সরকারের ভাবমর্যাদা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের উদ্বেগ

Dec 22, 2015 02:55 pm

আলফাজ আনাম

সরকারের ভাবমর্যাদা রক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নির্বাচন ভালো না হলে সরকারের ভাবমর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সুষ্ঠুভাবে পৌরসভা নির্বাচনের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সব পর্যায়ের ব্যক্তির কাছে সহযোগিতা কামনা করেছেন (মানবজমিন ২১ ডিসেম্বর ২০১৫)। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। নির্বাচনের সময় প্রয়োগের জন্য নির্বাচন কমিশনের যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া আছে, যাতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সব প্রার্থী, ভোটার ও সব রাজনৈতিক দলের কাছে সহযোগিতা নির্বাচন কমিশন চাইতেই পারে। কিন্তু এবার কমিশনকে একটু বেশি মাত্রায় উদ্বিগ্ন দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সরকারের ভাবমর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু খোদ নির্বাচন কমিশনের ভাবমর্যাদার কী হবে? সম্ভবত এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আর কোনো ভাবনার কারণ নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন আর উপজেলা নির্বাচন ‘সম্পন্ন’ হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের নতুন করে ভাবমর্যাদা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।

 

এখন প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশন সরকারের ভাবমর্যাদা নিয়ে কেন এত উদ্বিগ্ন? এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য সারা দেশে পৌরসভা নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণার সাথে সহিংসতার খবরের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। সরকারের অনুগত গণমাধ্যমে নির্বাচনে নৌকা আর ধানের শীষের লড়াইয়ের নানা বিবরণ আসছে। কিন্তু নৌকার সাথে বিদ্রোহী প্রার্থীদের লড়াইয়ের খবর খুব একটা আসছে না। সারা দেশে ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ৮৭টি পৌরসভাতেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থীদের নানাভাবে নির্বাচন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। প্রলোভন ও হুমকি কোনোটাই কাজে লাগেনি। ৮৭ জন মেয়র প্রার্থীর সাথে একই ওয়ার্ডে একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী তো আছেনই।


এ দিকে নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, বিরোধী দলের প্রার্থী-সমর্থকেরা আরো বেশি মাত্রায় বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। গত ২০ ডিসেম্বর দেশের কমপক্ষে ২০টি পৌরসভায় প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ও বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনী সহিংসতায় ইতোমধ্যে একজন নারীসহ অন্তত দুইজন মারা গেছেন। আগ্নেয়াস্ত্র, রাম দা, চাপাতি, লাঠির সাথে নির্বাচনী প্রচারণায় ক্ষমতাসীন দলসমর্থিত প্রার্থীদের হাতুড়ি নিয়েও প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা গেছে। কুষ্টিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের দুই প্রার্থীর সংঘর্ষে এক প্রার্থীকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়েছে। রাজধানীর কাছে সোনারগাঁওয়ে দুইপক্ষের সংঘর্ষে একজন মারা গেছেন। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আওয়ামী লীগের দুইপক্ষের সংঘর্ষের পর গাড়ি ভাঙচুর ও মহাসড়ক অবরোধ করে রাখা হয়। সর্বশেষ পটুয়াখালীতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর ওপর নির্বাচনী প্রচারে যাওয়ার সময় হামলা চালানো হয়। এতে ১০ জন আহত হয়েছেন। দিন যত যাচ্ছে, সহিংসতার মাত্রা তত বাড়ছে। নির্বাচনের মধ্যে পুলিশের অভিযানও অব্যাহত আছে। পুলিশ বিরোধী দলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের গ্রেফতার করছে। এবারের পৌরসভা নির্বাচনে বিরোধী দলের অনেক প্রার্থী ইতোমধ্যেই জেলে গেছেন। যারা বাইরে আছেন, তাদের সমর্থক-নেতাকর্মীরা মাঠে নামতে পারছেন না। এমনকি নির্বাচনের দিন পোলিং এজেন্ট করার লোক পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে তারা সংশয়ে আছেন। নির্বাচন কমিশন সঙ্ঘাত-সহিংসতা কিংবা আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যাপারে বড় ধরনের কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারছে না। একাধিক মন্ত্রী ও এমপির বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক জনকে শোকজ করার পর আবার দায়মুক্তিও দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যশোরে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী নির্বাচনের দিন সকালে কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন। কারণ, তার আশঙ্কা নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পেপার সরবরাহ করা হলে জোরপূর্বক সিল মেরে রাখা বা ছিনতাই করা হতে পারে। অতীতে কোনো নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের এমন শঙ্কার কথা জানানো হয়নি। নির্বাচনী সামগ্রী রক্ষা করার দায়িত্ব পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। নির্বাচনের আগেই পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, ব্যালট আর বাক্স ঠিক থাকবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।


বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনে মাঠে থাকতে পারছেন কি না বা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন কি না তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন খুব একটা চিন্তিত বলে মনে হয় না। তাদের চিন্তার বিষয় অন্যখানে। এ পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচনী সহিংসতার খবর এসেছে, তার প্রায় সবই ঘটেছে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে। বিরোধী দলের প্রার্থীরা ভয়ে ভয়ে নীরবে অনেকটা আড়ালে-আবডালে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের মেয়র-কাউন্সিলর প্রার্থীরা যেভাবে নিজেদের মধ্যেই সহিংস লড়াইয়ে নেমেছেন তা নিয়ে এখন রিটার্নিং কর্মকর্তারা ভয়ে ও শঙ্কায় রয়েছেন। কারণ, কোনো পক্ষের ক্ষমতা কম নয়। নির্বাচন কমিশন বা প্রশাসনের পক্ষে ক্ষমতাসীন দলের কোনো পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। ফলে নিজেদের মধ্যে শুধু খুনোখুনি বাড়বে না, প্রশাসনের কর্মকর্তারাও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়তে পারেন, যার ফলে শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণœ হতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এ দিকটি বিবেচনায় না নিলেও নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ বিষয়টি ঠিকই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এ কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সহযোগিতা কামনা করেছেন। এই সহযোগিতা তিনি কতটা পাবেন, তা এখন দেখার বিষয়।


সন্দেহ নেই, যদি নির্বাচন কমিশন এই সহযোগিতা না পায়, তাহলে দেশের মানুষকে উপজেলা নির্বাচনের মতো আরেকটি নির্বাচন হয়তো দেখতে হবে। এবার নির্বাচন যে উপজেলা নির্বাচনের চেয়ে খুব ভালো হবে না, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিরাও মনে হয় অনুমান করতে পারছেন। কারণ, নির্বাচন কমিশনারের মতো তারাও ‘সরকারের ভাবমর্যাদা রক্ষা’র ব্যাপারে বেশ উদ্বিগ্ন।


সাংবাদিকেরা বিশেষ করে টেলিভিশনগুলো যাতে কোনো নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে ভোটের লাইভ দৃশ্য প্রচার করতে না পারে, সে জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের ক্ষেত্রেও পুলিশ কড়াকড়ি কিছু ব্যবস্থার কথা বলেছে। সাংবাদিকদের প্রিজাইডিং বা রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমোদন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে হবে। নির্বাচনের দিন বোঝা যাবে, আসলে সাংবাদিকেরা কতটা লাইভ খবর দিতে পারছেন।


দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরকারের ভাবমর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে অনেক বেশি তৎপর ও কুশলী। আগের নির্বাচনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এমন প্রস্তাব দিয়েছেন।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের রিপোর্টের কারণে সরকারের মন্ত্রীরা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, তারা জনগণের ম্যান্ডেট পাননি। অপর দিকে নির্বাচন কমিশন কয়েক দিন খেটে ভোটার উপস্থিতির একটা সংখ্যা দাঁড় করিয়েছিল। নির্বাচন কমিশন ১৫৩ জন সংসদ সদস্যকে বিনাভোটে নির্বাচিত করার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের কফিনে শুধু পেরেক মারেনি, নিজেদের ভাবমর্যাদাও বিসর্জন দিয়েছিল। এ কারণে এখন নির্বাচনে সহিংসতা, জালিয়াতি, কারচুপি হলে কমিশনের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়া নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন নন। উপজেলা নির্বাচনে প্রথম থেকে তৃতীয় দফার নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীরা বেশির ভাগ উপজেলায় বিজয়ী হয়েছিলেন। তখন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় অনেকে খুশি হয়েছিলেন, আবার অনেকে তাজ্জব বনে গিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন কিভাবে স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে পারছে, তা নিয়ে গবেষণার অন্ত ছিল না। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিদেশ চলে যান। চতুর্থ ও পঞ্চম দফায় নির্বাচন কমিশন আগের অবস্থানে ফিরে গেলে বিরোধী দলের প্রার্থীদের নির্বাচনের মাঠ থেকে ঝড়ের গতিতে সরিয়ে দেয়া হয়। প্রায় সবগুলো উপজেলায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরাই বিজয়ী হন।


তুলনামূলকভাবে কম হাঙ্গামার মধ্য দিয়ে উপজেলা নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল। এর প্রধান কারণ হলো, প্রথম থেকে তৃতীয় দফা পর্যন্ত নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটায় সাধারণ মানুষ আশাবাদী হয়েছিল যে, বাকি নির্বাচনগুলোও হয়তো শান্তিপূর্ণ হবে। বিরোধী দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় সরকার সমর্থক বিশাল মিডিয়া অনেকটাই নীরব হয়ে যায়। ফলে চতুর্থ ও পঞ্চম দফায় একচেটিয়াভাবে ক্ষমতাসীনেরা বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হলেন। বিরোধী দলও আর এ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করেনি। কিন্তু এবার পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।

নির্বাচন কমিশন এখন ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন বা সহিংসতার সাথে জড়িয়ে পড়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না কমিশন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে আগেই মেরুদণ্ডহীন বলে অভিহিত করা হয়েছে। অবশ্য একজন নির্বাচন কমিশন সটান দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, তার মেরুদণ্ড সোজা আছে। এখন ক্ষমতাসীনদের চাপে এই সোজা মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। খানিকটা সোজা হয়ে দাঁড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীনদের সহযোগিতা কামনা করেছেন। নির্বাচন কমিশনের দিকে ক্ষমতাসীনদের তাকানোর সময় আছে বলে মনে হয় না। কারণ, তাদের এখন জেতার নেশায় পেয়ে বসেছে। যেকোনো উপায়ে জিতিয়ে দেয়ার কাজটি নির্বাচন কমিশন আগেই করে দিয়েছিল। এখন যতই সরকারের ভাবমর্যাদার কথা বলা হোক না কেন, নির্বাচন কমিশনের মতো সরকারও ভাবমর্যাদা অনেক আগেই বিসর্জন দিয়েছে।