বায়োমেট্রিক দৈত্য

May 19, 2016 10:52 am


বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে মোবাইল ফোন রেজিস্ট্রেশন চলছে। কেউ কেউ মৃদুস্বরে বলছেন, ‘এতে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে কিছু থাকবে না।’ তাদের কথায় কেউ কান দিচ্ছে না। তবে এটা সত্য, এই প্রযুক্তির হাত অনেক লম্বা। এ নিয়ে লিখেছেন

হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

 


বায়োমেট্রিক দৈত্যের হা
১৯৯৬ সালের কথা। লিন কোজার্ট নামে মধ্যবয়সী এক ব্যক্তির বিচার চলছে আমেরিকার পেনসিলভানিয়ার এক আদালতে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিন শিশুকে নিগ্রহের। বিচার শেষ, ক’দিন পরই রায় ঘোষণা হবে। বিচারকেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তাকে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য জেলে পোরা হবে। বিষয়টি বুঝতে পেরেই বুঝিবা, রায় ঘোষণার ক’দিন আগে একেবারে ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে গেল কোজার্ট। কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না তাকে আর।
তদন্তকারীরা বছরের পর বছর তার খোঁজ চালিয়ে গেলেন। কিন্তু ফলাফল শূন্য। তবে এই বলে বিষয়টা তারা বেমালুম ভুলেও গেলেন না। ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইর নতুন ইউনিট এনজিআইর কাছে পেনসিলভানিয়া স্টেট পুলিশ কোজার্টের একটি ছবি পাঠিয়ে দেয়।
আলোচনার সুবিধার্থে এনজিআইর প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে একটু বলা যাক। ৯/১১-এর পর মার্কিন প্রশাসনে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়, এনজিআই বা নেক্সট জেনারেশন আইডেনটিফিকেশন তারই একটি। এটি প্রতিষ্ঠার জন্য এফবিআই ২০০৮ সালে লকহিট মার্টিনের সাথে ১০০ কোটি ডলারের সামরিক চুক্তি করে। এর তিন বছর পর প্রোগ্রামটি পরীক্ষামূলকভাবে এবং ২০১৪ সালের শেষ দিকে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। আর এখন এফবিআইর অনুসন্ধানযোগ্য ‘মুখাবয়বের ছবির’ ডিজিটাল ক্যাটালগটিতে রয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি ছবি। মুখাবয়বের ছবির এটাই সর্ববৃহৎ ডেটাবেস। এতে রয়েছে অপরাধীদের মুখাবয়ব, সন্দেহভাজন বিদেশী সহিংস চরমপন্থীদের ছবি এবং যারা কোনো দিন কোনো ক্রাইম করেনি এমন মার্কিন গাড়িচালকদের লাইসেন্স ও পরিচয়পত্রের ছবি।


আবার কোজার্টের কথায় ফিরে আসি। সে তো পালিয়ে গেছে প্রায় দেড় দশক হলো। এর মধ্যে সে নাম ভাঁড়িয়েছে। বয়সও বেড়েছে। কিন্তু মুখাবয়ব, অর্থাৎ চেহারাখানি? ওটি তো আর মিথ্যে হয়ে যায়নি। পেনসিলভানিয়া স্টেট পুলিশের কাছ থেকে কোজার্টের ছবি পেয়েই কাজে নেমে পড়লেন এনজিআই ইউনিটের গোয়েন্দারা। কম্পিউটারে সার্চ দিতেই জানা গেল, এই চেহারার সাথে আরেকজনের চেহারার খুব মিল। সেই ‘আরেকজনটির’ নাম ডেভিড স্টোন। সে ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের মাসকোজিতে থাকে। কাজ করে ওয়ালমার্টের স্থানীয় একটি শাখায়।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এফবিআইর গোয়েন্দারা গ্রেফতার করে ফেলে পলাতক আসামি কোজার্টকে।
কিভাবে এটা সম্ভব হলো! এফবিআইর প্রোগ্রাম অ্যানলিস্ট ডাউ ¯প্রাউগের মুখ থেকেই শোনা যাক। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশকে নিরাপদ করতে কিভাবে চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ও অন্যান্য বায়োমেট্রিক পদ্ধতিকে সমন্বিত করছে, এ মামলা তার একটি উদাহরণ। এর সাহায্যে ১৯ বছর পর কোজার্টকে বিচারের আওতায় আনা গেল।’
এ ঘটনার পর ফেডারেল সরকারের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এনজিআই প্রোগ্রামকে অভিনন্দন জানায়। বলে, সহিংস চরমপন্থী ও দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করার জন্য এটি হলো ‘আগামী দিনের পন্থা।’


