ব্যাঙ্ক ডাকাতির তিনটি পদ্ধতি

Mar 16, 2016 08:45 am


হ্যারল্ড আর ড্যানিয়েলস
রূপান্তর : খসরু চৌধুরী


পাণ্ডুলিপিটা নিখুঁতভাবে টাইপ করা। সাথে একখানা চিঠিও পাঠিয়েছে হবু লেখক, যার শেষ লাইন ‘আপনাদের চলতি মূল্যেই প্রকাশের জন্য প্রেরিত হলো।’ চিঠিটা পড়ল ‘টেলস অব ক্রাইম অ্যান্ড ডিটেকশন’-এর সহকারী সম্পাদক মিস অ্যাডুইনা মার্টিন। দুটো জিনিস তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। একটা হলো গল্পের নাম ‘ব্যাঙ্ক ডাকাতির তিনটি পদ্ধতি। পদ্ধতি নং-১’। আরেকটা লেখকের নাম নাথান ওয়েইট। মিস মার্টিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেকটা গোয়েন্দা ঔপন্যাসিক আর গল্পকারকে কেবল নামেই চেনে না, তাদের প্রায় সবার সাথে তার কোনো না কোনোভাবে পরিচয় আছে, কিন্তু এ নামটা তার অপরিচিত ঠেকল।


চিঠিটায় একজন ‘পাখা মেলাতে উন্মুখ’ লেখকের স্বাভাবিক বকবকানি নেই, কিন্তু মাঝের একটা প্যারায় তার চোখ আটকে গেল। ‘আপনি হয়তো গল্পটার নাম পরিবর্তন করতে চাইবেন, কারণ রলিংস এখানে যা করছে, তা ঠিক ডাকাতি নয়। সত্যি বলতে কি, এটা সম্ভবত আইনসম্মত। এখন আমি আরেকটা গল্প লিখছি যার নাম দেবো ‘ব্যাঙ্ক ডাকাতির তিনটি পদ্ধতি। পদ্ধতি নং-২।’ টাইপ করা শেষ হলে আমি গল্পটা আপনাকে পাঠিয়ে দেবো। ২ নং পদ্ধতিটাকে আইনসম্মত বললেই চলে। আপনি যদি ১ নং পদ্ধতিটা পরীক্ষা করে দেখতে চান, সে ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো, ওটা আপনার নিজের ব্যাঙ্কারকে দেখান।


রলিংস গল্পটার প্রধান চরিত্র। তবে গল্পটা নীরস আর অযৌক্তিক ধরনের বড়; চরিত্রগুলো চিত্রণে লেখক ব্যর্থ হয়েছে, সে যেন ১ নং পদ্ধতিটা ব্যাখ্যাতেই সম্পূর্ণ ব্যস্ত। পদ্ধতিটা, ব্যাঙ্কে যাদের অ্যাকাউন্ট আছে তাদের চেকের ওপর ঋণ প্রদানসংক্রান্ত এক কথায়, এটা ব্যাঙ্কের সেই কারবারগুলোর একটা, যখন তারা তাদের গ্রাহকদের নিজ অ্যাকাউন্টে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা না থাকলেও চেক কাটতে বলে। চেক অনুসারে ব্যাঙ্ক ঋণ দেবে। বাড়তি কোনো দলিল বা সুপারিশের প্রয়োজন নেই। (গল্পে এটা পরিষ্কার যে, এই ধরনের ঋণ প্রদান পদ্ধতিতে লেখকের অবিশ্বাস রয়েছে)।


মিস মার্টিনের মনে হলো, ভদ্র ভাষায় বাতিলসংক্রান্ত একটা চিঠি লিখে গল্পটা ফেরত পাঠানোই ভালো। (সে কখনোই নির্দয়ভাবে ছাপানো বাতিল-স্লিপ সেঁটে দেয় না)। কিন্তু পদ্ধতিটার উপস্থাপনায় যে আত্মবিশ্বাস আছে, তা নিয়ে সে দ্বিধায় পড়ে গেল। শেষমেশ পাণ্ডুলিপিটার সাথে একটা স্মারকলিপি আটকিয়ে, ওপরে বড় একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে, ওটার দায়িত্ব সে চাপিয়ে দিল সম্পাদকের কাঁধে। পরদিনই সম্পাদকের কাছ থেকে গল্পটা ফেরত এল নোটসহ : ‘এটা একেবারে আবর্জনা, কিন্তু পদ্ধতিটা মনে হচ্ছে প্রায় খাঁটি। ওটা তুমি ফ্র্যাঙ্ক ওরডেলের কাছ থেকে যাচাই করে নিচ্ছ না কেন?’


