আমি যেন একটি লাশ

Dec 11, 2015 02:46 pm

 সিরীয় কুর্দি শিশু আইলানের মর্মান্তিক মৃত্যু সারা দুনিয়ায় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। বাবা-মায়ের সাথে সমুদ্রপথে ইউরোপে তারা পাড়ি দিচ্ছিল আরো হাজার হাজার শরণার্থীর মতো। নৌকা ডুবে তিন বছরের কচি শিশু আইলানের মতো তার ভাই আলিপ (সে-ও শিশু) ও তাদের মা রেহানও প্রাণ হারিয়েছেন। গ্রিক সাগর সৈকতে ছোট্ট আইলানের উপুড় হওয়া লাশের ছবি মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছেন বিশ্বের কয়েক শ’ কোটি মানুষ। আইলান আজ একই সাথে, ইউরোপগামী অসংখ্য শরণার্থীর চরম ঝুঁকি ও দুর্গতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্যের চক্রান্তমূলক নীতির পরিণামের প্রতীক।সাংবাদিক ক্যাট্রিন কুনৎজ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আইলানের হতভাগা বাবা আবদুল্লাহর। তিনি বর্ণনা করেছেন তার মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতার। ভাষান্তর করেছেন রুবাবা রায়হানা

 

সিরিয়ায় (২০১১ সালে) যুদ্ধ বেধে যাওয়ার অল্প কয়েক দিন পরই পরিবার নিয়ে দামেস্ক ছেড়ে চলে যাই। কাজ করতাম হেয়ার ড্রেসারের। আমরা বাস করতাম রুকন আল দীন নামের কুর্দিপাড়ায়। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ আরো বেশি বিপজ্জনক হয়ে পড়েছিল। এমন অবস্থায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে কোবানি চলে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের কয়েকটি জলপাইগাছ ছাড়াও চাষাবাদের জমি ছিল। প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে আমরা চাষ করতাম। দামেস্ক আর কোবানি এই দু’টি শহরের মধ্যে অনবরত আসা-যাওয়া করতাম। শিগগিরই, পরিবারকে কোবানিতে রেখে ইস্তাম্বুল যাত্রা করলাম। উদ্দেশ্য ছিল, টেক্সটাইল মিলে কাজ করা।
প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা কাজ করতাম। রোজগারের টাকা কোবানিতে পাঠিয়ে দিতাম। নিজের খরচ বাঁচানোর জন্য কর্মস্থলেই ঘুমাতাম। নোংরা বেজমেন্টে ঘুমাতে হতো। আমার ‘বস’ রাতে বাইরে থেকে এর তালা লাগিয়ে দিতেন। তিন বছর এভাবেই কাটালাম। তখন নিয়মিত যেতাম পরিবার-পরিজনকে দেখার জন্য।
২০১৪ সালে আইএস কোবানি আক্রমণ করে বসে। তখন আমার ছেলে আইলানের বয়স দুই বছর আর গালিবের চার বছর মাত্র। হাজার হাজার মানুষের সাথে আমার স্ত্রী রেহান দুই ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে গেল। এরপরই রেহান প্রথমবারের মতো বলেছিল, ‘আমি এখন একমত, আমাদের সিরিয়া ছেড়ে চলে যাওয়া দরকার।’ এর আগে কোনো দিন সে দেশ ছাড়তে চায়নি।


আমার স্ত্রী ও সন্তানেরা ইস্তাম্বুলে এসে পৌঁছল। এ দিকে আরো আয়ের জন্য আমি নির্মাণশ্রমিকের কাজ খুঁজছি। এরপর প্রতিদিন ১১ ঘণ্টা করে কাজ করেছি। তখন দিনে সিমেন্টের দুই শ’ বস্তা বহন করে বিল্ডিংয়ের ওপরের তলাগুলোতে তুলতে হয়েছে। এটা কঠিন পরিশ্রমের দৃষ্টান্ত। তদুপরি, তুরস্ক আমাদের জন্য খুব ব্যয়বহুল দেশ। একটা রুম পেলাম আমাদের মাথা গোঁজার জন্য। রুমটা স্যাঁতসেঁতে ও অন্ধকার। তবুও মাসে মাসে ভাড়া গুনতে হতো ৪ শ’ লিরা যা ১১৬ ইউরোর সমান। আমার বোন কানাডায় আছে ২৫ বছর ধরে। সে এই ভাড়ার অর্থ পাঠাত।


