পাশ্চাত্য নয়, কেবল আরবরাই পারে আইএসকে পরাজিত করতে

Dec 29, 2015 11:55 am

 

[ ৭৪ বছর বয়সী জার্মান সাংবাদিক জারগেন টোডেনহফার আইএস জঙ্গিদের সাথে ইরাকের মসুলে ১০ দিন কাটান। তিনিই প্রথম পশ্চিমা সাংবাদিক, যিনি আইএস জঙ্গিদের সাথে গিয়ে, থেকে জীবন্ত ফিরে এসেছেন। এই জঙ্গিরা তো যেকোনো অমুসলিমকে হত্যার ঘোষণা দিয়েই রেখেছে এবং তারা কোনো বিদেশী সাংবাদিককে গ্রহণও করে না। তাহলে টোডেনহফার প্রাণ নিয়ে ফিরে এলেন কিভাবে? আলজাজিরাকে সে কথাই বলেছেন তিনি ]

আলজাজিরা : আইএসের সাথে যোগাযোগ হলো কার মাধ্যমে। তাকে খুঁজেই বা পেলেন কিভাবে?
জারগেন টোডেনহফার : ফেসবুক। ফেসবুকের মাধ্যমেই আমি তাদের খুঁজে পাই। ওখানে ওরা ছিল ৮০ জনের মতো। ‘ওরা’ মানে জার্মান জিহাদি। আমি ওদেরকে লিখি যে, তারা কেন জিহাদি হয়ে জার্মানি ছেড়ে যুদ্ধে চলে গেল এ বিষয়ে আমি তাদের সাক্ষাৎকার নিতে পারি কি না। আমি ১৫ জনের জবাব পাই। তাদের মধ্যে একজন লিখে যে, আইএসআইএল-এর পক্ষে কথা বলার অনুমতি তার নেই, তবে সে আমাকে আইএসের মিডিয়া বিভাগের একজনের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারে।
তা-ই হয়। ওই লোকের সাথে এরপর সাত মাসব্যাপী আমার কথা হয়, সব মিলিয়ে কমপক্ষে ২০ ঘণ্টা। তাদের আদর্শ, যুদ্ধপরিস্থিতি এবং সাংবাদিক জেমস ফলেকে হত্যা করা নিয়ে কথা হয়। আমি আমার জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও কথা বলি। তাদের জানাই যে, নিরাপত্তার সত্যিকার গ্যারান্টি পেলেই কেবল আমি তাদের দেশে যেতে রাজি আছি।


আমাকে ‘খলিফা’র দফতর থেকে নিরাপত্তার গ্যারান্টিযুক্ত একখানা কাগজ দেয়া হয়। কিন্তু সত্যি বলতে কী, আমি জানতাম না এটি আসল নাকি ভুয়া। এটি জানাও আসলে কঠিন ছিল। এটি ভুয়াও হতে পারত। যাহোক, তাদের সাথে আরো কয়েক দফা আলোচনার পর আমি তাদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম। ভাবলাম, শুধু আমাকে বাগে পাওয়া এবং পেয়েই কল্লা কাটার জন্যই কি ওরা এতটা সময় আমার পেছনে খরচ করেছে! নাহ, এটা কোনো যুক্তির কথা হতে পারে না। বরং এটাই হতে পারে যে, এভাবে তারা পাশ্চাত্যের জন্য নিজেদের একটি দরজা খুলে দিচ্ছে অথবা এমনও হতে পারে, তারা দেখাতে চাচ্ছে যে, তারা (আলোচনার টেবিলের দিকে) প্রথম পদক্ষেপটি দিলো। কারণ, সাংবাদিকদের কতল করাটা কৌশল হিসেবে খুব ভালো বলে প্রমাণ হয়নি।


তারা জানত যে, আগে আমি তাদের বিরোধিতা করে খুব কড়া মন্তব্য করেছি। তারা এ-ও জানত যে, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের সাথেও আমি সাক্ষাৎ করেছি। আমি তাদের পরিষ্কার ভাষায় বলেছি যে, আমি মোটেই তাদের পক্ষে নই। তারা জবাবে বলেছে, ‘জানি। তাতে আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। তোমার মতামত নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমরা তোমাকে ডাকছি তুমি এখানে কী দেখেছ ফিরে গিয়ে সেটা বলার জন্য।’

 