মিস মার্টিনের প্রকাশকের কারবার যে ব্যাঙ্কের সাথে জড়িত, ফ্র্যাঙ্ক ওরডেল হলো সেটারই একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার সাথে লাঞ্চের একটা তারিখ স্থির করে, তার হাতে সে তুলে দিল চিঠি আর পাণ্ডুলিপিটা। আর ওরডেল ওগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তে, সে-ও কিছু প্রুফ দেখতে লাগল। কতক্ষণ পর বলতে পারবে না, মুখ তুলল সে ভাইস প্রেসিডেন্টের ঢোক গেলার শব্দে। সাদা চামড়ায় তার এখন সবজেটে ছোপ।


‘পদ্ধতিটা কাজ করবে?’ জানতে চাইল সে।
‘আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই’, কম্পিত স্বরে জবাব দিল ভাইস প্রেসিডেন্ট। ‘চেক ক্রেডিট ডিপার্টমেন্টের কারো একটা মতামত নিতে হবে। কিন্তু আমার ধারণা এটা কাজ করবে।’ সামান্য ইতস্তত করল সে। ‘হায় ঈশ্বর, আমাদের ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে যাবে কোটি কোটি ডলার! এবার শুনুন আপনারা নিশ্চয়ই এটা ছাপানোর কথা ভাবছেন না, নাকি ভাবছেন? মানে, আমি বলতে চাইছি, এই পদ্ধতি যদি একবার জনসাধারণের হাতে যায়’
ব্যাঙ্কিং মানসিকতার প্রতি মিস মার্টিন কখনোই শ্রদ্ধাশীল ছিল না, ফলে পরিষ্কার কোনো কথা দেয়া সম্ভব হলো না তার পক্ষে। ‘এটার সম্পাদনা দরকার’, বলল সে। ‘আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’
ঠেলে নিজের প্লেট সরিয়ে দিল ব্যাঙ্কার। ‘আর, সে বলছে তার কাছে আরো একটা আছে। তার দ্বিতীয় পদ্ধতি। ওটাও যদি এটার মতোই হয়, তাহলে পুরো ব্যাঙ্কিং ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’ তারপর হঠাৎ করেই যেন তার মনে পড়ে গেল একটা কথা। ‘গল্পটার নাম দিয়েছে সে ‘ব্যাঙ্ক ডাকাতির তিনটি পদ্ধতি।’ তার মানে তৃতীয় আরেকটা পদ্ধতি অবশ্যই রয়েছে তার কাছে। ভয়ঙ্কর! না না, আপনাকে এই গল্প আমরা ছাপতে দিতে পারি না, আর এক্ষুনি আমাদের দেখা করতে হবে ওই লোকটার সাথে।’


এ ধরনের আচরণ একেবারেই পছন্দ করে না অ্যাডুইনা মার্টিন, তাই হাত বাড়াল সে চিঠি আর পাণ্ডুলিপিটার জন্য। ‘ছাপব কি না সেই সিদ্ধান্ত নেব আমরা’, বলল সে ঠাণ্ডা স্বরে। কাতর হয়ে নানাভাবে জাতীয় অর্থনীতির মহাবিপর্যয়ের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার পরেই কেবল তাকে কাগজগুলো ব্যাঙ্কে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিল সে। এতই মুষড়ে পড়েছিল ওরডেল যে লাঞ্চের বিল দিতেই ভুলে গেল।
বেশ কয়েক ঘণ্টা পর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেখা করল তার সাথে। ‘আমরা একটা জরুরি মিটিং করেছি’, বলল সে তাকে। ‘চেক ক্রেডিটের অফিসাররা বলল যে প্রথম পদ্ধতি কাজ করবে। তাদের আশঙ্কা পদ্ধতিটা আইনসম্মত, আর যদি তা না-ও হয়, মামলা সামলাতেই আমাদের কয়েক কোটি ডলার খসে যাবে। শুনুন, মিস মার্টিন, আমরা চাই আপনি গল্পটার স্বত্ব কিনে আমাদের হাতে তুলে দেবেন। এতে কি তার গল্পটা অন্য কারো কাছে বিক্রি করার কবল থেকে রক্ষা পাব আমরা?’


‘এখন যে আকারে আছে তা থেকে অবশ্যই পাবেন’, বলল সে তাকে। ‘কিন্তু এ একই পদ্ধতির ব্যবহার দেখিয়ে নতুন একটা গল্প ফেঁদে বসা থেকে তাকে কেউই বাধা দিতে পারবে না।’ লাঞ্চের বিল দিতে ভুলে যাওয়ায় তাকে সহায়তা করার তেমন আগ্রহ মিস মার্টিনের নেই। ‘তা ছাড়া ছাপতে চাই না এমন কোনো লেখা আমরা কিনি না।’
কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে একটা মিটিংয়ের আয়োজন করা হলো সিটি ব্যাঙ্কিং অ্যাসোসিয়েশনের কমিটি আর প্রকাশকের মাঝে। সিদ্ধান্ত হলো, নাথান ওয়েইটের গল্প কিনে নিয়ে রাখা হবে সেটাকে বৃহত্তম ব্যাঙ্কের গহিনতম ভল্টে। জাতীয় অর্থনীতির মহাবিপর্যয় রোধের উদ্দেশ্যে।
‘অর্থনীতি’ শব্দটাই এ রকম পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উপযুক্ত, মনে মনে ভাবল মিস মার্টিন। মিটিংয়ে কুমিরের মতো চেহারার বুড়ো এক পুঁজিপতি আলোচনার মোড় ফেরাল নাথান ওয়েইটের পেমেন্টের দিকে। ‘গল্পটা আমাদের কিনতেই হবে’, ঘোঁত ঘোঁত করে উঠল সে। ‘এই ধরনের গল্পের জন্য আপনি কত দেন?’


