চোখ বন্ধ করে

Jun 02, 2016 08:58 am


লুয়াই হামজা আব্বাস
অনুবাদ : বিদ্যুত খোশনবীশ

প্রত্যেক সকালে বাইসাইকেলে চেপে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য তার ব্যয় হয় সিকি ঘণ্টা কিংবা তারও কম সময়। একদিন হেঁটেও গিয়েছিল, সময় খুব বেশি লাগেনি। তবুও সে সাইকেলটাই বেছে নিয়েছে। লোকটি সাইকেল চালায় ফুটপাথ ঘেঁষে আর অপেক্ষায় থাকে কখন গাড়িগুলো তার পথ থেকে সরে যাবে। রাস্তা ফাঁকা পেলেই চোখ বন্ধ করে প্যাডেল মারে সে, সামনে এগিয়ে চলে সে ও তার বাইসাইকেল। তার শরীরের দুই পাশ ঘেঁষে দুনিয়াটা পিছলে চলে যায়, সে দেখারও চেষ্টা করে না। অবশ্য, এমন সুযোগ রোজ রোজ মেলে না। কারণ ওই সময়টায় যানজট যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি থাকে। তবে এই ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত যেদিন তার কপালে জোটে, সেদিন এক দুর্লভ সুখানুভূতি তাকে পরিপূর্ণতা দেয়। এই সুখের রেশ থাকে পুরোটা দিন।


এভাবে চোখ বন্ধ করে সাইকেল চালিয়ে সে এগিয়ে যায় ধূসর-কোমল এক অন্ধকার ঠেলে, যে অন্ধকার ভেদ করে ছুটে যায় একটি ক্ষীণ আলোকরেখা। চোখ বন্ধ করার পর যে সৌন্দর্য তার কাছে ধরা দেয় তার সবটুকু উপভোগ করে সাইকেলটা সে হেলান দিয়ে রাখে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্টোর-রুমের দেয়ালে। জায়গাটা তার পছন্দের।


সে ঠিক বলতে পারে না, তার এই সুখ ওই অন্ধকার গর্ভে বিচরণের নাকি সেই অস্পষ্ট আলোকরেখার, যার উৎস তার অজানা। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নৈঃশব্দ্য সকালের সুখটুকুকে আরো বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাখে, যতক্ষণ না ব্যস্ততা তার সামনে এসে দাঁড়ায়। নৈমিত্তিক এই ব্যস্ততা নিজের দিকে তাকাবার ফুরসতটুকুও তাকে দেয় না।


সকাল থেকেই রোগীরা লাইন ধরে ক্যাশিয়ারের টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। তাদের সামনে রেখে নিজের দিকে তাকাবার সুযোগ কোথায়? সে প্রত্যেকের নাম ও বয়স অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লিপে লিখে দেয়, একই তথ্য তাকে আলাদা আলাদা ফাইলেও লিখতে হয়। রোগীদের কাছ থেকে রোগের উপসর্গও জেনে নিতে হয় তাকে। কোনো মেডিক্যাল টেস্টের জন্য নয়, রোগীকে সঠিক ডাক্তারের কাছে পাঠাবার জন্যই এই কাজ। রোগের উপসর্গ অনুযায়ী স্লিপে সে লিখে দেয় সাধারণ, চর্ম কিংবা শিশু বিশেষজ্ঞ কথাগুলো।


শেষ অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লিপটি তাকে মনে করিয়ে দেয় সময় খুব দ্রুত বয়ে যায়। অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক শেষ হয়ে গেলে সে নতুন একটি হাতে নেয় আর উল্টাতে থাকে পাতার পর পাতা। লোকটি নিশ্চিত হতে চায়, সব পাতাতেই সিল মারা হয়েছে। প্রতিদিন এরকম দেড়টা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক লাগে। কখনো একটু বেশি, কখনোবা কম, তবে রোগীর সংখ্যা ওই সীমার মধ্যেই ওঠা-নামা করে। বিষয়টা এমন, যেন প্রতিদিন একই সংখ্যক মানুষ অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হচ্ছে। একটি করে স্লিপ লেখা হয় আর রোগীর সংখ্যা কমতে থাকে। ঠিক মধ্যাহ্নে তার টেবিলের সামনে কোনো রোগী থাকে না, থাকলেও বড়জোর দু-একজন। তবে কেউ থাকুক আর নাই থাকুক, ডিউটি শিফট শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজের চেয়ারেই বসে থাকে লোকটি।


