কাউন্সিলে ব্যস্ত দুই দল

Feb 09, 2016 10:32 am


মঈন উদ্দিন খান


আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে চলছে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি। মার্চের ২৮ তারিখ কাউন্সিল করবে আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি করতে চায় ১৯ মার্চ। কাউন্সিল সামনে রেখে দুটো দলেই এখন চাঙ্গা ভাব। কেন্দ্রীয় টিমে জায়গা করে নিতে পদপ্রত্যাশীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। একই সাথে নিষ্ক্রিয়রা রয়েছেন আতঙ্কে। দুটো দলেরই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পরিবর্তন আসছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপিতে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির তাগিদ অনেকটাই জোরালো।


বিএনপিতে আসছে নতুন নেতৃত্ব
আগামী ১৯ মার্চ বিএনপির কাউন্সিলের প্রাথমিক তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এ জন্য রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চিঠি দিয়ে অনুমতি চেয়েছে দলটি। কাউন্সিলের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে দলের অভ্যন্তরে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বিচারপতি টি এইচ খানকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পেতে পারেন। শারীরিকভাবে অসুস্থতার কারণে টি এইচ খান রাজি না হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব অন্য কাউকে দেয়া হতে পারে বলে দলটির তরফে জানা গেছে।


২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর সর্বশেষ কাউন্সিল করেছিল বিএনপি। তিন বছর পরপর কাউন্সিল অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও রাজনৈতিক জটিলতায় ছয় বছর ধরে আটকে আছে কাউন্সিল। এবারের কাউন্সিল তাই সৃষ্টি করেছে আলাদা মাত্রা।


বিএনপির নেতারা বলেছেন, কাউন্সিল উপলক্ষে দল গঠিত নির্বাচন কমিশন নিয়মানুযায়ী চেয়ারম্যান নির্বাচনের কাজ করবেন। যেহেতু বিএনপিতে খালেদা জিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র কেনেন না, সে ক্ষেত্রে কাউন্সিলের অনেক আগেই খালেদা জিয়া ফের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।


সাধারণত কাউন্সিলে দলের কাউন্সিলররা দলীয় চেয়ারপারসনকে জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেন। চেয়ারপারসন কারো কারো সাথে কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানান। দলের মহাসচিবও দলীয় চেয়ারপারসন নিয়োগ দেন। কাউন্সিলরদের দেয়া ক্ষমতাবলে চেয়ারপারসন যাকে যে পদেই নিয়োগ দেবেন, তিনিই নির্বাচিত বলে গণ্য হন।


এবার বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে। কাউন্সিলের পর বাদ পড়তে পারেন স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ অনেক বড় নেতা। বিগত আন্দোলনের ভূমিকা মূল্যায়নের ভিত্তিতে জায়গা দেয়া হবে নতুনদের।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেও বলেছেন, ‘দলের প্রতি যারা নিবেদিত, দলের সাথে বেঈমানি করেনি, করবে না, তাদেরই এবার জায়গা দেয়া হবে। সম্মানিত করা হবে।’


পঞ্চম কাউন্সিলের পর দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পান মরহুম খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ তিনি মারা যান। এরপর দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত তাকে ‘ভারমুক্ত’ করা হয়নি। আসন্ন কাউন্সিলে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করতে দলের মধ্যে জোরালো দাবি রয়েছে।


অতীতের মতো লবিং আর তদবির করে এবার গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা। দলের প্রতি অনুগত, বিগত আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে এমন ত্যাগী নেতাদের এবার গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে দুর্নীতিবাজ বলে ধারণা রয়েছে এমন নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে না আনতে পরোক্ষ পরামর্শও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে তরুণেরা।


আওয়ামী লীগে নানা সমীকরণ
আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনকে ঘিরে নানা সমীকরণ চলছে। এবারের সম্মেলনে কী কী পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন হচ্ছে তা নিয়ে দলে কৌতূহলের শেষ নেই। দলে জায়গা পাকাপোক্ত করতে নানাভাবে তৎপর হচ্ছেন বিভিন্ন সারির নেতারা। আর নতুন করে ঠাঁই পেতে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি পদ হারানোর আতঙ্কে রয়েছেন বর্তমান কমিটিতে থাকা বিতর্কিত নেতারা।


এবারের সম্মেলনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের কলেবর বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান ৭৩ সদস্য থেকে তা বেড়ে ৮১ অথবা ১০১-এ উন্নীত হতে পারে। সভাপতিমণ্ডলীর ১৫ সদস্য পদ থেকে বেড়ে ১৭, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ৩ থেকে বেড়ে ৫ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক বেড়ে ১০টি করা হতে পারে। আর সাধারণ সম্পাদকের পদমর্যাদায় দলের ‘মুখপাত্র’ পদ সৃষ্টি করা হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সম্মেলনের কাউন্সিলরদের সম্মতি ও গঠনতন্ত্রের সংশোধনীর ওপর।