এই লেখকের গল্প যেহেতু কোথাও প্রকাশিত হয়নি, তার নামের কোনো মূল্য নেই, এটা বিবেচনা করে একটা অঙ্কের উল্লেখ করল মিস মার্টিন। ‘গল্পটা যেহেতু কখনোই ছাপানো হবে না’, বলল সে, ‘বিদেশী আয় বা সঙ্কলনের সম্মানীর প্রশ্ন আসছে না, অবশ্য সম্ভাব্য সিনেমা কিংবা টিভিস্বত্বটা হিসেব থেকে বাদ দিলে।’ (স্পষ্টতই শিউরে উঠল কুমির।) ‘সুতরাং আমার মতে লেখককে চলতি পেমেন্টের চেয়ে একটু বেশি দেয়াটাই যুক্তিযুক্ত হবে।’


প্রতিবাদ করল কুমির। ‘না না, এত পেমেন্টের কথা আমরা ভাবতেই পারি না। কারণ টাকা যা চলে যাবে তা আর কোনো দিনই ফেরত পাব না আমরা। তা ছাড়া দ্বিতীয় পদ্ধতি আর তৃতীয় পদ্ধতিও কিনতে হবে। মনে রাখবেন কথাটা। একই পদ্ধতির ব্যবহার দেখিয়ে সে যেন আর কখনোই গল্প লিখতে না পারে, এমন একটা উপায়ও খুঁজে বের করতে হবে আমাদের। অতএব চলতি পেমেন্টই যথেষ্ট। কোনো রকম অতিরিক্ত টাকা দেয়া যাবে না।’


‘যেহেতু অ্যাসোসিয়েশনের আওতায় রয়েছে ৩০টা ব্যাঙ্ক, আর গল্পটার জন্য ব্যাঙ্ক পিছু খরচা হবে ১০ ডলারেরও কম, মিস মার্টিন কুমিরকে ঠেলে দিতে পারল না আরো বড় বিপদের মুখে।
সেদিনই একটা চেক আর একটা চিঠি মিস মার্টিন পাঠিয়ে দিল নাথান ওয়েইটের নামে। চিঠিতে ব্যাখ্যা করা হলো যে, এ মুহূর্তে কোনো তারিখ ফাঁকা না থাকায় গল্পটা প্রকাশ করা যাচ্ছে না, কিন্তু সম্পাদক ব্যাঙ্ক ডাকাতির দ্বিতীয় আর তৃতীয় পদ্ধতিসংবলিত গল্প দুটো দেখার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন। চিঠিটাতে স্বাক্ষর করল সে অত্যন্ত অপছন্দের সাথে। তার জানা আছে, সম্পূর্ণ নতুন একজন লেখকের কাছে গল্প প্রকাশিত হওয়ার যশের তুলনায় চেকের কোনো গুরুত্বই নেই। এ গল্প তো আবার কখনোই প্রকাশিত হবে না।
এক সপ্তাহ পর এসে পৌঁছল একটা চিঠি আর ‘ব্যাঙ্ক ডাকাতির তিনটি পদ্ধতি : পদ্ধতি নং ২’-এর পাণ্ডুলিপি। গল্প যথারীতি জঘন্য কিন্তু পদ্ধতিটায় মনে হচ্ছে কোনো ফাঁক নেই। এবারে সে উল্লেখ করেছে ম্যাগনেটিক ইঙ্ক আর ডেটা প্রসেসিংয়ের কথা। আগের ব্যবস্থা অনুসারে মিস মার্টিন ওগুলো নিয়ে গেল ফ্র্যাঙ্ক ওরডেলের অফিসে। দ্রুত পড়া শেষ করে শিউরে উঠল ব্যাঙ্কার। ‘এই লোকটা একটা জিনিয়াস’, বলল সে বিড়বিড় করে। ‘অবশ্যই এ ক্ষেত্রে একটা পটভূমি রয়েছে তার’
‘সেটা কী? তার পটভূমির ব্যাপারে আপনিই বা জানলেন কিভাবে?’ জানতে চাইল অ্যাডুইনা।


কাঠখোট্টাভাবে সে বলল, ‘তার সম্বন্ধে পুরোপুরি খোঁজখবর নিয়েছি আমরা। তার অনুসন্ধান চালিয়েছে সেরা ডিটেকটিভ এজেন্সিগুলোর একটা আপনি প্রথম চিঠিটা আমাকে দেখানোর পর থেকেই। সন্দেহজনক কিছুই বের করা যায়নি।’
মিস মার্টিনের স্বর একদম নিরুত্তাপ। ‘আপনি কি মি. ওয়েইটকে নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছেন, যে মানুষটার কথা জেনেছেন কেবল আমাদের যোগাযোগের সূত্র ধরে?’
‘নিশ্চয়ই।’ ওরডেলের স্বরে খেলা করল সামান্য বিস্ময়। ‘মানুষটার জ্ঞান খুবই বিপজ্জনক। এটা ভাগ্যের ওপরে ছেড়ে দিয়ে বসে থাকা সম্ভব নয় যে, বিপজ্জনক ওই জ্ঞান নিয়ে সে কেবল গল্প লিখেই ক্ষান্ত থাকবে। না না, এই ব্যাপারে অবহেলা করা সম্ভব নয়। একটা ব্যাঙ্কে সে চাকরি করেছে বছরের পর বছর। কানেকটিকাটের ছোট্ট একটা শহরে। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ তাকে বিদায় করেছে বছরখানেক আগে। পদ খালি করতে হয়েছিল প্রেসিডেন্টের ভাগ্নের জন্য। তাকে অবশ্য পেনশন দেয়া হয়েছে। মূল বেতনের শতকরা দশ ভাগ।’
‘আপনি বলছেন, বছরের পর বছর। কত বছর?’