তবে সরকার পক্ষের এ উচ্ছ্বাসে শামিল হননি অনেকে। মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষের এসব মানুষের বক্তব্য, এনজিআইর মতো প্রোগ্রামগুলো খুবই উদ্বেগজনক। কারণ, এগুলো এক সময় মানুষের নাগরিক অধিকারের ওপর হামলা চালাবে। তারা বলেন, সামরিক বাহিনী এখন নানাভাবে মানুষের ওপর নজরদারি করছে। চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) দিয়ে আকাশ থেকে নজরদারি করছে। স্টিংরেজ দিয়ে সেলফোনে কথাবার্তা রেকর্ড করছে। এফবিআইর বায়োমেট্রিক প্রোগ্রামও ওসবেরই বর্ধিত রূপ।
লস অ্যাঞ্জেসেলের প্রাইভেসি অ্যাডভোকেট ও স্টপ এলএপিডি স্পাইং নামের একটি নাগরিক গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হামিদ খান বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি পুলিশের দৈনন্দিন কার্যাবলির মধ্যেই কাউন্টার টেররিজম ও কাউন্টার ইনসারজেন্সির কৌশল মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। যার সার কথা হলো, আমরা সবাই সন্দেহভাজন।’


যা হোক, চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তিটিকে জাদুকরী মনে হলেও আসলে তেমনটা নয়। ব্যাপারটা হলো, বাস্তবে কোনো দু’জন ব্যক্তির টিপসই এক রকম হয় না, কোনো দু’ব্যক্তির চেহারাও এক রকম হয় না। এফবিআইর প্রযুক্তিটি দুই ব্যক্তির চেহারার সূক্ষ্মতম পার্থক্যটিও ধরে ফেলতে সক্ষম। তাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিগুলো এখনো শৈশবেই আছে যদিও, তবুও এফবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, নজরদারি ভিডিও, মুখমণ্ডলের ছবি অথবা এমনকি ফেসবুক ও টুইটার থেকে সংগ্রহ করা ছবি ব্যবহার করে কোনো সন্দেহভাজনকে শনাক্ত ও অবস্থান নির্ণয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়ক করবে এই প্রযুক্তি।
এনজিআই আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে বছরখানেক হলো। কিন্তু এরই মধ্যে তাদের কাজের চাপ এতে বেড়ে গেছে যে, তাদের পুরনো অফিসে আর স্থান সঙ্কুলান হচ্ছিল না। ফলে গত বছর ক্রিসমাসের পর তাদের নতুন অফিসে চলে যেতে হয়। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ক্লার্কবার্গস এলাকায় অনুচ্চ পার্বত্যভূমির এক হাজার একর জমির মাঝখানে তিন লাখ ৬০ হাজার বর্গফুট আয়তনের ভবনে চলে যায় তারা। উজ্জ্বল কাচঘেরা ভবনটির চার পাশে কড়া নিরাপত্তার প্রহরা। কোনো দর্শনার্থীকে ভেতরে ঢুকতে হলে অনেক রকম নিরাপত্তা চেকিং পার হতে হয়। তাদের এমনকি নিজস্ব পুলিশ বাহিনীও রয়েছে। ভবনটি লোকালয় থেকে এত দূরে, এমনকি সবচেয়ে কাছের হাইওয়ে থেকেও এক মাইল দূরে কেন স্থাপন করা হলো, সে বিষয়ে এফবিআই এজেন্ট স্টিফোন ফিশার (৩০) বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ মানুষ যাতে কিছুতেই বুঝতে না পারে ভেতরে কী হচ্ছে।’


