিষ রাখার উদ্দেশ্য, যাতে শত্রুর হাতে জীবন্ত ধরা পড়তে না হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ দেন। জীবিতাবস্থায় ধরা দেয়ার কোনো ভাবনা আইএসের কারো থাকে না।


অবশ্য আবু আবদুল্লাহ এত দ্রুত কাবু হয়ে পড়েন যে, নিজেকে খতম করে দেয়ার সময়টুকু পাননি। ২০১৪ সালের জুলাইর শেষ দিকে গ্রেফতার হওয়ার কিছু আগে থেকে তিনি ছিলেন নজরদারির আওতায়। আবদুল্লাহর বোমা বানানোর কারখানাটি দেখে বাইরে থেকে মনে হতো, গাড়ির গ্যারেজ। কর্তৃপক্ষ যখন এটি দখল করে নেয়, তখন এটি ছিল বহাল তবিয়তে।
‘আবু আবদুল্লাহ’ নামে পরিচিত মানুষটির জেল থেকে কথা বলা বিস্ময়কর বলা যায়। আইএসের নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে কয়েক মাস গবেষণার সময়ে তার নাম বারবার উঠে এসেছিল। ইরাকি পুলিশের তদন্তকারীরা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা বিভাগ এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ‘স্পিয়েজেল’ পত্রিকাকে বিশদ জানিয়েছেন আবদুল্লাহর সাক্ষ্যের সূত্রে।
এসব তথ্য জোড়া দিলে ‘ইসলামিক স্টেট’ (আইএস)-এর পরিচয়টা পাওয়া যায়। আইএস এমন এক সংগঠন যেখানে দায়িত্বশীলদের কাজ সুনির্দিষ্টভাবে পৃথক করা এবং দলের ভেতরে এ নিয়ে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই। আইএসের যার যে কাজ, তিনি কোনো অপারেশন সম্পর্কে ততটুকুই জানতে পারেন।


সংগঠনটি যেন এমন এক যন্ত্র, যার আছে অসংখ্য ছোট ছোট গিয়ার এবং এগুলোর কোনোটা ভেঙে গেলে অবিলম্বে সে জায়গার বিকল্প গিয়ার লাগিয়ে দেয়া হয়। আইএসের বেশির ভাগ সদস্য এর সার্বিক কাঠামোর ব্যাপারে খুব সামান্যই জানেন। জানতে চাইলেও সে সুযোগ নেই। যা হোক, আবু আবদুল্লাহ বাগদাদে আইএসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। নগরীটিতে যেসব সন্ত্রাসী হামলা চলছে, সেগুলোর পেছনে এই পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির ভূমিকা অনেক। হামলার স্থান এবং আত্মঘাতী বোমাবাজদের কারা অস্ত্রসজ্জিত করবেন, আর কারা বিস্ফোরণের মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের সঙ্গী হবেন এ সব কিছু নির্ধারণ করে দিতেন আবদুল্লাহ।


