পরমাণু অস্ত্রধারী ইরানকে কোনোভাবেই বরদাশত করা সম্ভব নয়

Sep 01, 2015 04:13 pm



দুই বছরের বেশি সময় ধরে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন মোশে ইয়ালন (৫৫)। তিনি এর আগে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অধীনে উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। একসময় তিনি ছিলেন সামরিক বাহিনীর সদস্য। একটি এলিট কমান্ডো ইউনিটের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন তিনি। পরে তিনি ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর চিফ অব স্টাফ হয়েছিলেন। তিনি ডানপন্থী লিকুদ পার্টির সদস্য। তার অফিসে একটি ছবি শোভা পায়, তাতে আউশবিজের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ইসরাইলি জেটবিমান দেখা যায়। তাতে লেখা : ‘আর কখনো নয়।’


সম্প্রতি ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও আরো কয়েকটি দেশের যে পরমাণুসংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে তিনি প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করেছেন। জার্মানির স্পাইজেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি খোলামেলাভাবে তার কথা বলেছেন। এখানে তার মন্তব্যটি তুলে ধরা হলো। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ

 

স্পাইজেল : রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মাইক হাকবি সম্প্রতি বলেছেন যে, ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তিটি আবার ইসরাইলিদের ‘চুলার মুখে’ ঠেলে দেবে। আপনি কি এ ধরনের কঠোর ভাষার সাথে একমত?
ইয়ালন : ইরানের সাথে হোয়াইট হাউজের চুক্তিটির ব্যাপারে আমাদের অনেক বিরোধিতা রয়েছে। এ ধরনের মন্তব্য নিয়ে মন্তব্য করা ছাড়াই বলা যায় চুক্তিটি যথেষ্ট খারাপ।


স্পাইজেল : চুক্তিটির সবচেয়ে কঠোর সমালোচক আপনি, কেন?
ইয়ালন : একেবারে শুরু থেকেই আমরা এমন একটা কৌশলের প্রতি সমর্থন দিয়েছিলাম, যা ইরানি শাসকদের অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে পরমাণু বোমা কিংবা শাসক হিসেবে টিকে থাকার কোনো একটি বেছে নেয়ার মতো উভয় সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দেবে। এই কৌশলের লক্ষ্য ছিল ইরানিদের বন্ধুহীন করা এবং অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে পঙ্গু করে তোলা। আর সেটা ২০১২ সাল থেকে বেশ ভালোভাবে কাজ করতে শুরু করেছিল। আমরা বিশ্বাস করি যে, অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ফলে ইরানের ভেতরে প্রতিরোধের সৃষ্টি হতো। আর আমাদের কৌশলের চূড়ান্তপর্যায়ে ছিল সামরিক বিকল্প : তুমি যদি জাতিসঙ্ঘ প্রস্তাব পালন না করো, তবে তোমার ওপর হামলা চালানো হবে। ২০১৩ সালে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন। তিনি টিকে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে ‘মহা শয়তান’ আমেরিকার সাথে আবার আলোচনার কথা ভাবেন। তিনি এটাকে বিষ মেশানো গ্লøাস থেকে পানি পান করা বলে অভিহিত করেছিলেন।


স্পাইজেল : যদি অবরোধই ইরানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসে থাকে, তবে কেন এই সুযোগকে ইতিবাচক হিসেবে বলা হচ্ছে না কেন?
ইয়ালন : যে প্রক্রিয়ায় জাতিসঙ্ঘের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য ও জার্মানি আলোচনা করেছে, তাতে ঐতিহাসিক ভুল হয়েছিল। এখন আমরা চুক্তি করে ইরানকে সামরিক পরমাণু শক্তি হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছি। এক দশকের মধ্যে তারা কোনো ধরনের বাধাবিপত্তি ছাড়াই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পেয়ে যাবে। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে কয়েক মাসের মধ্যেই ইরান জব্দ করা ১০০ বিলিয়ন ডলার হাতে পেয়ে যাবে। তা ছাড়া তারা তাদের অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও হাতে পাবে। ফলে তারা ‘বিপ্লব রফতানি’ করার মতো টাকা পেয়ে যাবে। ইরানিরা হিজবুল্লাহ, হামাস ও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের মতো সংস্থাকে আর্থিক সহায়তা দেবে। ইয়েমেনের হুতি, বাহরাইন ও সৌদি আরবের শিয়ারা সহায়তা পাবে। তারা তাদের সন্ত্রাসী অবকাঠামোকে আরো সক্রিয় করতে পারবে। আর তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইল ও ইউরোপের অন্যান্য অংশেও তো পৌঁছাতে পারবে, নাকি? এগুলো চুক্তির অংশ নয়।