ভবনটি এফবিআইর হলেও এখানে শুধু তাদের বায়োমেট্রিক ডেটা থাকে, তা নয়। অন্য আরো অনেক সংস্থাই তাদের তথ্য এখানে সংরক্ষণের সুযোগ পায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় প্রতিরক্ষা বিভাগের কথা। এখানে তাদের ৬০ লাখ ছবি সংরক্ষিত আছে। বিদেশে কর্মরত সৈনিকদের এসব ছবি রাখা আছে সারি সারি হার্ড ড্রাইভে। যদি একবার আপনার মুখমণ্ডলের ছবি তোলা হয়ে থাকে, তবে সেটি এখানকার একটি কামরায় হার্ড ড্রাইভে রাখা আছে, যে কামরার আয়তন একটি ফুটবল মাঠের সমান।
এফবিআইর এই বায়োমেট্রিক প্রোগ্রাম শুরু হয় দু’টি অঙ্গরাজ্যে মিশিগান ও আরকানসাসে। আর এখন এতে যোগ দিয়েছে আরো ১৬টি অঙ্গরাজ্য। এফবিআইর অ্যানালিস্ট ¯প্রাউডস ধারণা করছেন, ২০১৬ সালের মধ্যেই আরো অন্তত ছয়টি অঙ্গরাজ্য এ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ ছবির ভাণ্ডারে যোগ হবে আরো কয়েক লাখ ছবি।
এফবিআই সুযোগ পেলেই বলে থাকে যে, তাদের এই কর্মকাণ্ডের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো অপরাধীদের পাকড়াও করা অর্থাৎ অপরাধ দমন। কিন্তু সমালোচকদের মুখ বন্ধ করা সোজা নয়। তারা ছবিগুলোর নানামুখী ব্যবহার তথা অপব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন। এরকম দু’টি সংস্থা ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন এবং ইলেকট্রনিক প্রাইভেসি ইনফরমেশন সেন্টার। এ দুটোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রাইভেসি ওয়াচডগ। এ দুই সংস্থা এনজিআইর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা ঠুকে দিয়েছে।


ইলেকট্রনিক প্রাইভেসি ইনফরমেশন সেন্টারের (ইপিআইসি) জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক পরামর্শক কেরেমি স্কটের শঙ্কা : এই যে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, এসব তথ্যের ভিত্তিতে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় ব্যাপকভাবে আঘাত হানতে সময় নেবে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি স্যান ডিয়েগোর সাম্প্রতিক এক ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। সেখানে পুলিশ এক ধরনের মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করে, যার সাহায্যে তারা অভিযানকালে যেকোনো ব্যক্তির মুখমণ্ডল স্ক্যান করতে পারে। তা সেই ব্যক্তি গ্রেফতারকৃত হোন কিংবা না-ই হোন।
তবে স্যান ডিয়েগোর পুলিশ আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, কোনো উপাত্ত সংগ্রহের কাজে তারা এই ক্যামেরা ব্যবহার করে না। পুলিশের একজন মুখপাত্র বলেন, যদি আপনি ইতঃপূর্বে গ্রেফতার না হয়ে কিংবা জেনে না গিয়ে থাকেন, তাহলে আপনার ছবি নেয়া হবে না কখনোই।
এ ছাড়া স্কটের আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে, যদি কখনো চেহারা শনাক্তকারী সফটওয়্যারটি ভুল করে বসে! তিনি বলেন, এনজিআইর ভুলের কারণে কাউকে কখনো জেলখানায় যেতে হয়েছে, এমন ঘটনা তার জানা নেই। তারপরও ২০১৩ সালে তিনি একটি অভিযোগ দায়ের করেন এবং এনজিআই কর্মসূচির অভ্যন্তরীণ দলিলপত্র দেখতে চান। মামলায় তারই জয় হয় এবং দলিলপত্র হাতে পেয়ে তিনি দেখতে পান, এনজিআই আর ভুলের সম্ভাবনা ২০ শতাংশ পর্যন্ত মেনে নিতে রাজি।


