প্রকৃত মুসলমান তকদিরে বিশ্বাস রাখেন

Oct 23, 2015 02:24 am



হারুন ইয়াহইয়া

এই বিশ্বে যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার পেছনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গোপন বিষয় রয়েছে। ঈমানদার ব্যক্তিদের যারা এর অধিকারী, তারা সব পরিস্থিতিকেই মোকাবেলা করেন বিপুল ধৈর্য, আনন্দ ও উৎসাহের সাথে। এই গোপন বিষয়ের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ‘তকদির’ বা ভাগ্যের বাস্তবতা।


মুসলমানেরা জানে, আল্লাহতায়ালা সবকিছুই তকদিরের আওতায় সৃজন করেছেন এবং যা কিছুই ঘটে থাকে, এর একমাত্র কারণ, আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহই মানুষের জীবন সৃষ্টি করেছেন অত্যন্ত নিখুঁত ও সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি দিকগুলোসমেত। আল কুরআনের সূরা আনআমে বর্ণিত হয়েছে, কিভাবে বড় কিংবা ছোট, যা কিছুই পৃথিবীতে ঘটুক না কেন, সবই সংঘটিত হওয়ার কারণ, আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা। ‘অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁর আয়ত্তে। তিনি ছাড়া কেউই সে সম্পর্কে জানে না। জল ও স্থলের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে তিনি জানেন। তাঁর অজ্ঞাতসারে কোনো পাতা পর্যন্ত পড়ে না। পৃথিবীর অন্ধকারে কোনো বীজ নেই এবং কিছুই নেই আর্দ্র বা শুষ্ক, যা নেই একটি সুস্পষ্ট কিতাবে’ (সূরা আল আনআম, আয়াত ৫৯)।


মানুষ এমন এক সত্তা, যে সময়ের সীমাবদ্ধতা দ্বারা সীমিত এবং সে শুধু বর্তমান মুহূর্তের প্রেক্ষাপটে ঘটনাবলির দিকে লক্ষ করতে পারে। মানুষ জানে না, তার ভবিষ্যৎ কেমন হবে। তাই মানুষ ঘটনার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য এবং এর অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা, সৌন্দর্য ও কল্যাণের দিকগুলো সবসময় দেখতে সক্ষম হয় না। কিন্তু আল্লাহতায়ালার ক্ষেত্রে সময়ের সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য নয়। তাই তিনি ‘সময়ের বাইরে থেকে’ সব সত্তার জীবন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রেই আমরা তকদির বা নিয়তির মুখোমুখি হই।
তকদির বা নিয়তির তাৎপর্য হলো, আল্লাহ সব ঘটনা সম্পর্কে অবগত সেটা অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ, যে সময়েরই হোক না কেন। তাঁর কাছে মহাকাল যেন একটি মুহূর্তমাত্র। অপর দিকে, ঘটনাবলির ফলাফল মানুষের কাছে অস্পষ্ট থাকায় তা আমাদের কাছে ‘রহস্য’ হিসেবে গণ্য হয়। আল্লাহতায়ালা কিন্তু সব বিষয়েই জানেন, যা মানুষের পক্ষে অসম্ভব।


অতএব, পৃথিবীতে মানুষ পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার বিষয়টির শুরু ও শেষ দুটোই পূর্বনির্ধারিত। আল্লাহতায়ালার দৃষ্টিতে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ একই। আমরা এই তিনটি কাল সম্পর্কে জানতে পারি কেবল যখন সময় আসে, সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা তখন অর্জনের মাধ্যমে।


তকদির সম্পর্কিত জ্ঞান হচ্ছে একটি বিরাট জ্ঞান যা ঈমানদার ছাড়া অন্যদের দেয়া হয় না। এই জ্ঞানের বলেই পার্থিব জীবনে যাবতীয় বিপদ-মুসিবত, বাধা-বিপত্তির মুখেও মুসলমানেরা ধৈর্য ও কষ্টসহিষ্ণুতার অনন্য নজির স্থাপন করতে সক্ষম।


আল কুরআন বলছে : ‘আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো ধরনের দুর্যোগ আপতিত হয় না। যে-ই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনুক, তিনি তার হৃদয়কে পথনির্দেশ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জ্ঞান রাখেন (সূরা আত তাগাবুন, আয়াত নং ১১)।


ঈমানদার ব্যক্তিরা এটা জেনে স্বস্তি বোধ করেন যে, তাদের জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন, তা পূর্বনির্ধারিত। আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের জন্য পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়াকে সহজ করে দিয়েছেন, যা এক বিরাট রহমত। তবে এটা প্রযোজ্য সত্যিকার ঈমানদারদের ক্ষেত্রে, যারা বিনা অভিযোগে তকদিরকে গ্রহণ করে নেন। একজন মুসলিম যদি প্রকৃত ঈমানদার হয় এবং আল্লাহতায়ালার কাছে আন্তরিকভাবে আত্মসমর্পণ করে, সে দুনিয়ার জীবনে সংঘটিত, অব্যাহত পরিবর্তনকে কৃতজ্ঞতার সাথে পর্যবেক্ষণ করে থাকে; যেন একজন ব্যক্তি একটি চেয়ারে বসে কোনো ছায়াছবি আরাম করে দেখছেন। তকদিরে পূর্বনির্ধারিত ইমেজগুলো কখনো খুবই সক্রিয়, কখনো ভীতিকর, কখনো দৈহিক অনুভূতিসংশ্লিষ্ট, আবার কখনো বা খুবই শান্তিপূর্ণ। ভীতিপ্রদ ইমেজগুলো বিশেষভাবে তৈরি করা। যা হোক, শেষ পর্যন্ত সবকিছুই আল্লাহর জ্ঞানের আওতাধীন এবং তাঁর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।


