বিএনপির লক্ষ্য জাতীয় নির্বাচন, কিন্তু...

May 19, 2016 10:23 am

 

মঈন উদ্দিন খান


বিএনপির সামনে এগোনোর পথ কণ্টকাকীর্ণ। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত এক-এগারোর সরকারের রোষানল থেকেই মূলত এই বন্ধুর পথের শুরু। এরপর কেটে গেছে ৯টি বছর। সরকারের মামলা-হামলা, জুলুম-নিপীড়নই তাদের নিত্যসঙ্গী। দলটি জেগে উঠতে চাইলেই সামনে এসে হাজির হয় দমন-পীড়ন। তারপরও বৃহত্তম এই রাজনৈতিক দলটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে বৈ কমেনি।
গত ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্বে উদ্দীপ্ত বিএনপি এখন দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি জাতীয় নির্বাচন চায়। এ লক্ষ্য পূরণে দলটির অভ্যন্তরে কৌশলগত বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে আন্দোলনের চেয়ে সাংগঠনিক ও কূটনৈতিক তৎপরতাকেই জোর দেয়া হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।


চলতি বছরের শেষের দিকে অথবা ২০১৭ সালের শুরুতে সরকার একটি নির্বাচনের দিকে যেতে পারে, এমন তথ্য রয়েছে দলটির হাইকমান্ডের কাছে। যদিও এ নিয়ে দলটি প্রকাশ্যে তেমন একটা উচ্চবাচ্য করছে না। তাদের এখন মূল লক্ষ্যই হচ্ছে পরবর্তী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা। এ জন্য কৌশলগত যেসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন হবে, সবই নেবে তারা। দলটির নেতারা মনে করছেন, পরবর্তী নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলেই কেবল তা বিএনপির জন্য ভালো ফল বয়ে আনতে পারে।


নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো কেমন হবে, তা নিয়ে বিএনপি তাই নতুন করে ভাবনা শুরু করেছে। তবে এ ভাবনায় কট্টর কোনো অবস্থান নেই। বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে দলটি প্রধানত আলোচনার পক্ষপাতী। সেক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন সরকারে তাদের অংশীদারিত্ব নির্ধারণ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যপরিধি খর্ব করা এবং নির্বাচন কমিশন ঢেলে সাজানোর দিকেই মূল ফোকাস তাদের। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও বলেছেন, ‘বিএনপি একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের গ্যারান্টি চায়। আর এটা নিশ্চিত করার পথে কোনো বিষয়েই অনমনীয় নয় বিএনপি। প্রয়োজন শুধু আলোচনা-সমঝোতা।’


২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপি নতুন নির্বাচনের দাবিতে মাঠে রয়েছে। ওই নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন থেকে প্রায় তিন মাস টানা আন্দোলন করেছে তারা। কিন্তু সরকারের ব্যাপক দমন-পীড়ন ও আন্দোলন পরিচালনায় সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে দলটিকে শেষ পর্যন্ত কোনো ফল ছাড়াই ঘরে ফিরতে হয়েছে। দলটির সিনিয়র এক নেতা বলেন, নতুন নির্বাচন বিএনপির এখন মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য কিভাবে পূরণ হবে, সেটাই মূল বিষয়। পরপর দু’টি আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ায়, দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে আন্দোলন কতটা কার্যকর তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় ৯০-এর দশকের পুরনো আন্দোলনমুখী মানসিকতায় পরিবর্তন এনে নতুন স্ট্র্যাটেজির দিকে এগোচ্ছে বিএনপি। এক্ষেত্রে সাংগঠনিক ও কূটনৈতিক তৎপরতার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
২০১৪ সালের ওই নির্বাচনের পর থেকে এখনো পর্যন্ত বর্তমান সরকার নিয়ে প্রভাবশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্টের নেতিবাচক মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ কারণে বিএনপি প্রভাবশালী এ দেশের সাথে নিয়মিত সম্পর্ক সুচারুভাবে রক্ষা করে চলছে। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবহিত করে হালনাগাদ রাখা হচ্ছে তাদের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্রের স্বার্থে নতুন নির্বাচনের পক্ষে রয়েছে বলে দলটির শীর্ষ নেতারা মনে করেন।


প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথেও আস্থার সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে পুরো বিষয়টি ভেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেশী এই প্রভাবশালী দেশের কর্তাব্যক্তিদের সাথেও নানা ইস্যুতে গত কয়েক মাসে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের বৈঠক হয়েছে। ওই সব বৈঠকে বিএনপির উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিষয়টি যেমনি উঠে এসেছে, তেমনি প্রতিবেশীর সাথে অংশীদারিত্বমূলক সুসম্পর্কের দিকগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত মার্চে ভারতে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।


কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির পাশাপাশি এ বছরের শুরুতে পৌরসভা নির্বাচন ও গেল দুই ধাপের ইউপি নির্বাচনের সহিংস পরিস্থিতির তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রভাবশালী দেশগুলোকে জানিয়েছে বিএনপি। দলটিরই সিনিয়র এক নেতা বলেছেন, নতুন জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য বিএনপির দাবির পক্ষে এগুলো দলিল হিসেবে কাজ করবে। বিএনপি প্রমাণ করতে চাইছে, বিদ্যমান বাস্তবতায় দলীয় সরকারের অধীনে কোনোভাবেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।


দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি যখন এমন কৌশল নিয়ে সামনে এগোচ্ছে, তখন দলটির রাজনৈতিক ও বৈদেশিক কার্যক্রমের সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করেছে সরকার। গত মাসের শেষের দিকে আটক হন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে একটি ঘটনার জের ধরে প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রাণণাশের চেষ্টা হয়েছে এমন অভিযোগ-সংক্রান্ত একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হলেও এর মূল উদ্দেশ্য ভিন্নই মনে হচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৫ সালে ওই মামলা ডিসমিস হয়ে গেছে, ওই মামলার নথিতেও জয়ের প্রাণনাশের চেষ্টা-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ের উল্লেখ নেই।


শফিক রেহমানের গ্রেফতারের পর বিএনপি যুক্তরাষ্ট্রে জয়ের অ্যাকাউন্টে আড়াই হাজার কোটি টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি তুলেছেন বিএনপি প্রধান। বিএনপি বলেছে, জয়ের দুর্নীতি ঢাকাতেই শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুককেও এখন যুদ্ধাপরাধের মামলায় জড়ানোর চেষ্টা চলছে। ওসমান ফারুক দলের কূটনৈতিক তৎপরতার সাথে যুক্ত।


বিএনপি যখন কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, ঠিক তখন এ দু’টি ঘটনা রাজনীতিতে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করছে। অনেকে মনে করছেন বিএনপির বৈদেশিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে সরকার। সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের নানামুখী চাপ এখন সরকারের সবচেয়ে মাথাব্যথার কারণ। বাস্তবতা হচ্ছে বিএনপি মাঠে যদি কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা না দেখাতে পারে ভবিষ্যতে এমন চাপ আরো বাড়বে। এমনকি দলীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে খালেদা জিয়াকেও বিচ্ছিন্ন করার সব চেষ্টা সরকার করবে। এমন পরিস্থিতি বিএনপি কিভাবে মোকাবেলা করে তা দেখার বিষয়।