অনির্ধারিত কোনো আড্ডায় সাধারণত সে যায় না। ফার্মেসি, নার্সিং রুম অথবা ল্যাবরেটরিতে বসে বাড়ি থেকে আনা খাবার খাওয়ার সময় কিংবা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তার সহকর্মীরা নানা প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করে। এ ধরনের আড্ডাবাজি করে সামাজিকতা দেখাবার কোনো স্পৃহাই তার নেই।


একবার এক আড্ডায় উপস্থিত থেকেও সে চোখ বন্ধ করে বসে ছিল। সে চেয়েছিল, ওখানে যা কিছু ঘটছে তা সবার পৃথিবীর মতোই তাকে অতিক্রম করে পেছনে চলে যাক। কিন্তু সহকর্মীদের অপ্রত্যাশিত নীরবতা তাকে বিস্মিত করে। চোখ বন্ধ করে সে যখন বিচ্ছিন্নতার স্বাদ নিচ্ছিল, তার চার পাশে তখন সুনসান নীরবতা। দীর্ঘস্থায়ী ওই নীরবতা তাকে চোখ খুলতে বাধ্য করে। সে দেখে, সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। খাবারের প্লেট কিংবা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রুমের প্রত্যেকেই বোকার মতো তাকে দেখছিল। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি তাকে অপ্রস্তুত করে তোলে, মৃদু স্বরে সে বলে ফেলে : ‘রাতে ভালো ঘুম হয়নি।’ রুম থেকে বের হয়ে দরজাটা টেনে দেয়ার সময় তার কানে আসে সহকর্মীদের প্রচণ্ড গুনগুন শব্দ।


রোগীরা চলে যাওয়ার পর লাঞ্চ-ব্রেক পর্যন্ত সময়টুকু সে পার করে বিভিন্ন ফাইলপত্র গুছিয়ে, পরের দিনের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকে দাগ টেনে আর স্লিপে সিল মেরে। দুপুরের খাবারের পর সে চা খায়, সাদা একটা কাপে নিজেই চা ঢেলে নেয়। আসলে, কাপটা পুরোপুরি সাদা নয়, সরু ডাটায় ছোট একটা স্ট্রবেরি আঁকা আছে। ডিউটি শিফটের অবশিষ্ট সময় এই চায়ের কাপটা তার টেবিলেই থাকে। লম্বা বিরতি নিয়ে কাপে চুমুক দেয়া তার অভ্যাস। তা ছাড়া ঠাণ্ডা চায়ের তিক্ত স্বাদ সে বেশ উপভোগ করে। চা খেতে খেতে কাপটা নিয়েও সে ভাবে : ‘এই মাপের একটা কাপের গায়ে অতটুকু স্ট্রবেরি মানানসই হয়নি। ওটা কি আর একটু বড় হতে পারত না!’


স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সীমানা ঘেঁষেই একটা ফাঁকা মাঠ। ঘাস নেই, ধূলিময়। প্রতিদিন জানালা দিয়ে সে ওই মাঠের দিকে তাকায়; দূরন্ত একদল ছেলের ফুটবল খেলার দৃশ্য কল্পনা করে রোমাঞ্চিত হয়। যদিও আজ পর্যন্ত এই মাঠে সে কাউকেই খেলাধুলা করতে দেখেনি। তার পরও সে নিশ্চিত, বিশাল ওই মাঠটি দুই মাথায় দুটো ভাঙা গোলপোস্ট নিয়ে খুব বেশি দিন পরিত্যক্ত থাকবে না।