পাঁচ মাস আগে আমরা প্রথমবারের মতো ভাবলাম তুরস্ক ত্যাগ করার কথা। এ দিকে গালিব আর আইলানের হয়েছিল চর্মরোগ। দিনে তিন দফা মলম লাগাতে হতো ওদের গায়ে। প্রতিদিন এক টিউব করে এটি কিনতে হতো, যার দাম ৭ লিরা। এতে মাসে খরচ হচ্ছিল ২১০ লিরা যা জোগাড় করা আমার পক্ষে ছিল অসম্ভব। বন্ধুবান্ধবের যারা ইউরোপ পাড়ি দিয়েছে, তারা বলেছে সেখানে জীবনমান উন্নত।

 

আমরা আপনাদের সাহায্য করব

সেই ২০১১ সালের নভেম্বরেই আমরা ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারায় জাতিসঙ্ঘের কাছে আবেদন করেছিলাম অন্য কোনো দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়লাভের জন্য। তারা বললেন, ‘আপনাদের মোবাইল ফোন চালু রাখবেন; আমরাই ফোনে এ ব্যাপারে জানাব। আপনাদের সাহায্য করব।’


আমার মোবাইলটা সবসময় চালু রাখলাম। কিন্তু জাতিসঙ্ঘের কেউ কখনো আমাদের সাথে যোগাযোগ করেননি। বোনের সাহায্য নিয়ে কানাডায় যাওয়ার জন্যও দরখাস্ত দিয়েছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে দিয়েছে। এসব ঘটার পরই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম জার্মানি যাওয়ার। সেখানে আমার ভাই হেইডেলবার্গের একটি অভ্যর্থনা কেন্দ্রে বাস করছে। আমরা স্থলপথে জার্মানি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুর্কি পুলিশ বুলগেরিয়া সীমান্তে আমাকে গ্রেফতার করে।


এ কারণে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, আমাদের পরিবারটি সমুদ্রপথে পাড়ি দেবে। সে জন্য আমরা গেলাম ইজমির। এত দিন পর হলেও স্ত্রী যে এসব ব্যাপারে সায় দিয়েছে, তা আমার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আমার সৎবাবা বললেন, আমার আগে একাই চলে যাওয়া উচিত। পরে পরিবারকে আইনসম্মতভাবে নেয়া যাবে।’ কিন্তু আমি তাদের ফেলে যেতে চাইনি।


ইজমির গিয়ে আমরা এক হোটেলে ১২ দিন অবস্থান করলাম। এ জন্য প্রতিদিন দিতে হয়েছে ৫০ ডলার।
তুরস্ক ও সিরিয়ার মানবপাচারকারীরা ইজমিরে একেবারে প্রকাশ্যে তৎপর। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের একজনকে আমরা পেয়ে গেলাম। প্রথমে সে চেয়েছিল ৬ হাজার ইউরো, মানে ৬ হাজার ৮০০ ডলার। তবে ছোট শিশু হিসেবে গালিব ও আইলান, দু’জন মিলে ‘একজন’ ধরা হলো। তাই আমাকে দিতে হয়েছে ৪ হাজার ইউরো। এই অর্থ আমার বোনের পাঠানো। আমরা এবার গেলাম বোদরুম। কারণ সেখান থেকে গ্রিস দূরে নয়।


