বিএনপির কাউন্সিল : নতুন আমেজ নতুন চিন্তা

Apr 02, 2016 10:50 am


মঈন উদ্দিন খান


সদ্য সমাপ্ত বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল সাম্প্রতিক রাজনীতিতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে হয়তো পদ-পদবির চিন্তা মাথায় এনে চমক খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সেই চমক হয়তো কাউন্সিলে ছিল না কিন্তু সরকারের দমন-পীড়নে নাজেহাল দলটির জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন কেন্দ্র ও তৃণমূল নেতাদের মহামিলন। অবাক করার মতো ছিল উপস্থিতি। উৎসাহ-উদ্দীপনার কোনো ঘাটতি ছিল না। সুশৃঙ্খল একটি কাউন্সিল আয়োজনের পর দলটির হাইকমান্ডের মধ্যে ভবিষ্যত রাজনীতি নিয়ে আস্থা বাড়ছে। এখন নতুন কমিটির অপেক্ষায় রয়েছেন নেতাকর্মীরা। ইতোমধ্যে মহাসচিব ইহসাবে মিজরা ফখরুল ইসলাম অালমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসাবে রুহুল কবির রিজভীর নাম ঘোষনা করা হয়েছে। 


কাউন্সিলের তারিখ ঘোষণার পরও বিএনপিকে ভেনু পেতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে। পছন্দসই একটি ভেনুরও অনুমতি পায়নি। কাউন্সিলের হাতেগোনা কয়েক দিন আগে সীমিত পরিসরের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনই ভেনু হিসেবে চূড়ান্ত করে। পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আংশিক ব্যবহারের অনুমতি পায় দলটি। কম সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি নিয়ে কাউন্সিলের মতো একটি বিশাল আয়োজন বেশ সাবলীলভাবেই শেষ হয়েছে। ১৯ মার্চ কাউন্সিল ভেনুর পুরো এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্য। দলটির কাউন্সিল ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক গয়েশ্বেরচন্দ্র রায় বলেছেন এভাবে : ‘তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে অপ্রত্যাশিতভাবে’।
কাউন্সিল বক্তৃতায় সমৃদ্ধ দেশ ও আলোকিত সমাজ গড়তে ‘ভিশন ২০৩০’ রূপরেখা তুলে ধরেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে।


খালেদা জিয়া সকল মত ও পথকে নিয়ে বাংলাদেশকে একটি ‘রেইনবো নেশনে’ রূপ দেয়ার কথা বলেছেন। তিনটি ‘গুড’ বা ‘সু’-এর সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছেন তিনি। এগুলো হলো গুড পলিসি, গুড গভর্নেন্স এবং গুড গভর্নমেন্ট (সুনীতি, সুশাসন এবং সুসরকার)। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ। মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার। এজন্য বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ‘ডবল ডিজিটে’ উন্নীত করার সৃজনশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা বলেছেন। বলেছেন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের কথা।


ইতিবাচক রাজনীতি প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সৃজনশীল, ইতিবাচক ও ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সরকার ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিএনপি। এ জন্য নতুন এক সামাজিক সমঝোতা বা চুক্তিতে উপনীত হতে বিএনপি উদ্যোগ নেবে। ক্ষমতায় গেলে কারো প্রতি অবিচার করা হবে না সেটিও তুলে ধরেছেন বিএনপি প্রধান।
খালেদা জিয়ার এসব বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চিন্তার খোরাক সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে মনে করছেন খালেদা জিয়া যে নতুন রাজনীতি শুরুর কথা বলেছেন, এর সূত্র ধরেই চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব।
কাউন্সিলে লন্ডন থেকে ভিডিও বক্তব্য দিয়েছেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার বক্তব্যে নেতাকর্মীরা বেশ উদ্দীপ্ত হয়েছেন। আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তারেক রহমান নেতাকর্মীদের মাঝে যে ভীষণ জনপ্রিয়, কাউন্সিলে তা আবারো প্রমাণিত হয়েছে।

 

গঠতন্ত্রে নানা সংশোধনী এনেছে বিএনপি
সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো নেতা এক পদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কেন্দ্রীয় কোনো নেতা কোনো অঙ্গদলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কিংবা জেলা বা মহানগর কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে থাকতে পারবেন না। তবে চেয়ারপারসন বিশেষ বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম অনুমোদন করতে পারবেন। দলটির নেতারা বলছেন, এটা একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে।
সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে গঠনতন্ত্রে। বলা হয়েছে চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে তিনি তার সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন। চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে চেয়ারম্যান হবেন এবং নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ওই পদে বহাল থাকবেন। গঠনতন্ত্রে চেয়ারপারসনের পাশাপাশি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন একসঙ্গে অনুষ্ঠানের বিধি যুক্ত করা হয়েছে। চেয়ারপারসনের ক্ষমতা বাড়িয়ে বলা হয়েছে, তিনি স্থায়ী কমিটি ভেঙে দিতে এবং পুনর্গঠন করতে পারবেন। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্নপর্যায়ে পদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান পদের পরিধি বাড়িয়ে ৩৫ করা হয়েছে। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার বদলে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিল আখ্যায়িত, তাদের নিয়োগের এখতিয়ার চেয়ারপারসনের ওপর অর্পণ এবং সংখ্যা অনির্ধারিত রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে তাদের পদমর্যাদা ভাইস চেয়ারম্যানের এবং কাউন্সিলরের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। দেশের নতুন বিভাগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিভাগওয়ারি সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রতিটি বিভাগে দুইজন করে সহসাংগঠনিক সম্পাদক পদ বাড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন করে সাতজন সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, চারজন ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক, দুইজন প্রশিক্ষণ বিষয়ক সহসম্পাদক, দুইজন স্বাস্থ্য বিষয়ক সহসম্পাদক (চিকিৎসক ও নার্স), অর্থ-জলবায়ু সহসম্পাদক, ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক, গণশিক্ষা, বন ও পরিবেশ, তাঁতীবিষয়ক, স্বনির্ভরবিষয়ক, পরিবার পরিকল্পনা-বিষয়ক, প্রবাসীবিষয়ক, বিজ্ঞানবিষয়ক, মানবাধিকারবিষয়ক, উপজাতিবিষয়ক সহসম্পাদকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে একটি করে। ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক পদ সৃষ্টিসহ শিল্প ও বাণিজ্য-বিষয়ক সম্পাদক, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানসহ কয়েকটি পদের নামের পরিবর্তন করা হয়েছে।