আজ সে একটা সাদা গাড়ি দেখতে পেল। গাড়িটা খুব ধীরগতিতে ঢুকে মাঠের ঠিক মাঝখানে গিয়ে থামল। অল্প কিছু গাড়ি মাঝে মধ্যে মাঠের ভেতর দিয়ে যায় বটে, তবে ওগুলোর বেশির ভাগই মিনি ক্যাব। সে লক্ষ করল, গাড়িটি ভাঙা। তার অনুমান ছিল, গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভার পেছনের বনেটটা খুলবে। ড্রাইভার নেমে এলো ঠিকই, কিন্তু বনেটের দিকে না গিয়ে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল তারপর শার্টের পকেটে রাখা প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে ধরাল। সামান্য কিছু সময় পর গাড়িটা থেকে আরো দু’জনকে নামতে দেখা গেল। একজনের চোখ বাঁধা। পেছনের লোকটি হিংস্রভাবে চোখ-বাঁধা লোকটির ঘাড় ধরে ড্রাইভারের সামনে হাঁটুগেড়ে বসতে বাধ্য করল। তখন, অর্থাৎ ঠিক ওই মুহূর্তে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ক্যাশিয়ার তার হাতে থাকা চায়ের কাপের উষ্ণতা টের পেল। সে কাপটা টেবিলে রেখে দিলো, নিজের কম্পিত হাত তাকে বেশ বিস্মিত করেছে। চলমান দৃশ্যের বাকি অংশ দেখার জন্য জানালা দিয়ে সে আবারো বাইরে তাকাল। চোখবাঁধা লোকটির মাথার পেছনে পর পর তিনবার গুলি করা হলো।


বাড়ি ফেরার পথে ক্যাশিয়ার তার চোখ বন্ধ করল। রাস্তায় মানুষের ভিড় যত কমছে, সে তত জোরে সাইকেলে প্যাডেল মারছে। কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে সেই ধূসর অন্ধকার কিংবা ঝাপসা আলোররেখার অস্তিত্ব আজ সে অনুভব করতে পারল না। বরং দেখতে পেল, একটি হাত বুলেটের ঝাঁকুনি খেয়ে বার বার পেছনে সরে যাচ্ছে আর পরক্ষণেই একটি মাথা প্রকম্পিত হচ্ছে।

 

লুয়াই হামজা আব্বাস : ইরাকি ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও সাহিত্য সমালোচক। প্রথম ছোটগল্প সঙ্কলন ‘অন অ্যা বাইসাইকেল অ্যাট নাইট’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। বাকি তিনটি গল্প সঙ্কলন প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ২০০০, ২০০৩ ও ২০০৮ সালে। সর্বশেষ গল্পগ্রন্থের নাম ‘ক্লোজিং হিজ আইজ’। এই গ্রন্থের জন্যই তিনি ২০০৬ সালে ‘কিকাহ’ পদক লাভ করেন। লুয়াই হামজা আব্বাস উপন্যাস লিখেছেন চারটি। প্রথম উপন্যাস ‘শিকার’ প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালে। কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে গল্প বা উপন্যাসের শব্দ নির্বাচনে তার বিশেষ নৈপুণ্য সর্বজন স্বীকৃত। পাশাপাশি, ব্যক্তির ‘ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য’ বিষয়ের জটিল বিশ্লেষণও তার লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্থিত হয়েছে।
লুয়াই হামজা আব্বাসের জন্ম ইরাকের বসরায়, ১৯৬৫ সালে। তিনি বসরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০২ সালে আরবি সাহিত্যের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে সমালোচনা সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত।
আব্বাস তার সৃজনশীল রচনার জন্য ভূষিত হয়েছেন বেশ কয়েটি পুরস্কারে। ২০০৯ সালে ইরাকের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রদত্ত ‘সৃজনশীল ছোটগল্প পদক’ ও ২০০৬ সালে যুক্তরাজ্যের ‘কিকাহ সেরা ছোটগল্প পদক’ উল্লেখযোগ্য।