এ যেন ‘শিল্পকর্ম’
ইরাকি কর্তৃপক্ষ মাসের পর মাস আবু আবদুল্লাহকে জেরা করার পরেই আমরা তার সাথে কথা বলার অনুমতি পেয়েছিলাম। সাক্ষাৎকার নিতে হলো সন্ধ্যায়; কারণ দিনে যানবাহনের ভিড় লেগে থাকত রাস্তায়। আর সন্ধ্যাবেলায় কারাগারের গেটে আত্মঘাতী হামলার আশঙ্কা থাকে কম। অতীতে সেখানে প্রায় সময়ে এ ধরনের হামলা হয়েছিল। আবদুল্লাহর অবস্থানস্থল ও তার গতিবিধি গোপন রাখতে গিয়ে কর্মকর্তাদের হয়রান হতে হয়েছে।
ফৌজদারি পুলিশের ক্যাপ্টেন সাফার বলেছেন, আবু আবদুল্লাহসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েদিদের অনবরত এক জেলখানা থেকে আরেক জেলে ঘোরানো হয়, যাতে তারা পালানোর কোনো পথ না পায়।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকির শাসনকালে দুর্নীতির দাপট এত চরমে পৌঁছেছিল যে, আইএসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সন্ত্রাসীরাও জেল থেকে ঘন ঘন পালিয়ে যেতে পেরেছে। আর গণপলায়ন ঘটেছে কয়েকবার। দুর্নীতিবাজ বিচারক, রাজনীতিক ও পুলিশ অফিসারেরা আইএস থেকে ঘুষ নিয়েছিলেন। তাই এদের নিয়েও সমস্যা দেখা দিয়েছিল। গোয়েন্দা দফতরের একজন তদন্তকারী বলেছেন, ‘ওই পরিস্থিতিতে আমরা চেয়েছি বন্দী সন্ত্রাসীদের যত শিগগিরই সম্ভব খতম করতে, যেন তারা জেল থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে।’ তিনি বললেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদির আমলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। দুর্নীতিপরায়ণ অফিসারদের কয়েকজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে তারা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। বিচারালয় আগে থেকেই ঘুষ দ্বারা প্রভাবিত।
একজন কর্মকর্তা জানালেন, আইএসের বিরুদ্ধে ইরাকের পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর যে অভিযান, সেটা দেখলে অপরাধ দমনের চেয়ে যুদ্ধ বলেই বেশি মনে হয়। আইএস ঘাতকেরা দলে দলে নিজেদের উড়িয়ে দিচ্ছে। মাঝে মধ্যে বাগদাদে একই সাথে এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটছে। মসজিদ, বাজার, চেকপয়েন্ট, রেস্তরাঁয় ঘটছে এমন ঘটনা। তদন্তে নিয়োজিত সরকারি লোকজন হামলার সংগঠকদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে ঘৃণা-বিদ্রƒপের কম প্রকাশ ঘটান না। পুলিশের সাফার নামের কর্তাব্যক্তি জনৈক আবু সামিরের কার-বোমার ব্যাপারে বললেন, এগুলো তো শিল্পকর্ম। এসব বোমা এতই সূক্ষ্ম ও নিখুঁত যে, সব কিছু ধ্বংস করে দেয়; কারের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ফলে কিভাবে বিস্ফোরকের চার্জের সমাবেশ ঘটানো হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্তের কোনো সুযোগ থাকে না।’
গ্রেফতারকৃত আইএস সদস্যদের জানে মেরে ফেলার ঘটনা না ঘটার কারণ এটাই যে, তারা তথ্য দিতে পারেন; তারা আবু আবদুল্লাহর ভঙ্গিতে কথা বলতে পারেন। তদন্ত কর্মকর্তার উক্তি : সে বিভিন্ন জনের নাম বলে দিচ্ছে, সন্দেহভাজনদের সম্পর্কে তার বিশদ জানা আছে। অবশ্য এসব এক সাথে বলেনি; কিছু কিছু করে ক্রমশ প্রকাশ করেছে। যতক্ষণ আবদুল্লাহর মুখ থেকে এসব কথা বের হবে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে না।
পুলিশ আর গোয়েন্দা বিভাগ উভয়েই জোর দিয়ে বলতে চেয়েছে, দোষ স্বীকার করানোর জন্য আবদুল্লাহর ওপর নির্যাতন চালানো হয়নি। সাফারের বক্তব্য : আমরা তো আগে থেকেই ওকে ‘ফলো’ করে আসছিলাম। যারা হামলা চালিয়েছে, তারাসহ সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে আবদুল্লাহর বৈঠকের ভিডিও আমাদের হাতে এসেছে। সে প্রথম থেকেই আমাদের সহযোগিতা করেছে। আমাদের সাথে কথা বলা মানে, তার বেঁচে থাকার গ্যারান্টি।
আবু আবদুল্লাহ আমাদের বলেছেন, তার সাথে ‘ভালো আচরণ করা হয়েছে’। অবশ্য এটা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। আইএসের হামলাগুলোতে ব্যবহৃত বিস্ফোরকের ব্যাপারে তদন্ত চালিয়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তার সাথে আবদুল্লাহর স্বীকারোক্তির মিল রয়েছে। তাই তদন্তকারীদের বিশ্বাস, তার সাক্ষ্য বাস্তব ঘটনার প্রকৃত প্রতিকৃতি।
জেরাকারীদের মতে, আবদুল্লাহ ভারসাম্যপূর্ণ মস্তিষ্কের অধিকারী ধর্মোন্মাদ। অন্তত দেড় ডজন আত্মঘাতী হামলায় কয়েক শ’ মানুষ হতাহত করার হোতা। সে হামলার টার্গেট নির্ধারণ করে বোমাবাজদের সেখানে পাঠিয়েছে আত্মঘাতী কিংবা কার-বোমার উপকরণে সজ্জিত করে।
আবদুল্লাহ কি নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত? একজন কর্মকর্তা জানান, আসলেই তার আফসোস নেই। আর এটা তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণও নয়। আমাদের জানানো হলো, আমরা শিগগিরই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারব।’
একটি ফাঁকা সেলে আবদুল্লাহর সাক্ষাৎকার নেয়া হলো। দরজা ছিল খোলা এবং একজন পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে নজর রাখছিলেন। আবু আবদুল্লাহকে যখন সেখানে আনা হলো, তার চোখ ছিল বাঁধা। ফোল্ডিং চেয়ারে বসার পর তিনি বাঁধন সরিয়ে নিলেন। আলাপ করার সময়ে চোখ বাঁধার কাপড়টা ছিল তার হাতে যে হাতে, ছিল হাতকড়া লাগানো। একই স্বরে কথা বলে যাওয়ার সময় তিনি কাপড়টা মোচড়াচ্ছিলেন। বিস্তারিত বলছিলেন আইএসের ভেতরের নানা বিষয়ে।