সংশোধিত গঠনতন্ত্রে বিষয়ভিত্তিক উপকমিটি গঠনের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। উপকমিটিগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থ ও পরিকল্পনা, পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, নারী ও শিশু, আইন ও বিচার, শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ, যোগাযোগ ও গণপরিবহন, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, মুক্তিযুদ্ধ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, উপজাতিবিষয়ক ইত্যাদি। গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, এসব কমিটিতে বিএনপির রাজনীতি করেন না কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। সব-পর্যায়ে ১০ ভাগ নারীর প্রতিনিধিত্ব বিধিতে যুক্ত করে বলা হয়েছে আগামীতে এ সংখ্যা আরো বাড়বে। দলের সবধরনের প্রচারপত্র প্রকাশ ও প্রচারে আগে দলের স্থায়ী কমিটির অনুমোদনের বিধি থাকলেও সেটা শিথিল করে কেবল গুরুত্বপূর্ণ প্রচারপত্রের অনুমোদনের কথা যুক্ত করা হয়েছে। গঠনতন্ত্রে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) থেকে জেলাপর্যায়ে কমিটিতে নেতা ও সদস্যদের মাসিক চাঁদা নির্ধারণ ও সেটা পরিশোধ না করলে সদস্যপদ স্থগিত ও বাতিলের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটির পদের সংখ্যা নির্ধারণ ও নতুন পদ সৃষ্টির বিধান যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয় এলাকা ভিত্তিতে কিছু নতুন পদ সৃষ্টি করা হবে। এ পর্যায়ের কমিটিগুলো মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে নতুন কমিটি করবেন। প্রতিটি কমিটিই তাদের অধিনস্থ কমিটির অনুমোদন দিতে পারবে, তবে এ জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন নিশ্চিত থাকতে হবে। এ ছাড়া তৃণমূলপর্যায়ের কমিটির ক্ষেত্রে কিছু শব্দগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। চেয়ারপারসনের অনুমোদনক্রমে কোনো সংগঠন সহযোগী সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হবে। এ জন্য অঙ্গ ও সহযোগী দলের বিধানে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। গঠনতন্ত্র সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদনের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির বাকি পদগুলো নির্বাচনের একক ক্ষমতা ও সর্বময় কর্তৃত্ব চেয়ারপারসনের ওপর অর্পণ করা হয়েছে।

 

নতুন উদ্দীপনা
‘সফল’ ও ‘সুশৃঙ্খল’ জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পর দলটির হাইকমান্ড যেমনি খোশমেজাজে আছেন, তেমনি দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝেও বিরাজ করছে নতুন উদ্দীপনা। এখন কেবল অপেক্ষা নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির। তৃণমূলের আকাক্সক্ষাÑ দলের চেয়ারপারসন ঘোষিত সেই কমিটিতে জায়গা হবে যোগ্য ও বিতর্কমুক্ত ত্যাগী নেতাদের। যার মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে বিএনপি।
কারো কারো আশা ছিল, কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে অন্তত মহাসচিব পদটির বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা না হওয়ায় কিছুটা হতাশা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী একজন সদস্য জানিয়েছেন, অতীতে কখনো কাউন্সিল থেকে শুধু মহাসচিবের নাম ঘোষণা করা হয়নি। দলের চেয়ারপারসনকে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনিই কম সময়ের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবেন।


আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে বলে দলটির নেতারা বলছেন। নেতাকর্মীরা এখন সেই অপেক্ষায় আছেন। কাউন্সিলের পর পদপদবির জন্য আবারো তাই শুরু হয়েছে দৌড়ঝাঁপ।


কাউন্সিলের দ্বিতীয় অধিবেশনে খালেদা জিয়ার সামনে সাংগঠনিক নানা বিষয়ে মনখুলে কথা বলতে পেরেও সন্তুষ্ট কাউন্সিলররা। কাউন্সিলরা খালেদা জিয়াকে বলেছেন, যারা বেঈমান, মোনাফেক, দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, যারা আন্দোলন করতে উৎসাহিত করে মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে কিংবা আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিল, সেই সমস্ত লোকেদের বাদ দিয়ে যারা পরিশ্রমী, সাহসী, পরীক্ষিত তাদেরকে আগামী দিনের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে। কাউন্সিলরদের এসব কথা খালেদা জিয়া আন্তরিকভাবে শুনেছেন এবং তা বাস্তবায়নের আশ্বাসও দিয়েছেন।