‘আমার মনে নেই। রিপোর্ট দেখতে হবে। পঁচিশ বছর, সম্ভবত।’
‘তাহলে তো চাকরি থেকে বিদায় করার জন্য তার কোনো ক্ষোভ থাকার কথা নয়,’ স্বর তার এখনো নিরুত্তাপ। হাত বাড়িয়ে দিল সে। ‘চিঠিটা আরেকবার দেখি।’
দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপির সাথে চিঠিটায় প্রকাশককে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে প্রথম গল্পটা গ্রহণ আর চেক পাঠানোর জন্য। একটা প্যারায় লেখা, ‘আমার ধারণা, আমার পরামর্শ অনুসারে আপনি আপনার ব্যাঙ্কারকে দিয়ে পদ্ধতি নং ১ পরীক্ষা করিয়ে নিয়েছেন। আশা করি পদ্ধতি নং ২-ও আপনি তাকে দেখাবেন এটা কার্যকরী কি না, তা যাচাই করার উদ্দেশ্যে। প্রথম চিঠির মতো এখানেও বলছি, ২ নং পদ্ধতিটাকে আইনসম্মত বললেই চলে।’
মিস মার্টিন জানতে চাইল, ‘এটা কি আইনসম্মত?’
‘কোনটা আইনসম্মত?’
‘দ্বিতীয় পদ্ধতি। যেটা আপনি এই মাত্র পড়লেন।’


‘বলতে পারেন ইচ্ছে করলে। এটা বেআইনি নয়। এটাকে বেআইনি করতে চাইলে, ডেটা প্রসেস ব্যবহারকারী প্রত্যেকটা ব্যাঙ্ককে তাদের প্রণালীতে আনতে হবে আমূল পরিবর্তন। এতে লেগে যাবে মাসের পর মাস, ইতোমধ্যে আমাদের ক্ষতি হবে প্রথম পদ্ধতির চেয়েও বেশি। এটা একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার, মিস মার্টিন অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।’
পদ্ধতি নং ২ আতঙ্ক ছড়াল সিটি ব্যাঙ্কিং অ্যাসোসিয়েশনের কক্ষে কক্ষে। সর্বসম্মত রায় হলো, দ্বিতীয় গল্পটাও যথা শিগগির কিনে রেখে দিতে হবে লোকচক্ষুর আড়ালে। এতেও সবাই একমত হলো যে পদ্ধতি নং ৩ যেহেতু আরো সর্বনাশা হতে পারে, মি. ওয়েইটের গল্পের অপেক্ষায় আর সময় নষ্ট করা সম্ভব নয়। (মিস মার্টিন উপস্থিত থাকায় তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, একটা চেক পেয়ে ইতোমধ্যে পেশাদার লেখক বনে যাওয়ায় মি. ওয়েইটের দ্বিতীয় গল্পটার পেমেন্ট অপেক্ষাকৃত বেশি হবে কি না। কুমির যুক্তি দেখার, চেক পেলেও ওয়েইটের গল্প প্রকাশিত হয়নি, অতএব তাকে অতিরিক্তি পেমেন্ট দেয়াটা ন্যায়সঙ্গত হবে না।)


একটা পরিকল্পনা আঁটা হলো। মিস মার্টিন কানেকটিকাট থেকে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাবে মি. ওয়েইটকে, একটা লেখক আর সম্পাদকের শুভেচ্ছা-আলাপের ভান করে। আসলে তাকে উপস্থিত করা হবে সিটি ব্যাঙ্কিং অ্যাসোসিয়েশন মনোনীত একটা কমিটির সামনে। ‘আমাদের উকিলরাও থাকবে সেখানে,’ বলল কুমির। ‘প্রথমে আমরা তার ভেতরে জাগাব আতঙ্ক। তাকে বলাব তৃতীয় পদ্ধতির কথা। যদি দিতে হয়, তৃতীয় গল্পটার জন্যও তাকে পেমেন্ট দেব আমরা। তারপর সবাই মিলে বের করব তার মুখ বন্ধ করার মতো একটা বুদ্ধি।’


এ পরিকল্পনার পর মিস মার্টিন, অন্যান্য সহসম্পাদক আর প্রকাশক সেখান থেকে ফিরল অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে। তার বারবার মনে হতে লাগল, নাথান ওয়েইটের প্রথম গল্পটা বাতিল করলেই বোধ হয় সবচেয়ে ভালো হতো। বিশেষ করে সে বিরক্ত হয়েছে ব্যাঙ্কারদের মনোভাবে। তাদের চোখে নাথান ওয়েইট যেন সাধারণ একজন অপরাধী ছাড়া আর কিছুই নয়।


নাথান ওয়েইটকে তার কানেকটিকাটের বাড়িতে ফোন করে সে আসার আমন্ত্রণ জানাল। সে মনে মনে সঙ্কল্পবদ্ধ হলো, মি. ওয়েইটের আসা-যাওয়ার সব খরচ দিতে সে বাধ্য করাবে সিটি ব্যাঙ্কিং অ্যাসোসিয়েশনকে, এতে তার যে কৌশলই অবলম্বন করতে হোক না কেন।
সামান্য ইয়াংকি টান ছাড়া ফোনে তার স্বর শোনাল প্রায় তরুণদের মতো। ‘একের পর এক দুটো গল্প বিক্রি হওয়ায় নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। আপনার প্রতি আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ, মিস মার্টিন। খুশিমনেই আমি যাব আপনার সাথে দেখা করতে। যত দূর ধারণা করতে পারছি, আপনি আলাপ করতে চান আমার পরবর্তী গল্পটার ব্যাপারে।’