স্পিয়েজেল : আপনারা কিসের ভিত্তিতে হামলার স্পট নির্ধারণ করতেন?
আবু আবদুল্লাহ : যত বেশিসংখ্যক মানুষকে আঘাত করার কথাই ভাবা হতো বিশেষ করে পুলিশ কর্মকর্তা, সৈন্য এবং শিয়া।
স্পিয়েজেল : কোন ধরনের স্থানে হামলা করা হতো?
আবু আবদুল্লাহ : পুলিশের চেক পয়েন্ট, মার্কেট এবং শুধু শিয়াদের মসজিদ।
স্পিয়েজেল : এসব মানুষকে হত্যা করে আপনি কি অনুতপ্ত?
আবু আবদুল্লাহ : ওরা কাফের। আমি নিশ্চিত, শিয়ারা কাফের।
স্পিয়েজেল : কিন্তু তারাও তো আপনার মতো মুসলমান।
আবু আবদুল্লাহ : এ জন্যই ওদের সুযোগ ছিল অনুতপ্ত হয়ে সুন্নি হয়ে যাওয়ার।
স্পিয়েজেল : মোট কতগুলো হামলা আপনি সংঘটিত করেছেন? এগুলোর জন্য বিস্ফোরক পেলেন কোথায়?
আবু আবদুল্লাহ : সব কিছু মনে নেই। আমাকে গ্রেফতার করার আগের তিন মাসে ১৫টি হামলা চালানো হয়েছিল। কার-বোমার জন্য আমরা সি-ফোর প্লাস্টিক বিস্ফোরক এবং আর্টিলারি শেলের বিস্ফোরক ব্যবহার করেছি। আর সুইসাইড বেল্টের জন্য অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট কামানের শেল খুলে ফেলেছি; এই পাউডারের কার্যকারিতা বেশি। (আত্মঘাতীদের জন্য) বিভিন্ন সাইজের বেল্ট এবং পোশাকের ভেতরে ব্যবহারের আবরণী তৈরি করেছি।

[খুব গরম পড়ছিল। কাছে একটা ফ্যান আওয়াজ করে ঘুরছিল। আবু আবদুল্লাহ চোখের বাঁধন দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন। সামান্য থেমে বললেন, ‘গুনে দেখলাম, তিন মাসে ১৫টি নয়, ১৯টি হামলা চালানো হয়েছে।’ শান্তকণ্ঠে, মনোযোগ দিয়ে কথা বলছিলেন। খেয়াল রাখছিলেন যাতে কোনো তথ্য বাদ না পড়ে।]

