ভোটের দিন শেষ এরপর...

Jan 05, 2016 12:43 pm


আলফাজ আনাম


ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তন বা স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের দিন শেষ হয়ে গেছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের মাধ্যমে যেভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় ভোটারদের অংশগ্রহণ ছাড়াই ভোটের বাক্স পূরণ হচ্ছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য এখন আর ভোটারদের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। শুধু ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের কৌশল জানতে হবে।


বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে চারটি নির্বাচন সম্পন্ন হলো। এসব নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন সফলভাবে ভোটের ওপর মানুষের আস্থায় ধস নামাতে পেরেছে। কারণ এসব নির্বাচনে বেশির ভাগ ভোটার তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়, তাতে ১৫৩ জন সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বাকি আসনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫ শতাংশেরও কম। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ৪০ শতাংশের মতো ভোট পড়ার অবিশ^াস্য দাবি করেছিল।


এরপর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় পাঁচ দফায়। প্রথম দুই দফা নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বেশির ভাগ উপজেলায় বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন। এই ফলাফলের পর নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের অবস্থান থেকে সরে আসে। বদলে যেতে থাকে নির্বাচনের পরিবেশ। দাঙ্গা-হাঙ্গামা আর ভোটকেন্দ্র দখলের মধ্য দিয়ে পরবর্তী তিন দফার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এতে প্রায় সব উপজেলায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হন। উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি, ভোটকেন্দ্র দখল ও খুনোখুনির পরও নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে বলে দাবি করেছিল।


এরপর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। নির্বাচনে কারচুপি ও কেন্দ্র দখল আরো নগ্নরূপে প্রকাশ পায়। দুপুরের মধ্যেই বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। এই নির্বাচন বর্জনের পর ক্ষমতাসীন দল ও সুশীলসমাজের কেউ কেউ দাবি করেন নির্বাচনের মাঝপর্যায়ে বিএনপির নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া ঠিক হয়নি। এরা প্রায়ই বলে থাকেন বিরোধী দলের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যাওয়া উচিত ছিল। বিরোধী দল নির্বাচনে থাকলে ক্ষমতাসীনেরা নাকি কারচুপি করার সুযোগ পেত না। কিন্তু পৌরসভা নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত মাঠে ছিল বিএনপি। তাতে ভোট ডাকাতি বা ক্ষমতাসীন দলের বলপূর্বক বিজয়ে কোনো হেরফের হয়নি। নির্বাচনে যেভাবে জালিয়াতি, ভোট ডাকাতি, এমনকি আগের রাতে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরানো হয়েছে, তাতে নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরো বেশি হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।


পৌরসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই ভোটের পরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিরোধী দলের প্রার্থীরা অনেক কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারেননি। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গ্রেফতার অভিযান এবং ক্ষমতাসীনদের নির্যাতনের ভয়ে অনেক ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট হতে কেউ সাহস করেননি। ভোটের দিন বেলা ১টার মধ্যেই শতভাগ ভোট পড়ার অদ্ভুত রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। দেশের ১৩৭টি পৌরসভায় ৭৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে, যা ছিল অস্বাভাবিক ঘটনা। এই নির্বাচনে জালিয়াতি তথ্য প্রমাণ দিয়ে হাজির করার দরকার পড়ে না। খোলা চোখে তাকালেই বোঝা যায়, কেন্দ্র দখলের মাধ্যমে ভোট সম্পন্ন হয়েছে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক দিক হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন এরপরও সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের দাবি করেছে।
প্রকৃতপক্ষে এই নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের নামে যে তামাশার আয়োজন করেছে, তাতে পরাজিত হয়েছে গণতন্ত্র। ভবিষ্যতে এমন নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন হলে সাধারণ মানুষ উৎসাহ হারিয়ে আর ভোটকেন্দ্রমুখী হবে না।

 

পৌরসভা নির্বাচনের ভোটের আগের রাতে মাদারীপুর, কুমিল্লাসহ দেশের বেশ কিছু স্থান থেকে শান্তিপূর্ণভাবে ব্যালট বাক্স ভরার কাজ সম্পন্ন হয়। ভোটের দিন সকালে কিছু কিছু এলাকায় ভোট হলেও দুপুরের আগেই সারা দেশে ভোট সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে যশোরের এম এম কলেজ কেন্দ্রে বেলা ১টার আগেই শতভাগ ভোট পড়ে। আড়াইটায় ভোট গণনা শুরু হয়। ৪টার আগেই শেষ। কোনো ভোটারকে কষ্ট করে কেন্দ্রে আসতে হয়নি। রাজধানীর পার্শ^বর্তী তারাবোর একটি কেন্দ্রে বেলা ১টায় একজন ভোটারকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমি নৌকায় ভোট দিমু আমারে একটা ব্যালট দ্যান।’ কিন্তু ততক্ষণে ব্যালট শেষ হয়ে গেছে। ফলে মধ্যবয়সী এই ভোটার আর ভোট দিতে পারেননি।