আমরা চড়ে বসলাম মোটর বোটে। সম্ভবত, ৫ থেকে ৬ মিটার লম্বা, দুই মিটার চওড়া এই নৌকাটি। মনে হচ্ছিল, নৌযানটি নিরাপদ। চালক জানান, ‘মাত্র ১০ মিনিটে আমাদের সমুদ্রযাত্রা শেষ হয়ে যাবে।’
আমরা গন্তব্য দ্বীপটি দেখতে পাচ্ছিলাম। মনে হলো, এটি খুব কাছেই। সবাই বলছিল, এর নাম কস। পয়লা সেপ্টেম্বর রাত ১১টায় আমাদের নৌকা ছাড়ল।


সাগরের পানি ছিল শান্ত। মাত্র পাঁচ মিনিট যেতেই অবস্থা একেবারে বদলে যায়। সমুদ্র ছিল খুবই উত্তাল। চালক ফিরে আসতে চাইলেন। তখন একটি বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকা গেল উল্টে। মিডিয়ায় খবর এসেছে যে, তখন আমি নৌকাটি চালাতে শুরু করেছিলাম। এ কথা সত্য নয়। কারণ চালক যথারীতি ছিলেন আমাদের সাথে। এর মধ্যে আমাদের ফেলে চলে এসেছে পাচারকারীরা।


চার দিকে অন্ধকার। স্ত্রী ও সন্তানদের আর দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবে স্ত্রীর আর্তচিৎকার শুনছিলাম। ওর শেষ কথা ছিল, ‘আবু গালিব (গালিবের বাবা), ছেলেদের দিকে দেখুন।’ কিন্তু তাদের আঁকড়ে ধরে রাখতে আর পারছিলাম না। নৌকা ধরে থাকলাম, যে পর্যন্ত না আমাদের একজন তীরে পৌঁছে পুলিশ ডেকে এনেছিল। তারা রাতেই আমাকে একটা সেলে তালা মেরে আটকে রাখে।

 

এখন আমার যা আছে

ওই দিনের পর সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে গেছে। পুলিশ অফিসাররা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। তারা জানান, আমার পরিবারকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। আমি কাঁদলাম। দেখলাম তাদের লাশ।
রেহান আমার প্রিয় স্ত্রী। আইলান ছিল এমন এক শিশু যে সবসময়ই হাসিমুখে থাকত। সে অন্য শিশুদের ভালোবাসত। গালিব ছিল কিছুটা দুষ্ট; সর্বদা ছোটাছুটি করত।


সেপ্টেম্বরের ২ তারিখে পরিবারের তিনটি লাশ নিয়ে ইস্তাম্বুল হয়ে উরফা এলাম প্লেনে করে। তারপর সিরিয়া সীমান্ত পেরিয়ে এলো আমাদের গাড়ি। কোবানির কুর্দি সরকারের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার মুসলিম আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। বড় মিছিলসহকারে গাড়ি চলতে থাকে। হাজারেরও বেশি মানুষের উপস্থিতিতে দাফন অনুষ্ঠানে সময় লেগেছে তিন ঘণ্টা। এরপর শোকাহত মানুষ আমাদের দেখতে আসে বিধ্বস্ত বাড়িতে। সৎবাবার এ বাড়িতেই আমি এখন আছি।


কোবানি শহরে অবস্থান করার অর্থ, মৃতপ্রায় হয়ে থাকা। নেই কোনো অবকাঠামো; চার দিকে ধুলাবালি; ধ্বংসস্তূপের নিচে লাশ আর লাশ। নাকে লাগে ভীষণ দুর্গন্ধ। পোকামাকড়ের কামড়ে আমরা ঘুমাতে পারি না। শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত দুধ মেলে না; নেই ওষুধপত্র; পানি পাওয়া যায় কদাচিৎ।
না, তবুও কোবানি আর কোনো দিন ছেড়ে যাবো না। আমার পরিবারের কাছেই থাকতে চাই। এমনকি যদিও শুধু পোশাক ছাড়া তাদের আর কোনো কিছু নেই আমার কাছে। আর কোনো কাজ করতে পারছি না। মনে হচ্ছে, আমি মরে গেছি।