স্পিয়েজেল : কারা আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে নিজেদের নিঃশেষ করবে, সেটা কিভাবে নির্ধারণ করলেন?
আবু আবদুল্লাহ : আমি ওদের বাছাই করতাম না। এটা সামরিক পরিকল্পনাকারীদের দায়িত্ব। আইএসে তারা আমার চেয়ে ওপরের পদমর্যাদার ব্যক্তি। আমার কাছে লোকজন আনা হতো বেশির ভাগই ফাল্লুজা থেকে। আমি অপারেশনের শুধু শেষ অংশের জন্য দায়িত্বশীল ছিলাম। তা হলো, আমার ওয়ার্কশপে (হামলাকারীকে) তৈরি করে দেয়া এবং এরপর হামলার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে তাদের নিয়ে আসা। আগেই নেতারা আমাকে জানিয়ে দিতেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দেহের মাপজোখ, যাতে আত্মঘাতী হামলার বেল্ট ভালোভাবে তার শরীরে ফিট হতে পারে। আমার কাছে নানা সাইজের বেল্ট প্রস্তুত থাকত।
স্পিয়েজেল : বোমাবাজদের মৃত্যুর পর তাদের পরিবারকে কি খবর দেয়া হতো?
আবু আবদুল্লাহ : সেটা আমার দায়িত্ব ছিল না। যিনি ওদের আমার কাছে পাঠাতেন, তিনি ওদের পরিবারের দেখাশোনাও করতেন।
স্পিয়েজেল : লোকগুলো আসত কোত্থেকে?
আবু আবদুল্লাহ : বেশির ভাগ এসেছিল সৌদি আরব, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া থেকে। আর ইরাকি ছিল দশ ভাগের এক ভাগ। পাশ্চাত্যের ছিল দু’জন একজন অস্ট্রেলিয়ান, একজন জার্মান যার নাম আবু আল কাকা আল আলমানি।

 

[সি. আহমেত (২১) তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান যুবক। ঠিকানা এনেপেটাল, নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া, জার্মানি। আল-আলমানি নাম নিয়ে সে আইএসের পক্ষে যুদ্ধ করেছে। এই স্কুলছাত্র অল্প কয়েক মাসেই একেবারে বদলে যায়। সে জার্মান নগরীগুলোর পথচারীদের মাঝে পবিত্র কুরআনের কপি বিলি করেছে। একপর্যায়ে তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় যাওয়ার পর আইএস তাকে ইরাকে নিয়ে আসে। ১৯ জুলাই ২০১৪ সালে আইএস পুলিশ ও আর্মি চেকপয়েন্টে অন্তত পাঁচ দফা হামলা চালিয়েছে। এর একটিতে অংশ নেয় আলমানি। সে এবং আরেকজন আত্মঘাতী বোমারু সম্পর্কে আইএসের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘ইসলামের দু’জন যোদ্ধা এবং খিলাফতের দু’জন বীরকে নিক্ষেপ করা হলো।’ লক্ষণীয়, এখানে ‘নিক্ষেপ’ শব্দটার প্রয়োগ থেকে মনে হয় যেন, এই দু’টি মানুষ নিজেরাই ছিলেন মারণাস্ত্র!]

 

স্পিয়েজেল : জার্মান বোমাবাজ আরবি জানত না। আপনিও ইংরেজি জানেন না। তাহলে কিভাবে পরস্পর যোগাযোগ করেছেন?
আবু আবদুল্লাহ : কয়েকটা শব্দ সে বুঝত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আকারে-ইঙ্গিতে আমরা ভাব বিনিময় করতাম। এটা ছিল আমার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অপারেশন। যেখান থেকে তাকে তুলে এনেছিলাম, জায়গাটা বিস্ফোরণস্থলের পাশেই। আল আলমানি প্রথমবারের মতো বাগদাদে এসেছিল। মাত্র ৪৫ মিনিট পরেই সে মারা গেল। ভাবলাম : এখন জার্মানি থেকেও মানুষ এখানে আসছে নিজেদের উড়িয়ে দিতে। এটা ভেবে শিহরিত হলাম যে, এমন একজনের সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটেছে যে খ্রিষ্টান থেকে মুসলমান হয়েছে এবং নিজেকে করেছে উৎসর্গ। নিজেকে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপলব্ধি করলাম। কারণ, পরবর্তী সময়ে আমি শুধু প্রকৃত ঈমানের সন্ধান পেয়েছি।