আলজাজিরা : তারা কিভাবে সেন্সরশিপ আরোপ করে
টোডেনহফার : হ্যাঁ, এক অর্থে ওখানে সেন্সরশিপ আছে। যেমন কোনো কোনো সময় আমাদের ছবি তুলতে দেয়া হতো না। উদাহরণস্বরূপ বলি, গাড়িতে চলার সময় ছবি তোলা বারণ ছিল। কেননা, তারা চাইত না আমাদের প্রতি অন্যদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হোক। শেষ পর্যায়ে আমার তোলা ফটোও তারা নিয়ন্ত্রণ করে। আমি সব মিলিয়ে প্রায় আট শ’ ছবি তুলেছিলাম। ওরা আমার কাছ থেকে সবগুলো নিয়ে নেয় এবং ‘খুবই যৌক্তিকভাবে’ তার থেকে মাত্র নয়টি ছবি নষ্ট করে দেয়। উদাহরণ দিই : একটি ছবিতে আইএস যোদ্ধাদের দেখা যাচ্ছিল। এই ছবিটি ওরা নষ্ট করে ফেলে। আমাকে বলে, ছবিটি প্রকাশ পেলে এই যোদ্ধাদের পরিবার বিপদে পড়বে।

 

আলজাজিরা : সবচেয়ে জটিল আলোচনা বা ঝামেলার ইস্যুগুলো কি কি ছিল?
টোডেনহফার : তা তো সবটাই। কোনো কোনো সময় দেখা যেত খাবার বা পানি নেই। যেমন শেষের ক’দিন আমাদের খাওয়ার বলতে কিছুই ছিল না। এটাই স্বাভাবিক। কারণ, তারা এমন কোনো বাড়িতে থাকত, যেখানে তারা আছে বা থাকতে পারে এটাই কেউ ভাবত না। তাদের এভাবে পালিয়ে থাকতে হতো। নইলে মাথার ওপর আমেরিকান বোমা পড়তে দেরি হতো না। এরকম ঘটেছিল মসুলে। খুব কঠিন পরিস্থিতি। আমাদের কয়েকজন সঙ্গীকে শনাক্ত করে ফেলেছিল একটি ড্রোন এবং এরপরই শুরু হয় বোমাবর্ষণ।
এর পরের ঘটনাটিও খুবই অস্বস্তিকর। মসুলে কয়েক দিন কাটিয়ে আমরা চলে আসি রাক্কায়। কিন্তু আমরা তিন দিন দেরি করে ফেলেছিলাম। এসে দেখি কী, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টটি বোমা ফেলে গুঁড়িয়ে দিয়েছে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী। দরজা নেই, জানালা নেই, চার দিকে সব ভাঙা কাঁচের গুঁড়ো। যদি আমরা ঠিক সময়ে আসতাম, তাহলে কাউকেই আর বেঁচে থাকতে হতো না। দেরি হওয়ায় বেঁচে গেছি।


সীমান্ত পাড়ি দেয়াটও ছিল আরেক ঝামেলা। আমরা সীমান্ত পার হওয়ার দিনকয় আগে সেখানে গোলাগুলি হয় এবং সে কারণে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। এর ফলে পরিস্থিতিটা এরকম দাঁড়ায় যে, অস্ত্র-গোলাবারুদ এবং অন্য সব জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদে সীমান্ত পার হতে হলে আমাদের এক হাজার মিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। একজন মানুষ যখন প্রাণ হাতে নিয়ে চলে, তখন তার জন্য এক হাজার মিটার পথ একেবারে কম নয়। কারণ সীমান্তে অল্প কিছু পরপরই রয়েছে গান টাওয়ার, তার ভেতরে বসে আছে অস্ত্রধারী সৈন্যদল।
আইএসের সাথে আমার কয়েক দফা আলোচনা হয়। এই বৈঠক বা আলোচনাগুলো ছিল অত্যন্ত জটিল। জার্মান ভাষায় অনূদিত কুরআন আমি অনেকবার পড়েছি। কাজেই আমি তাদের কাছে ক্ষমার মূল্য সম্বন্ধে প্রায়ই জানতে চাইতাম। কিন্তু তাদের আচরণে আমি ক্ষমা ও দয়া বলতে কিছুই দেখতে পাইনি। বরং অমুসলিম নিধনে তারা খুবই উৎসাহী। তারা মুসলিম গণতন্ত্রীদেরও হত্যার পক্ষপাতী। কেননা তাদের মতে, এই মুসলিমরা আল্লাহর আইনের ওপর স্থান দেয় মানুষের আইনকে।