বিবেক তাকে দংশন করতে লাগল। ‘হ্যাঁ, মানে, মি. ওয়েইট, আপনার প্রথম আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে এমন তীক্ষè বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন যে, তৃতীয় পদ্ধতিটার প্রতি কৌতূহল থাকাটাই তো স্বাভাবিক।’
‘আপনি কেবল আমাকে নেট বলে ডাকবেন, মিস। এবার তৃতীয় পদ্ধতি সম্বন্ধে একটা কথা : এটাতে আইনবিরুদ্ধ কিছু নেই। সত্যি বলতে কী, আগাগোড়াই সৎ এটা। মানে, প্রথম আর দ্বিতীয়টার তুলনায়। আপনি কি প্রথম আর দ্বিতীয়টা আপনার ব্যাঙ্কারকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিয়েছিলেন? আমার অনুমান, প্রথম পদ্ধতিটা আপনি অবশ্যই দেখিয়েছেন গল্প কেনার আগে। ভাবছি, দ্বিতীয় পদ্ধতিটা তার মনে ধরেছে কি না।’
দুর্বল স্বরে সে বলল, ‘হ্যাঁ, খুবই।’


‘তাহলে তৃতীয় পদ্ধতির ব্যাপারে তিনি অবশ্যই আগ্রহী হবেন।’
দুই দিনের মধ্যেই সে আসবে বলার পরে তাদের আলাপ শেষ হয়ে গেল।
মিস মার্টিনের অফিসে এল সে একদম সময় ধরে পঞ্চাশোর্ধ্ব ছোটখাটো একজন মানুষ, চকচকে সাদা চুল পুরনো দিনের কেতায় মাথার একপাশে আঁচড়ানো। তার মুখ তামাটে, বুদ্ধিদীপ্ত নীল চোখজোড়ার সাথে যা বেশ মানিয়ে গেছে। তার বোকরার ধরন মিস মার্টিনের বেশ ভালো লাগল। বেরিয়ে এল সে তার ডেস্কের পেছন থেকে। ‘মি. ওয়েইট’
‘নেট।’
‘বেশ। নেট। পুরো ব্যাপারটাই এত বিরক্তিকর, বুঝতে পারছি না আমরা আলাপ শুরু করব কিভাবে। নেট, আপনার গল্পগুলো আমরা ছাপানোর জন্য কিনিনি। সত্যি বলতে কি, গল্পগুলো বাজে। আমরা ওগুলো কিনেছি ব্যাঙ্ক হ্যাঁ, ব্যাঙ্ক আমাদের কিনতে বলেছে তাই। তারা ভয় পেয়েছে যে গল্পগুলো ছাপা হলে, জনসাধারণ আপনার দুই পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করবে।’


সে ভ্রƒ কুঁচকাল। ‘আপনি বলছেন, বাজে। শুনে হতাশ হলাম। আমি তো ভেবেছিলাম দ্বিতীয় পদ্ধতির গল্পটা অত খারাপ নয়।’
তার বাহুর ওপর একটা সহানুভূতির হাত রাখল মিস মার্টিন, আর মুখ তুলতে দেখল সে মুচকি মুচকি হাসছে। ‘অবশ্যই গল্পগুলো বাজে’, বলল সে। ‘ইচ্ছে করেই ওগুলো আমি ওভাবে লিখেছি। বাজি রেখে বলতে পারি, ভালো গল্পের মতোই খারাপ গল্প লেখাও খুব কঠিন। ব্যাঙ্ক তাহলে ভাবছে পদ্ধতিগুলো কাজ করবে, অ্যাঁ? আমি এতে অবাক হইনি। অনেক ভাবনাচিন্তা করেছি এগুলো নিয়ে।’
‘তারা আরো বেশি আগ্রহী তৃতীয় পদ্ধতির ব্যাপারে’, বলল তাকে মিস মার্টিন। ‘আজ বিকেলে সাক্ষাৎ করে পরবর্তী গল্পটা কেনার বিষয়ে তারা আপনার সাথে আলোচনা করতে চায়। আসলে তারা আপনাকে পেমেন্ট দিতে চায় গল্পটা না লেখার জন্য।’
‘তাতে সাহিত্য জগতের অপূরণীয় কোনো ক্ষতি হবে না। তো, কাদের সাথে আলোচনায় বসব আমরা? সিটি ব্যাঙ্কিং অ্যাসোসিয়েশন? এক বুড়ো, চেহারা যার কুমিরের মতো?’