 

[আবু আবদুল্লাহ ভুল করেছেন। আহমেত অর্থাৎ ‘আলমানি’ খ্রিষ্টান ছিল না; সে জার্মান মুসলিম। অপরদিকে, আবদুল্লাহ ১৬ কি ১৭ বছর বয়সে শিয়া থেকে সুন্নি হয়ে যায়। একজন প্রচারকের উদ্যোগে এটা ঘটেছিল। আবদুল্লাহ বাগদাদের পুরনো শিয়া পরিবারের সন্তান। র‌্যাডিকেল শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপ আসাইব আহল আল হক-এর এক নেতা তার আত্মীয়। এই সংগঠন কয়েক বছর যাবৎ ইরাকে মার্কিন সৈন্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে। বর্তমানে তারা কয়েক ফ্রন্টে লড়ছে আইএসের বিরুদ্ধে।]

 

স্পিয়েজেল : আপনি যাদের সাথে ছিলেন, তাদের কেউ কি নিজেদের মিশন সম্পর্কে সন্দেহ করত?
আবু আবদুল্লাহ : না। কারণ, তাহলে মিশন পুরো করতে তারা ব্যর্থ হবে। তারা দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালনেও প্রস্তুত ছিল। আমার কাছে যখন আসত, তাদের শান্ত দেখতে পেতাম। মাঝে মধ্যে এমনকি উৎফুল্লও দেখা যেত। যখন (আত্মঘাতী হামলার জন্য) ওরা বেল্ট পরিধান করত, বলে উঠত ‘বেল্টটা বেশ ভালোভাবে শরীরে ফিট করেছে।’ এদের মধ্যে একজন হচ্ছে আবু মোহসেন কাসিমি। সে সিরিয়ার একজন তরুণ। (আত্মঘাতী মিশনে নামার) মাত্র দুই মিনিট আগেও সে ঠাট্টামশকরা করছিল। গাড়ি চালিয়ে চলে যাওয়ার মুহূর্তে আমাকে বন্ধুর মতো বিদায় জানিয়ে গেল। এবার এক তরুণ সৌদি নাগরিকের কথা। অবাক হয়ে ভাবি, আমরা কেমন করে পরস্পর জায়গা বদল করে নিয়েছিলাম। কারণ প্রথমে আমিই গাড়ি চালাচ্ছিলাম। আমরা এমন ভাবভঙ্গি দেখালাম যে, গাড়ির ইঞ্জিনে গোলযোগ দেখা দিয়েছে। দু’জনই নেমে গাড়িটা সামান্য ঠেলে নিলাম। এসব লক্ষ করল না কেউ। দু’জনই হাসলাম।
স্পিয়েজেল : এ কাহিনী শোনাতে গিয়ে আপনার মুখমণ্ডল লালচে হয়ে উঠছে। এ সব কিছু আনন্দদায়ক স্মৃতি বলেই প্রতীয়মান হয়। আপনি কি এ ধরনের কাজ আবার করবেন?

[আবু আবদুল্লাহর সাথে দেড় ঘণ্টার কথোপকথনের এটাই একমাত্র মুহূর্ত যখন তিনি থমকে গেলেন। তার চেহারা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, তাকে বুঝি হাতেনাতে ধরা হয়েছে। এরপর বললেন, ‘এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারছি না।’]

 

স্পিয়েজেল : আপনার মোটর গ্যারেজে প্রায় সময়ে নতুন নতুন লোকজনের আসা-যাওয়ার ব্যাপার কি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি?
আবু আবদুল্লাহ : আমরা এটা নিশ্চিত করতাম যে, তাদের সন্দেহ করার মতো মনে হবে না। তাদের বেশি দাড়ি ছিল না। তারা পরত টি-শার্ট; চুলে জেল লাগাত। আমাদের একটা টিম ছিল ড্রাইভারদের নিয়ে। আমি অবশ্য (আত্মঘাতী হামলাকারীদের ব্যাপারে) সরাসরি দায়িত্বশীল ছিলাম না। তাদের বেল্ট লাগিয়ে দেয়াই ছিল আমার কাজ।
স্পিয়েজেল : বোমাবাজদের বয়স কত ছিল?
আবু আবদুল্লাহ : সবচেয়ে কম বয়স ছিল ২১ বছর; সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন বছর পঞ্চাশেক বয়সের।