আগামী ২৮ মার্চ আওয়ামী লীগের ২০তম ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনের মূল আকর্ষণের জায়গা দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ। দল ও সরকারের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই তৃতীয়বারের মতো দলের সাধারণ সম্পাদক হবেন নাকি নতুন কেউ এ পদে অভিষিক্ত হবেন তা নিয়ে খানিকটা কৌতূহল থাকলেও তার ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিত।


তবে এ পদে আসতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের আগ্রহী। গত সম্মেলনেও তিনি এ পদের প্রার্থী ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের সাথে এ বিষয়ে তিনি কথাও বলেন। গত পৌরসভা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই দলীয় সভাপতির কার্যালয়েও সময় দিচ্ছেন নিয়মিত। দলের নেতারা বলছেন, সম্প্রতি ওবায়দুল কাদেরের তৎপরতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।


এবারের সম্মেলনে আরো যারা দলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী তার মধ্যে রয়েছেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ও কাজী জাফরউল্যাহ। তবে এর বাইরেও আলোচনায় রয়েছেন দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা: দীপু মনি এবং দলের কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ড. আব্দুর রাজ্জাকের নাম। তবে এবারের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদকের পদমর্যাদায় একটি ‘মুখপাত্র’ পদ সৃষ্টি করা হতে পারে। যিনি সাধারণ সম্পাদকের অবর্তমানে সবসময় দলের অবস্থান তুলে ধরবেন। এ ক্ষেত্রে মাহবুবউল আলম হানিফের নাম এসেছে।


এ দিকে সাধারণ সম্পাদক পদ ছাড়াও সাবেক ছাত্রনেতাদের একটি বড় অংশ এবার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আসতে চাচ্ছেন। বিভিন্নভাবে তাদের কর্মকাণ্ড প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতির নজরে আনতে চাচ্ছেন।


দলের গঠনতন্ত্রের ১৮ ধারা অনুযায়ী ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সাধারণ সম্পাদক, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যবৃন্দ, কোষাধ্যক্ষ এবং সভাপতিমণ্ডলীর সহিত আলোচনাক্রমে সভাপতি কর্তৃক মনোনীত ২৬ জন সদস্যসহ মোট ৭৩ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদ গঠিত হইবে।’ আর ১৯ ধারায় বলা হয়েছে- ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি গঠনতন্ত্রের ১৮ ধারায় বর্ণিত কার্যনির্বাহী সংসদের ২৬ জন সদস্য সভাপতিমণ্ডলীর সহিত আলোচনাক্রমে মনোনয়ন দান করিবেন এবং উক্ত মনোনয়ন কাউন্সিল অধিবেশন সম্পন্ন হওয়ার ২১ দিনের মধ্যে ঘোষণা করিতে হইবে।’ বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমণ্ডলীতে দু’টি এবং সদস্য পদে দু’টি পদ ফাঁকা রয়েছে। আর দফতর সম্পাদকের দাবিদার ড. আবদুস সোবহান গোলাপ ও আবদুল মান্নান দু’জনই। দলের ওয়েবসাইটেও দু’জনের নামের পাশে দফতর সম্পাদক উল্লেখ করা আছে।
আওয়ামী লীগের ৩২টি সম্পাদকীয় পদকে ভেঙে ৪০ করা হতে পারে। এক্ষেত্রে অর্থ ও পরিকল্পনা, কৃষি ও সমবায়, তথ্য ও গবেষণা, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ, প্রচার ও প্রকাশনা, শিক্ষা ও মানবসম্পদ এসব সম্পাদকীয় পদগুলো ভেঙে আলাদা আলাদা করা হবে। আর নতুন করে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক ও মানবাধিকার সম্পাদক এমন কয়েকটি সম্পাদকীয় পদ সৃষ্টি করা হতে পারে। সাংগঠনিক ও যুগ্ম সম্পাদকের পদ বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে বর্তমান কমিটির কলেবর ৭৩-এ থাকলে কমে আসবে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসংখ্যা। তবে দলের একটি অংশ চায় কমিটির কলেবর ১০১ করা হোক। দলের গঠনতন্ত্রের এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছেন গঠনতন্ত্র সংশোধন উপকমিটির আহ্বায়ক ড. আব্দুর রাজ্জাক।


কাউন্সিলের মাধ্যমে দেশের বড় এই দু’টি রাজনৈতিক দলে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তা নেতাকর্মীরা ছাড়াও দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন অনেকেই।