পিছিয়ে গিয়ে ভালোভাবে তাকাল মিস অ্যাডুইনা মার্টিন। ‘আপনি তো সবই জানেন দেখছি’, অভিযুক্ত করল সে তাকে।
মাথা ঝাঁকাল নাথান ওয়েইট। ‘সব নয়। তবে অনুমান করেছিলাম যে এ রকম হতে পারে। বিশেষ করে, তারা আমার পেছনে একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি লাগানোর পর।’
‘তাদের এমন করার কোনো দরকার ছিল না’, বলল সে রেগেমেগে। ‘আপনাকে জানাতে চাই যে এ ঘটনার সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। আমরা এটা জেনেছি অনেক পরে। আর আমি আপনার সাথে মিটিংয়েও যাব না। এ ব্যাপার থেকে আমি হাত-পা পুরোপুরি মুছে ফেলতে চাই। আপনার পরবর্তী গল্প তারা নিজেরাই কিনুক।’
‘আমি চাই আপনি যান,’ বলল নাথান। ‘মিটিংটায় আপনি মজা পেতে পারেন।’
সে যেতে রাজি হলো এই শর্তে যে, তাকে আরো বেশি টাকা দাবি করতে হবে। ‘আমিও বেশি দাবি করার কথা ভাবছিলাম,’ বলল নাথান তাকে। ‘তারা যখন আবার তৃতীয় পদ্ধতিতে এতটাই আগ্রহী।’
লাঞ্চে নাথান বলল তার ব্যাঙ্কিং পেশা আর কানেকটিকাটের ছোট্ট শহরের জীবনযাত্রার কথা। সে জানল, সরল-সোজা বাচনভঙ্গির এ মানুষটা ছিল বিখ্যাত এক শৌখিন গণিতবেত্তা, সাইবারনেটিকস বিশেষজ্ঞ, আর সম্মানিত জ্যোতিষী।


কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে নাথানের ভেতর থেকে কিছু দর্শনও বেরিয়ে এল। ‘ব্যাঙ্ক বিদায় করে দেয়ায় আমি মোটেই ভেঙে পড়িনি’, বলল সে। ‘আত্মীয়পোষণ আমাদের দেশে সব সময়ই ছিল। আমি বড় কোনো শহরের ব্যাঙ্কের পুঁজিপতি হতে পারতাম, কিন্তু আমি এই জীবন নিয়েই তৃপ্ত, কারণ জীবনটা আমি যাপন করতে পেরেছি একদম নিজের মতো করে। আমি মূলত অলস মানুষ। স্ত্রী মারা গেছে আমাদের বিয়ের কয়েক বছর পরেই আর কেউই আসেনি আমার অলসতা দূর করতে।


‘তা ছাড়া ছোট্ট শহরের ছোট্ট ব্যাঙ্কের আনন্দই আলাদা। এখানে সবার টাকা-পয়সা আর সমস্যার কথা খুব সহজে জানা যায় বলে, মাঝে সাঝেই নিয়ম-কানুন ভেঙে তাদের দিকে বাড়ানো যায় সহায়তার হাত। এখানে ব্যাঙ্কার প্রায় ডাক্তারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ,’ একটু থামল সে। ‘তবে এখন সেই অবস্থা আর নেই। এখন সবকিছুই শৃঙ্খলা আর কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণে, মনুষ্যোচিত গুণাবলির প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আগে ব্যাঙ্কার বলতে যা বোঝাত তেমন কিছুই আপনি আর পাবেন না। এখন রয়েছে একজন ফিন্যান্সিয়াল এক্সিকিউটিভ যে কেবল বড় একটা করপোরেশনের অংশ, আর যার রয়েছে বোর্ড অব ডিরেক্টরসের কাছে জবাবদিহির দায়। তাকে কাজ করতে হয় কঠোর একরাশি আইনের আওতায়, যে আইন মানবিকতার কোনো ধার ধারে না।’
তন্ময় হয়ে শুনছিল মিস মার্টিন, ইশারা করল সে আরো কফির জন্য।


‘এই যেমন ডিপোজিট স্লিপের কথাই ধরুন’, বলতে লাগল সে আবার। ‘গেলেন আপনি একটা ব্যাঙ্কে, স্লিপ নিয়ে পূরণ করলেন নাম, ঠিকানা আর কত টাকা আপনি জমা করতে চান। ব্যাপারটা জমাকারী আর ব্যাঙ্ক কর্মচারী উভয়ের জন্যই চমৎকার। ‘আমার নাম জন ডো আর আমি এই টাকাটা উপার্জন করেছি আর এখানে আমি বাস করি আর এত টাকা আমি আপনাদের ব্যাঙ্কে জমা রাখতে চাই।’ পূরণ শেষে স্লিপটা আপনি নিয়ে গেলেন ক্যাশিয়ারের কাছে আর ক্যাশিয়ারও সেটায় তারিখসহ সিল মেরে আপনাকে ছেড়ে দিল মিনিটখানেকের মধ্যেই।’


নেট চিনি মেশাল তার কফিতে। ‘শিগগিরই ক্যাশিয়ার বলতে আর কিছু থাকবে না। এখনই বেশিরভাগ ব্যাঙ্কে ডিপোজিট স্লিপ আর পূরণ করতে পারবেন না আপনি। তারা আপনার নাম আর অ্যাকাউন্ট নম্বরসহ পাঠাবে কম্পিউটার ইনপুট কার্ড। আপনাকে পূরণ করতে হবে কেবল তারিখ আর টাকার অঙ্ক। কেরানির পদ না থাকায় ব্যাঙ্কের যে টাকাটা বাঁচে, সেটা আবার তারা ব্যয় করে দুর্বলচিত্ত টিভি অ্যাডভারটাইজিংয়ের পেছনে। আমি ওই গল্পগুলো লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছি একটা ব্যাঙ্কের টিভি অ্যাড দেখে।’