এভাবে দেশজুড়ে ভোট সম্পন্ন হওয়ার পর সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকীব উদ্দিন আহমদ দাবি করেন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট সম্পন্ন হয়েছে। তার এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে কলঙ্কিত ও জালিয়াতির নির্বাচনে বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতির ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করে ফেলেছে। এই নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, এমন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে কখনো হয়নি। এর মধ্যে নির্বাচন চলাকালীন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে কমিশনারদের সাথে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের জানান, বিএনপির চাপের কারণে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন, দেশের অসংখ্য ভোটকেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে কোনো বাধা বিঘœ ছাড়া ব্যালটে সিল মারা হয়। দোহারে একটি কেন্দ্রে পুলিশকেও জাল ভোট দিতে দেখা গেছে। আবার অনেক কিশোরকে লাইন ধরে ভোটকেন্দ্রে ঢুকে সিল মারতে দেখা গেছে। এক কিশোর টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে তার বাবার নাম বলতে পারছে না। আবার বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকেরাও লাঞ্ছিত হয়েছেন। বিটিভির পর ক্ষমতাসীন দলের প্রোপাগান্ডা মেশিন ৭১ টিভির এক নারী সাংবাদিকের চুল ছিঁড়ে ফেলে নৌকা প্রতীকের সমর্থকেরা। হবিগঞ্জের একটি ভোটকেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে।


এভাবে সহিসংতা, জালিয়াতি আর ভোট ডাকাতির পর নির্বাচনের ফলাফল দাঁড়িয়েছে ২২৭টি পৌরসভার মধ্যে ১৭৭টিতে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগ। ২২টিতে বিএনপি, স্বতন্ত্রসহ অন্যান্য ২৭ এবং সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি একটিতে বিজয়ী হয়েছে। স্বতন্ত্র ২৭ জনের মধ্যে জামায়াতের দু’জন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে ৭৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।


ভোটের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির প্রভাবাধীন বৃহত্তর নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে শুধু বিএনপি প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পারেননি তা নয়, তারা বিস্ময়কর কম ভোট পেয়েছেন। সীতাকুণ্ডের একটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী পেয়েছেন দুই হাজার ভোট আর বিএনপি প্রার্থী পেয়েছেন ৩০০ ভোট। রাজশাহী বিভাগের কয়েকটি জেলা ছাড়া সারা দেশে ভোটের চিত্র ছিল এ রকমই। কার্যত হামলা, মামলা, আর গ্রেফতারের ভয়ে অনেক স্থানে বিএনপি নেতাকর্মীরা মাঠেই নামতে পারেননি। অনেক কেন্দ্রে ভয়ে এজেন্ট দেয়া সম্ভব হয়নি।


ভোটের দিন সকালের দিকে যারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন ১১টার মধ্যে বেশির ভাগ কেন্দ্র দখল হওয়ায় অনেকে আর ভোটকেন্দ্রমুখী হননি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচন এবং সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচন যেভাবে সম্পন্ন হয়েছে তাতে মানুষ ভোটের ওপর তাদের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় আস্থাহীনতার মাধ্যমে এ দেশে গণতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বেজে উঠেছে। পৌরসভাগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের একদলীয় শাসনের পথ আরো একধাপ এগিয়ে গেল।


এখন প্রশ্ন হলো, যেনতেন উপায়ে এভাবে বিজয়ী হয়ে সরকার রাজনৈতিকভাবে কী অর্জন করতে চায়। প্রথমত সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে একদলীয় শাসন কায়েম করা। পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূলপর্যায়ে স্থানীয় সরকার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়া হলো। এর আগে উপজেলা নির্বাচনে বিরোধী দল সমর্থিত উপজেলা চেয়ারম্যানদের একের পর এক বহিষ্কার করা হয়েছে। এসব উপজেলায় ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত ভাইস চেয়ারম্যানদের এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

 

পৌরসভা নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষণার পর বিরোধী দলের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন আবারো নতুন করে শুরু হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫ জানুয়ারি বিএনপির কর্মসূচি ঘোষণার পর ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে একই দিন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ৫ জানুয়ারি সংবিধান রক্ষা দিবস পালন করেছে ক্ষমতাসীনরা। সংবিধান রক্ষার নামে জনগনের ভোটাধিকার হরন করা হয়েছে। গনতন্ত্রের জন্য এ দেশের মানুষ সংগ্রাম করেছিলো। সংবিধান গনতান্ত্রিক বাংলাদেশের দলিল। সংবিধানে জনগনের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। দুর্ভাগ্য সেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনগনের অধিকার হরন করা হচ্ছে। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের পথ যেভাবে রুদ্ধ করা হয়েছে একইভাবে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথও রুদ্ধ করা হচ্ছে।

 

আমরা লক্ষ করছি ক্ষমতাসীন দলের সাথে ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীরা এখন ভিন্নমত দমনের জন্য মিসরের পথ গ্রহণের কথা প্রকাশ্যে টেলিভিশনে বলছেন। কিছু দিন আগে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসি নির্বাচন নামের এক নাটকের আয়োজন করেছিলেন। তাতে কোনো ভোটার ভোট দিতে যাননি। জেনারেল সিসি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা গ্রহণে মিসরের পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। মানুষ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগ দাবি করে এ দলের জন্ম সেনাশাসনের বিরুদ্ধে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক দিক হচ্ছে, সেই দলটির বুদ্ধিজীবীরা এখন নিকৃষ্ট এক সেনাশাসকের পথ অনুসরণের জন্য সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে।


সরকারকে একটি বিষয় বুঝতে হবে ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে বা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথ বন্ধ করে নিপীড়নমূলক পন্থায় ক্ষমতায় থাকা যায়। কিন্তু এই ক্ষমতায় থাকার জন্য সাধারণ মানুষকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়। তাদের অধিকারগুলো হরণ করা হয়। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের শেষ পরিণতি হয় আরো করুণ। এ ধরনের নির্বাচন নির্বাচন খেলা মিসরের হোসনি মোবারক খেলেছেন, বাংলাদেশে জেনারেল এরশাদও খেলেছেন। কিন্তু তাদের পরিণতি শুভ হয়নি। জেনারেল সিসির পথ নয়, সরকারের উচিত গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ফিরে আসা। না হলে কোনো অবস্থাতেই দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না।