একজন মুসলমান তকদির সম্পর্কে সচেতন থাকেন। যিনি এর মাধ্যমে দুনিয়ায় মানুষকে পরীক্ষা করার রহস্য উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি সব বাধাবিপত্তি, ক্ষুধা বা দারিদ্র্যকে ইতিবাচক মনে করেন। তিনি জানেন, এসব পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে তিনি যে নৈতিক শক্তি প্রদর্শন করছেন, তা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। এই উপলব্ধির আনন্দ কেবল মুমিনরাই উপভোগ করেন। প্রকৃত মুসলিম এসব বিপদ ও দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়ে উদ্বেগ, চাপ, বেদনা বা ভীতি অনুভব করেন না। কারণ মুসলিমরা জানে, যেসব ঘটনা মন্দ ও অবাঞ্ছিত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, সেগুলো শেষাবধি কল্যাণকর হিসেবে দেখা দেবে। ঈমানদারদেরকে আল্লাহতায়ালা বলছেন, আল্লাহ অবিশ্বাসীদের মুসলিমদের ওপর বিজয় দান করবেন না (সূরা নিসা, আয়াত ১৪১)।


অবশ্য এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় বুঝতে যেন ভুল না হয়। ঈমানদাররা এ দুনিয়াতে সব ধরনের দুঃখ-কষ্ট, প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে পারেন, তারা বৈষয়িকভাবে হতে পারেন ক্ষতিগ্রস্ত, দৈহিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন, অসুস্থ বা আহত হতে পারেন; এমনকি হতে পারেন নিহত। তবে এসব কিছুর তাৎপর্য চূড়ান্ত বিচারে মুসলমানদের জন্য ‘মন্দ’ নয়। কারণ আল্লাহতায়ালা এসব কিছুর মধ্য দিয়ে তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। এই বান্দারা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে যে ধৈর্য-সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়ে থাকে, তার ক্ষতিপূরণস্বরূপ তিনি অনেক বেশি প্রতিদান দুনিয়া ও আখিরাতে প্রদান করেন। ইহজীবনের পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে পরজীবনে চিরন্তন পুরস্কার উপভোগ করা যাবে।


এই সত্য সম্পর্কে সচেতন থাকলে বিপদ-মুসিবতেও কষ্ট অনুভূত হবে না। ঈমানদাররা এ ধরনের উপলব্ধির কারণে অবিশ্বাসীদের পেতে রাখা ফাঁদে পা দেন না। ফলে তারা এই অপকর্মে সফল হতে পারে না। অবিশ্বাসীরা দেখতে পায়, বিশ্বাসী বা ঈমানদারদের জীবনকে তারা দৃশ্যত কঠিন করে তুললেও ঈমানদাররা স্বাভাবিকভাবে এবং সাহসের সাথে সবকিছু মোকাবেলা করছেন। তখন অবিশ্বাসীরা উপলব্ধি করে, তারা ঈমানদারদের কোনো প্রকার ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। দুঃখ-কষ্টে পড়েও প্রকৃত মুসলিমরা যে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে থাকেন, তা তাদের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতাকে অবিশ্বাসীদের সামনে তুলে ধরে। মুসিবতের সম্মুখীন হয়েও ঈমানদাররা যা বলে থাকেন, সেটা আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘আপনি বলুন, আল্লাহ যা আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, তা ব্যতীত কোনো কিছু আমাদের ক্ষেত্রে ঘটতে পারে না। তিনি আমাদের প্রভু। আল্লাহর ওপরই ঈমানদাররা তাদের আস্থা রাখা উচিত’ (সূরা আত তওবাহ, আয়াত নম্বর ৫১)।


এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, এসব কিছু হলো, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তকদিরের কাছে বিশ্বাসীদের আত্মসমর্পণের সুফল। আল্লাহর প্রতি সত্যিকার ঈমান এনে আস্থা রেখেছে, এমন কেউ ভয়-ভীতি কিংবা দুঃখ অনুভব করার কথা নয়। তারা, যারা বলে : আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ; অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না (সূরা আহকাফ, আয়াত ১৩)।


হ্যাঁ, আল্লাহতায়ালার বন্ধুরা কোনো ভয় অনুভব করবে না এবং কোনো দুঃখ তাদের করবে না স্পর্শ। যাদের রয়েছে ঈমান এবং যারা তাকওয়া প্রদর্শন করে, তাদের জন্য সুসংবাদ আছে এই দুনিয়ায় এবং আখেরাতে। আল্লাহর কথার কোনো পরিবর্তন হয় না। সেটা বিরাট বিজয় (সূরা ইউনূস, আয়াত ৬২-৬৪)।


অন্যান্য আয়াতে আল্লাহ উল্লেখ করছেন, যে বান্দারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে এবং নিজেদেরকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছে, তারা এক বিরাট বৃক্ষশাখার সাথে সংযুক্ত, যা ভাঙবে না কখনো। যারা আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ এবং সৎ কাজ করে, তারা সবচেয়ে বেশি সুদৃঢ় হাতল ধারণ করে। সকল কর্মের পরিণতি আল্লাহর দিকে (সূরা লুকমান, আয়াত নম্বর ২২)।

 

লেখক : রাজনীতি, ধর্ম ও বিজ্ঞান বিষয়ে তিন শ’র বেশি গ্রন্থের প্রণেতা এবং এগুলো ৭৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
ভাষান্তর : মোহাম্মদ আবু জাফর