‘আমি আত্মাবিহীন দেহে পরিণত হয়েছি’

Dec 21, 2015 03:03 pm

 

অনির্দিষ্টকাল অন্তরীণ রাখার বিষয় পর্যালোচনা করে দেখা হবে বলে ওবামা প্রশাসন ওয়াদা করেছিল। তা-ও চার বছর পার হয়ে গেছে। আজো কারো কারো জন্য গুয়ান্তানামো কারাগার যেন এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন।
জাহের হামদুন গুয়ান্তানামোতে বন্দী প্রায় ১৪ বছর। তার বক্তব্য : আমার মনে হয়, ভারী কোনো কিছু বুকে চেপে আছে। যেন শ্বাস নিচ্ছি সুঁইয়ের ছিদ্রের মতো অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ ফাঁক দিয়ে। নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, যদি কিছু লিখতে বা বলতে পারি, কেউ কি আমার কথা শুনবে? তাহলে কি কোনো পরিবর্তন আসবে?


জাহের (৩৬) একজন ইয়েমেনি। বিনা অভিযোগে তাকে কিউবা দ্বীপের এই কারাশিবিরে কয়েদ করা হয়েছিল। বয়স তখন ২২। এখনো ১১৬ জন বন্দী গুয়ান্তানামো কারাগারে দিন কাটাচ্ছে। অথচ ছয় বছর আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা অঙ্গীকার করেছেন, এ কয়েদখানা বন্ধ করে দেয়া হবে। এবার গ্রীষ্মের শুরুতে আমার মক্কেল জাহের হামদুনকে দেখতে গিয়েছিলাম। সে একটা চিঠি দিলো যাতে ছিল তার প্রশ্ন।
জাহের জানতে চায়, ‘এমন কোনো দিন কি আসবে যখন আমিও অন্যদের মতো জীবন কাটাতে পারব? এমন একজন মানুষের মতো কি বাঁচতে পারব, যার আছে স্বাধীনতা, মর্যাদা, ঘরবাড়ি, পরিবার, চাকরি বা পেশা, স্ত্রী-সন্তান?


৫২ জনকে গুয়ান্তানামো থেকে স্থানান্তরের অনুমতি মিলেছে। তবে জাহের তাদের মধ্যে নেই। অন্য দিকে বন্দীদের ক্রমশ ছোট হয়ে আসা একটি তালিকাতেও সে নেই, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। জাহেরের মতো বন্দী হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র, যাদের ব্যাপারে প্রশাসন অভিযোগ না আনার সিদ্ধান্ত নিলেও কোনো দিন তারা মুক্তি পাবে কি না, কেউ জানে না। ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট ওবামা নির্দেশ দিয়েছিলেন, জাহের হামদুনের মতো বন্দীদের বিষয়টি মাঝে মাঝে পর্যালোচনা করার জন্য, যাতে বন্দিদশা অব্যাহত থাকা ন্যায়সঙ্গত কি না, সে ব্যাপারে সতর্কতার সাথে নিশ্চিত থাকা যায়। তবে ২০১৩ সালে বন্দীদের গণ-অনশন ধর্মঘট শুরু হওয়া পর্যন্ত এই ‘পর্যালোচনা’ শুরু করা হয়নি। এই প্রতিবাদ কর্মসূচি প্রশাসনকে বাধ্য করে আবার গুয়ান্তানামো ইস্যুকে গুরুত্ব দিতে। অবশ্য আজ পর্যন্ত জাহেরসমেত বেশির ভাগ বন্দীই রিভিউ বা পর্যালোচনার আওতায় আসেনি।


জাহের হামদুন কোনো অভিযোগ ছাড়াই গুয়ান্তানামোতে ১৪ বছর ধরে বন্দী। সে জানে না, কোনো দিন সে মুক্তি পাবে কি না। তবুও মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, এটা অনির্দিষ্টকাল অন্তরীণ রাখা নয়।
যখন জাহেরের সাথে সাক্ষাৎ করি, তার এই প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে পারিনি। ‘এমন অনেকেই ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে মুক্তির প্রতীক্ষায়, যাদের মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। তাদের কেউ কেউ প্রিয়জনকে আবার দেখার আগেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। এ সবকিছু স্মরণ করলে ওবামা কি বিবেকের দংশন বোধ করবেন? তিনি কি বিবেকের তাড়নায় গুয়ান্তানামো বন্দিশিবিরের অবসান ঘটাবেন? নাকি, আমরা রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের শিকার হয়ে থাকব, যে সঙ্ঘাতের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্কই নেই।’
যা হোক, গুয়ান্তানামো ইস্যুতে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে অনিয়মিতভাবে। এর কারণ, রাজনৈতিক ভীতি সৃষ্টি করা, বিচারিক পদক্ষেপ না নেয়া, অকার্যকর প্রশাসন, জনমনে আগ্রহের অভাব।


জাহের হামদুনের কথা হলো, দীর্ঘ সময় ধরে অনেকেই আমাদের নিয়ে লিখেছেন, বিক্ষোভ করেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, মামলা করেছেন আদালতে, করেছেন অবস্থান ধর্মঘট, বারবার অনশন ধর্মঘটও করেছেন। তা সত্ত্বেও হতাশাই ‘পরিস্থিতির প্রভু’ হয়ে উঠেছে। কারণ আশার তো কোনো আলো চোখে পড়ছে না। চার দিক থেকে রহস্য আমাদের ঘিরে ধরেছে। এখন ‘আশা’ আমাদের দৃষ্টিতে এমন জিনিস যার সম্পর্কে আমরা কেবল গল্প উপন্যাসেই পড়ে থাকি।’


গুয়ান্তানামোর বন্দীদের বিষয় পর্যালোচনার যে কচ্ছপগতি, ওবামার আমলে তা শেষ হবে না। যাদের ব্যাপারে পর্যালোচনা হয়েছে, বেশির ভাগই স্থানান্তরিত হওয়ার অনুমোদন পেয়েছে। তবুও তারা এখানেই কারানির্যাতন ভোগ করছে। বছরের পর বছর, তাদের নাম প্রশাসনের সে লম্বা তালিকায়, যারা আছে মুক্তির অপেক্ষায়।


মোটকথা, রিভিউ বা পর্যালোচনা সর্বরোগের মহৌষধ হওয়ার কথা কল্পনাও করা যায় না। অভিযোগ ছাড়াই স্থায়ীভাবে বন্দী করে রাখার অনুমতি প্রশাসন দিচ্ছে। রিভিউ এটাকে শুধু সীমিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে ব্যর্থতা।


জাহের হামদুন বলেছে, ‘আমি এখন এমন একটি দেহ যার নেই আত্মা। শ্বাস-প্রশ্বাস নিই, খাই-পান করি। কিন্তু আমি জীবিত প্রাণীদের দুনিয়ার কেউ নই। অন্য জগতের লোক হয়ে গেছি, যে জগতকে ‘গুয়ান্তানামো’ নামের কবরে সমাধিস্থ করা হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ি এবং জেগে উঠে অনুভব করি আমার আত্মা ও চিন্তাভাবনা সে জগতের যা টিভিতে দেখি, বইতে পড়ি। যে যাতনা সহ্য করে চলেছি, সে সম্পর্কে এটুকুই বলতে পারি।’
আবার শিগগিরই তাকে দেখতে যাবো। সে অপেক্ষা করছে তার কথাগুলো কাউকে শোনাতে।


মূল : পারদিস কেবরিয়ায়ি
ভাষান্তর : রুবাবা রায়হানা