 

[এ সময়ে বিদ্যুৎ চলে গেল। সেলটা ডুবে গেল অন্ধকারে। তখন ফটোগ্রাফার আর প্রহরীদের মোবাইল ফোনের ম্লান আলোই ছিল ভরসা। এত কঠোর প্রহরার জেলখানাতেও যখন-তখন বিদ্যুৎ চলে যায় কয়েক মিনিটের জন্য।]

 

স্পিয়েজেল : বাগদাদে আইএসের লজিস্টিকস প্রধান হলেন কী করে?
আবু আবদুল্লাহ : আইএসের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা আমাকে বাছাই করেছিলেন। আমিও শিগগিরই প্রমাণ করেছি যে, আমি পারি। আমি তো কেবল একজন অনুসারী ছিলাম না; আমি ছিলাম পরিকল্পনাকারী, একজন চিন্তাবিদ।
স্পিয়েজেল : আপনি বাগদাদের পথঘাট ভালোই চিনতেন।
আবু আবদুল্লাহ : হ্যাঁ। এটা আমার শহর। আমি জন্মেছি এখানেই।
স্পিয়েজেল : বাগদাদে আপনার সবচেয়ে পুরনো স্মৃতি কোনটি?
আবু আবদুল্লাহ : যখন শিশু ছিলাম, ঘন ঘন যেতাম সাউরা পার্ক, চিড়িয়াখানায় যেতাম ছুটির দিনে মা-বাবার সাথে। বাবা প্রায় সময়ে আমার জন্য আইসক্রিম আনতেন। মাঝে মধ্যে আমরা শোরজাহ মার্কেটেও যেতাম।
স্পিয়েজেল : এগুলো কি সুখের স্মৃতি?
আবু আবদুল্লাহ : হ্যাঁ, চমৎকার!
স্পিয়েজেল : নিজের শহরে কেমন করে নির্বিচারে আপনারা মানুষ হত্যা করতে পারেন? ওসব জায়গা কি এড়িয়ে যেতেন যার সাথে আপনার স্মৃতি জড়িত?
আবু আবদুল্লাহ : না, তা মোটেও নয়! তা কোনো প্রভাবই ফেলেনি। আমি রক্তপিপাসু হিসেবে ভূমিকা রাখিনি। এটা হচ্ছে জিহাদ। ভেবে দেখেছি, এই শিয়ারা একপর্যায়ে হয় সুন্নি হতে হবে, নতুবা ছেড়ে যেতে হবে এই শহর। আমি কসাই নই, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছি মাত্র।
স্পিয়েজেল : যত লোক নিহত হোক, এই পরিকল্পনা কখনো ফল দেয়নি।
আবু আবদুল্লাহ : আমি মনে করেছি, যারা বিস্ফোরণের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে, তারা ভাবতে শুরু করবে এবং ভীত হয়ে পড়বে......
স্পিয়েজেল : তবুও বলতে হয়, আপনাদের পরিকল্পনায় কাজ হয়নি।
আবু আবদুল্লাহ : এতে কিছু আসে-যায় না। ওদের সবাই সুন্নি না হওয়া কিংবা চলে না যাওয়া পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার চিন্তাই করেছি। কখন এটা হবে, তাকে কোনো ব্যাপার মনে করিনি।

[তার কণ্ঠ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো বোকা লোককে একটা সরল বিষয় বারবার বুঝাতে চেষ্টা করছিলেন]

স্পিয়েজেল : আপনি নিজেকেও কি বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন?
আবু আবদুল্লাহ : কখনো এটা ভাবিনি। এটা আমার কাজ নয়। অপারেশনের পরিকল্পনা করার জন্যই আমাকে বেছে নেয়া হয়েছিল; নিজে তা করার জন্য নয়। ছিলাম সমন্বয়কারী; বাস্তবায়নকারী নয়।
স্পিয়েজেল : আপনার ভবিষ্যৎ কেমন হবে মনে করেন?
আবু আবদুল্লাহ : অনিশ্চিত।