এসব নিয়ে কথা বলাটা ছিল খুবই কঠিন। বিশেষ করে যখন বলত যে, তারা কত লোককে হত্যা করতে চায়। তারা কয়েক কোটি মানুষকে মেরে ফেলার কথা বলত। এ ব্যাপারে তাদের উদ্দীপনা ছিল সীমাহীন। এই ব্যাপারটা আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকত না।

 

আলজাজিরা : আপনি তো ওদের কাছ থেকে ফিরে এলেন। কী নিয়ে এলেন?
টোডেনহফার : আইএস সম্বন্ধে আমার ভেতরে তিনটি কঠিন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, এই সংগঠনটিকে আমরা যতটা শক্তিশালী মনে করি, ওটা তার চেয়েও শক্তিশালী। তারা একটি এলাকা জয় করেছে, যা আয়তনে ব্রিটেনের চেয়েও বড়। এ ছাড়া প্রতিদিন শত শত নতুন যোদ্ধা তাদের দলে ভিড়ছে। তাদের উদ্দীপনা অবিশ্বাস্য রকম বেশি। আমি অতীতে অনেক রণাঙ্গন দেখেছি, কিন্তু এমনটা দেখিনি কোথাও।


দ্বিতীয়ত, ধর্মের নামে নির্মূল অভিযান। এটাও মাত্রাছাড়া। এবং তৃতীয়ত, আমি মনে করি, মুসলিম বিশ্ব সম্বন্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর যে নীতিকৌশল, তা সম্পূর্ণ ভুল। বোমা মেরে আমরা কখনোই সফল হতে পারব না। এভাবে আমরা আফগানিস্তানে সফল হইনি, ইরাকেও নয়। বোমা ফেলাকে বলা যায় সন্ত্রাসী প্রজনন কর্মসূচি। ২০০১ সালের আগে সন্ত্রাসবাদীর সংখ্যা ছিল অনেক কম। এই বোমাবর্ষণে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। আর এতে অসংখ্য সন্ত্রাসবাদীর জন্ম দিয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ ব্যাপকতর হয়েছে।

 

আলজাজিরা : আইএস দমনের সর্বোত্তম উপায় কোনটি বলে আপনি মনে করেন?
টোডেনহফার : মুসলিম বিশ্বকে আমাদের যথাযথ উপায়ে মোকাবেলা করতে হবে। তারাও আমাদের সমমর্যাদার এ কথাটা বুঝতে এবং সে অনুযায়ী আচরণ করতে হবে। পশ্চিমা দেশ ও সমাজে মুসলিমদেরকে আমাদের সমকক্ষরূপে বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে হবে। আরব দেশগুলোতে বোমা ফেলে আমাদের পাওয়ার কিছুই নেই। কারণ, ওটা আমাদের (এলাকা) নয়। তৃতীয়ত, আমি মনে করি, কেবল ইরাকি সুন্নিদের পক্ষেই সম্ভব আইএসকে পরাভূত করা। আগে তারা করেছেও। ২০০৭ সালে তারা আইএসের সাথে যুদ্ধ করে এবং তাদের হারিয়ে দেয়। অবশ্য আইএস তখন অনেক দুর্বল ছিল। তবে যা-ই হোক, আইএসকে পরাভূত করার এটাই একমাত্র পথ।


সুন্নিদের প্রতি বৈষম্য এবং তাদেরকে সমাজছাড়া করাটা পূর্বতন ও বর্তমান ইরাক সরকারের একটা বড় ভুল। সুন্নিরা যতক্ষণ না (সমাজে) একীভূত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আইএসের বিরুদ্ধে লড়বে না। তবে যদি ইরাক ও মার্কিন সরকার উদ্যোগ নিয়ে সুন্নিদেরকে ইরাকি সমাজে ফিরিয়ে আনে, তাহলে তারা আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত হবে।


তাই আমি বলতে চাই, পশ্চিমা দেশগুলো আইএসকে পরাজিত করতে পারবে না। কেবল আরবরা, কেবল ইরাকি সুন্নিরাই ওদের হারাতে পারবে। তবে এ অনেক দূরের পথ।


ভাষান্তর : ঐশী পূর্ণতা