মিস মার্টিন হাসল। ‘নেট, আপনি আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছেন।’ হাসি মুছে গেল। ‘কিন্তু আপনি যদি তৃতীয় পদ্ধতি দিয়ে তাদের ঘোল খাওয়াতে পারেন, বুদ্ধিতে হেরে যাওয়ার কষ্ট ছাড়া তারা আর কিছুই পাবে না। টাকা যা আপনাকে দেবে সেটাও যাবে না তাদের পকেট থেকে, আর হাজার হাজার ডলার তাদের হাতের ময়লা।’


সে নরম স্বরে বলল, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের এটা বুঝিয়ে দেয়া যে মানুষের আবিষ্কৃত যেকোনো যান্ত্রিক পদ্ধতিকে মানুষ পরাজিত করতে পারে। যদি তাদের বোঝাতে সক্ষম হই যে মানবিক গুণাবলিকে প্রত্যাখ্যান করা কখনোই শুভ বয়ে আনে না, তাহলেই আমি খুশি। এবার আমাদের মনে হয় মিটিংয়ে যাওয়াই ভালো।’


এতক্ষণ নাথান ওয়েইটকে নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগা মিস মার্টিন হঠাৎ করেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। নেট প্রয়োজনে অমন এক ডজন কুমিরের মোকাবেলা করতে পারবে।
কুমিরের নেতৃত্বে সিটি ব্যাঙ্কিং অ্যাসোসিয়েশনের ১২ সদস্যের কমিটি, আর ১২ জন উকিল বসেছিল তাদের অপেক্ষায়। নাথান ওয়েইট মৃদু মাথা দোলাল কমিটি রুমে ঢোকার সময়। কুমির বলল, ‘আপনিই ওয়েইট?’
শান্ত স্বরে নেট বলল, ‘মি. ওয়েইট।’


এবার কথা বলল নিখুঁত ধূসর স্যুট পরিহিত তরুণ এক উকিল। ‘আপনার লেখা গল্পগুলোর জন্য আমাদের টাকা গুনতে হয়েছে। আপনি কি জানেন যে, আপনার তথাকথিত পদ্ধতিগুলো বেআইনি?’
‘বাছা, ব্যাঙ্কিং আইন-কানুন লেখার ব্যাপারে আমি আমার রাষ্ট্রকে সহায়তা করেছি আর এখন আমি চাকরি করি ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডে। তোমার সাথে ব্যাঙ্কের আইনসংক্রান্ত আলাপ করতে ভালোই লাগবে আমার।’


বয়স্ক এক উকিল তীক্ষè স্বরে বলল, ‘চুপ করো, অ্যান্ডি’ ফিরল সে নেটের দিকে। ‘মি. ওয়েইট আমরা জানি না আপনার প্রথম পদ্ধতি দুটো আইনবিরুদ্ধ কি না। ওগুলো নিয়ে পরীক্ষা চালানোও অনেক ব্যয়সাপেক্ষ আর ঝামেলার, আর ইতোমধ্যে যদি প্রথম পদ্ধতি কিংবা দ্বিতীয় পদ্ধতি জনসাধারণের হাতে গিয়ে পড়ে, তাহলে হবে ধারণাতীত ক্ষতি। আমরা কিছু নিশ্চয়তা চাই যে এমনটা ঘটবে না।’
‘প্রথম পদ্ধতি দুটো যেখানে বর্ণিত হয়েছে, সেই গল্পগুলো আপনারা কিনে নিয়েছেন। আমি একজন সম্মানিত মানুষ হিসেবে পরিচিত। মিস মার্টিন জানান, ওই প্লট আমি আর কখনোই ব্যবহার করব না।’
ধূসর স্যুট উপহাসের সুরে বলল, ‘এই সপ্তাহে করবেন না হয়তো। কিন্তু আগামী সপ্তাহে করতে দোষ কোথায়? আপনি ভাবছেন আমাদের সবাইকে একদম বাগে পেয়ে গেছেন।’


বয়স্ক উকিল কড়া ধমক দিল, ‘আমি তোমাকে চুপ করতে বলেছি, অ্যান্ডি, ‘আর আবার ফিরল নেটের দিকে। ‘আমি পিটার হার্ট,’ বলল সে, ‘আমার সহকর্মীর ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইছি। আমি আপনাকে একজন সম্মানিত মানুষ হিসেবে মেনে নিচ্ছি, মি. ওয়েইট।’
বাধা দিল কুমির। ‘ওসব নিয়ে পরে মাথা ঘামালেও চলবে। তৃতীয় পদ্ধতির খবর কী ওটাও কি প্রথম দুটোর মতোই নীচ?’
নেট নরম স্বরে বলল, ‘প্রথম আর দ্বিতীয় পদ্ধতি অনৈতিক, সম্ভবত বেআইনি। তৃতীয় পদ্ধতি সন্দেহাতীতভাবে আইনসম্মত।’
১২ জন ব্যাঙ্কার আর ১২ জন উকিল বকর বকর করতে লাগল এক সাথে। হাত তুলে এই হট্টগোল থামিয়ে দিল কুমির। ‘আপনি বলতে চান এটাও প্রথম পদ্ধতি দুটোর মতো কাজ করবে?’
‘নিশ্চয়।’