এ দিকে এফবিআই ক্রমাগত বলে আসছে যে, তাদের এই কর্মসূচিটি ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চেহারা শনাক্তকরণের এই প্রযুক্তিটি ভুল করতে পারে এবং করছেও। এর ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে, তা বিব্রতকর। এ ক্ষেত্রে জন গাসের ঘটনাটির কথা বলা যায়। জন গাস (৪৬) বোস্টনের একজন ট্রাক ড্রাইভার। ২০১১ সালে তিনি একটি চিঠি পান। তাতে লেখা : ‘ম্যাসাচুসেটস রেজিস্ট্রি অব মোটর ভেহিকলস আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্সটি বাতিল করেছে।’ চিঠি পেয়ে চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সাহায্যে স্ক্যান করা হয়েছে। তাতে তিনি সন্দেহভাজন তালিকাভুক্ত হয়েছেন। সে জন্য তার লাইসেন্স বাতিল। অথচ ব্যাপার হলো, এই স্ক্যান করাকালে দু’টি নাম আসে সন্দেহভাজন হিসেবে।


যা হোক, গ্যাস মামলা করেন। দু’সপ্তাহ বেকারও থাকেন। পরে মামলায় হেরেও যান তিনি। কিন্তু তার আইনজীবী রায় মানতে নারাজ। তার কথা হলো, এই মামলায় অনেক জটিলতা আছে। তা ছাড়া কোনো শুনানি ছাড়া কাউকে সাজা দেয়া? এ তো অবিশ্বাস্য!
এফবিআই বলছে, জনসাধারণের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যাতে বিঘিœত না হয়, সে দিকটা তারা গুরুত্বের সাথে দেখবে। তা ছাড়া চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তির কারণে এ পর্যন্ত কোনো ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়নি এবং হবেও না। শুধু এই প্রযুক্তির তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বা এফবিআই এজেন্টরা কাউকে গ্রেফতার করবে না। তাদের হাতে সহায়ক আরো তথ্য প্রমাণ থাকলে তবেই গ্রেফতার।
এনজিআই ইউনিট প্রধান স্টিফেন মরিস বলেন, আমরা এখানে যা-ই করি না কেন, ব্যক্তির গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি আমাদের মনে অবশ্যই জাগরুক থাকে।
তা থাকুক। কিন্তু যখন মরিসকে প্রশ্ন করা হয়, কোজার্ট ছাড়া আর এমন একজন অপরাধীকেও কি এই প্রযুক্তির সাহায্যে আটক করা গেছে? কোনো সদুত্তর মেলেনি।


এ জন্যই হামিদ খান এবং তার মতো অসংখ্য মানবাধিকারকর্মী এসব কর্মসূচির ওপর ক্ষুব্ধ, বিরক্ত। তারা বলেন, এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা তথ্যের পাহাড় বানিয়ে ফেলেছি। নজরদারি শিল্প কমপ্লেক্সের পেছনে আমাদের (জনগণ) অর্থ ব্যয় হচ্ছে ঢলের মতো। এসব কাজে বা অকাজে বাজেট বরাদ্দের কোনো সীমারেখা নেই। কারণ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তো কোনো শেষ নেই!
হামিদ খানরা ঠিকই ভাবছেন। গণতন্ত্রের নামে জনগণের ওপর নজরদারিও তো কোনো সমাপ্তি নেই। বায়োমেট্রিক দৈত্য হা করেছে। তার পেটে ঢুকে পড়ছে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের অনেকটুকুই। এই হলো বর্তমান সভ্য দুনিয়ার গণতান্ত্রিক বাস্তবতা।
humayunse@yahoo.com