স্পাইজেল : তবে এই চুক্তির কারণে এটাও তো সম্ভব যে, ইরান ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে?
ইয়ালন : এটাই হতে পারে ইরানের একমাত্র গঠনমূলক ভূমিকা। এই অঞ্চলে অন্য সব সঙ্ঘাতে ইরানকে বিপরীত দিকে পাওয়া যাবে। সেটা সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা গাজা উপত্যকা যেখানেই হোক না কেন। ইরানের লক্ষ্য একটি শিয়া সাম্রাজ্য কায়েম করা।


স্পাইজেল : আপনার মূল্যায়ন অনুযায়ী, পাশ্চাত্যের আলোচকেরা হয় আনাড়ি কিংবা ইরানিরা খুবই চতুর?
ইয়ালন : আমি বিশ্বাস করি, অনেক ঐতিহাসিক গবেষক চুক্তিটি নিয়ে এমনটাই মনে করবে। আমার মনে হচ্ছে, পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক নেতারা সমস্যাটিকে আগামী দিন, আগামী বছর বা আগামী মেয়াদ পর্যন্ত স্থগিত করাটাই ভালো মনে করেছে। এটাকে অনেকে সমাধান মনে করছে, তবে এর জন্য মূল্য দিতে হবে অনেক।


স্পাইজেল : এমনও তো হতে পারে, এই চুক্তির ফলে তেহরান রাজনৈতিক সংস্কারে যাবে।
ইয়ালন : চাপ ছাড়া তা কিভাবে সম্ভব? তারা এখনো বাজারে লোকজনকে ফাঁসিতে ঝোলায়। কোনো ধরনের ইরানি বসন্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আর আপনারা তেহরানে ম্যাকডোনাল্ডসে কথা ভুলে যেতে পারেন।


স্পাইজেল : আপনি কি মনে করেন, এই অঞ্চলে পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা হতে পারে?
ইয়ালন : ইরানের সাথে চুক্তির পর মিসর, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো দেশগুলো দাবি করতে পারে, তারাও এমনটা করবে। তবে আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা ভালোভাবে মোকাবিলা করবে।


স্পাইজেল : যদি আপনাদের সেনা বা সামরিক বাহিনীর প্রধানেরা আপনাকে আগামী সপ্তাহে বা আগামী মাসে জানায় যে, ইরান চুক্তির শর্তাবলি ভঙ্গ করেছে, তারা সামরিক উদ্দেশ্যে পরমাণু কর্মসূচি চালাচ্ছে, তবে আপনি কি ইরানি পরমাণু স্থাপনায় বিমান হামলার সুপারিশ করবেন?
ইয়ালন : এ ধরনের ক্ষেত্রে আমরা তা নিয়ে আলোচনা করব। আর সবশেষে বিষয়টি পরিষ্কার। অন্যভাবে বললে বলতে হয়, ইরানি সামরিক পরমাণু উচ্চাভিলাষ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমরা কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্রধারী ইরানকে বরদাস্ত করতে পারি না। আমরা চুক্তি বা অবরোধের মাধ্যমে তা করার বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দেবো। আর ইসরাইল নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম।


স্পাইজেল : তাহলে আমরা কি হামলায় আবারো ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানীর মৃত্যু কিংবা ইরানি কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ভাইরাসের আক্রমণ দেখব?
ইয়ালন : আমরা নিজেদের রক্ষা করতে প্রস্তুত। আমি ইরানি বিজ্ঞানীদের জীবনের জন্য দায়ী নই।