‘তাহলে আমরা এটা কিনব। প্রথম দুই গল্পের সমানই পেমেন্ট পাবেন, আর এই গল্পটা আপনাকে লিখতে পর্যন্ত হবে না। আমাদের কেবল বলুন তৃতীয় পদ্ধতিটা কী। তাহলে ভবিষ্যতে এ রকম গল্প আর লিখবেন না, এ অঙ্গীকারের বিনিময়ে আমরা আপনাকে দেবো ৫০০ ডলার।’ চেয়ারে হেলান দিল কুমির, আপন সদাশয়তায় আপনি অভিভূত। পিটার হার্টের মুখ বেঁকে গেছে প্রবল বিতৃষ্ণায়।
নাথান ওয়েইট মাথা ঝাঁকাল। ‘আমার কাছে একটা কনট্রাক্ট পেপার আছে। এটা প্রস্তুত করেছে আমার রাষ্ট্রের সেরা আইনজীবী। আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু সে। মি. হার্ট এটা একনজর দেখলে খুশি হব। এই পেপার অনুসারে আপনাদের অ্যাসোসিয়েশন আমাকে বাকি জীবন বার্ষিক ২৫ হাজার ডলার করে দেবে, আর আমার মৃত্যুর পর অনন্তকাল দিতে থাকবে আমার উইলকৃত বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে।’
রুমজুড়ে শুরু হয়ে গেল মহা হইচই। দারুণ এক উল্লাস অনুভব করল মিস মার্টিন আর একই সাথে পিটার হার্টের মুখে সে লক্ষ করল একটা প্রশংসাসূচক হাসি।


হইচই কমে আসা পর্যন্ত ধৈর্যভরে অপেক্ষা করল নেট। যখন মনে হলো যে তার কথা এখন সবাই শুনতে পাবে, সে বলল, ‘একটা মাত্র গল্পের জন্য এই পেমেন্ট অত্যন্ত বেশি। তাই কনট্রাক্টে উল্লেখ আছে, সিটি ব্যাঙ্কিং অ্যাসোসিয়েশনকে আমি সেবা প্রদান করব একজন কনসালটেন্ট হিসেবে কনসালটেন্ট ইন হিউম্যান রিলেশন্স। পদের নাম হিসেবে সত্যিই সুন্দর। কনসালটেন্ট হওয়ার পর আমি এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ব যে, নতুন গল্প লেখার সময়ই আর জোটাতে পারব না। কনট্রাক্টে এ বিষয়েরও উল্লেখ আছে।’
ধূসর স্যুট উঠে দাঁড়িয়েছে, চিৎকার করছে সবার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। ‘তৃতীয় পদ্ধতির কথা বলছেন না কেন? কনট্রাক্টে কি ওটার ব্যাখ্যা দেয়া আছে? তৃতীয় পদ্ধতি সম্বন্ধে আমাদের জানতে হবে!’
নেট মাথা দোলাল। ‘ওটার কথা তোমাকে আমি জানাব কনট্রাক্ট স্বাক্ষর হওয়ার সাথে সাথে।’
হাত তুলে চুপ করার ইশারা করল পিটার হার্ট। ‘আপনি যদি একটু দয়া করে পাশের রুমে যান, মি. ওয়েইট, কনট্রাক্টের বিষয়ে আমরা নিজেদের মাঝে আলাপ সেরে নিতে চাই।’


পাশের রুমে নেট বসে রইল মিস মার্টিনের সাথে। ‘আপনার জবাব নেই’, বলল অ্যাডুইনা। ‘তারা রাজি হবে বলে মনে করেন?’
‘আমি নিশ্চিত রাজি হবে তারা। সপ্তম ধারা নিয়ে সামান্য গাঁইগুঁই করতে পারে যেখানে আমাকে দেয়া আছে ব্যাঙ্কের সব টিভি বিজ্ঞাপন অনুমোদন কিংবা বাতিল করার ক্ষমতা।’ ঝিকমিক করে উঠল তার চোখজোড়া। ‘কিন্তু তৃতীয় পদ্ধতি তাদের বুকে এমনই কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে যে, আমার ধারণা তারা তাতেও রাজি হবে।’


পাঁচ মিনিট পর পিটার হার্ট ডাকতে, ফিরে গিয়ে তারা দেখতে পেল, কমিটির সবার কাঁধ ঝুলে পড়েছে। ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে অ্যাসোসিয়েশনের একজন কনসালটেন্ট ইন হিউম্যান রিলেশন্স না হলে আর চলছে না,’ বলল সে। ‘মি. গ্রেভস’ মাথা দুলিয়ে সে ইশারা করল কুমিরের দিকে ‘আর আমি স্বাক্ষর করেছি সিটি ব্যাঙ্কিং অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে। ভালো কথা, আপনার কনট্রাক্ট পেপারটার মুসাবিদা হয়েছে অসাধারণ কোথাও আইনের এতটুকু ফাঁকফোকর নেই। আপনাকে কেবল এখানে একটা স্বাক্ষর দিতে হবে।’
আবার উঠে দাঁড়াল ধূসর স্যুট। ‘থামুন সবাই,’ চিৎকার দিল সে। ‘তিনি এখনো আমাদের তৃতীয় পদ্ধতির কথা বলেননি।’
কনট্রাক্ট পেপার হাতে নিল নেট। ‘ও, হ্যাঁ’ বলল সে স্বাক্ষর করার পর। ‘ব্যাঙ্ক ডাকাতির তিনটি পদ্ধতি। পদ্ধতি নং ৩। আসলে, প্রথম দুটো পদ্ধতির চেয়েও এটা সহজ। আমি এখানে আসার পর থেকে কনট্রাক্ট পেপার স্বাক্ষর করা পর্যন্ত যে কার্যক্রম, এটাই তৃতীয় পদ্ধতি।’