মোহাম্মদ আলী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ

Jun 18, 2016 06:06 am

 

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

 

‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’
এটাই তাকে বোঝানোর জন্য সবচেয়ে সহজ বাক্য। তার অনতিক্রম্য ৫৬-৫ রেকর্ড তাকে মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা পারফরমার প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ অবস্থায় তিনিই ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি। লড়াইয়ে তার নজিরবিহীন দক্ষতা আর অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস তাকে সত্যিকার অর্থেই ‘সর্বযুগে সবার সেরা’ করেছে। মুষ্টিযুদ্ধের রিংয়ে প্রজাপতির মতো নৃত্য করে এবং মৌমাছির মতো হুল ফুটিয়ে তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পর্যুদস্ত করতেন। তিন-তিনবার হেভিয়েট শিরোপা জয় করে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানবে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে সনি লিস্টনকে হারিয়ে নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমিই বিশ্বের সম্রাট’। তার সেদিনের সাম্রাজ্য কেবল হেভিওয়েট রিংয়েই সীমিত ছিল। সেই রিংও তিনি ডিঙিয়েছেন। তিনি কেবল মুষ্টিযুদ্ধেই নয়, কিংবা সার্বিকভাবে ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, সর্বকালের সেরা মানুষদের একজনে পরিণত হয়েছেন। রিংয়ের ভেতরে ও বাইরে তিনি যে কৃতিত্ব স্থাপন করেছেন, তা তার আগে বা তার পরও দেখা যায়নি। হয়তো কোনো দিনই দেখা যাবে না। এমনকি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নি¤œ অবস্থায় থাকার সময়ও মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা, তার অনন্য মাহাত্ম্য ফুটে উঠত। একজন শোম্যান, একজন বিদ্রোহী, একজন মানবাধিকারকর্মী, একজন মুসলমান, একজন কবি সব গুণেই তাকে অভিহিত করা যায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, যুগ নির্বিশেষে তিনি বিস্ময়কর ব্যক্তি, মহামানব। বস্তুত তিনি পরিণত হয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষে। এমনকি পৃথিবীর অনেক স্থান যেখানে মুষ্টিযুদ্ধের কোনোই জনপ্রিয়তা নেই, সেখানেও তিনি মুকুটহীন সম্রাট। একজন মুষ্টিযোদ্ধার নামও যদি কেউ জানে, তবে তিনি হলেন মোহাম্মদ আলী।


সেরা ফর্মের সময়ে তিনি ছিলেন এক কথায় অপ্রতিরোধ্য। তবে তার লড়াই দেখতে যারা আসত, তিনি তাদের পয়সা উসুল করিয়ে দিতেন। বহু দূর পৌঁছতে পারার সক্ষমতা, রহস্যময় সময়জ্ঞান, অসাধারণ পূর্বাভাস এবং চমৎকার আত্মরক্ষা কৌশল নিয়ে গড়ে উঠেছিল তার দুর্দান্ত দক্ষতা। তার ঘুষি মারার ক্ষমতাসহ যে সামান্য কিছু ঘাটতি ছিল, তা পুষিয়ে দিয়েছিল গতিময় ফুটওয়ার্ক এবং রিংকে ব্যবহারের সক্ষমতা।
তিনি প্রায়ই দাবি করতেন, ‘আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ’। আর এই দাবি প্রমাণও করেছেন তিনি ভালোভাবে। আর তাকে ঘিরে থাকা কিংবদন্তিগুলো কেন হয়েছে, তার পরিচয়ও দিয়েছেন তিনি। তার মনোমুগ্ধকর দৈহিক গড়ন এবং তারকা গুণাবলি তাকে পরিণত করেছিল, ‘সুন্দরতম’ হিসেবে। আর তার চাতুর্যপূর্ণ কথাবার্তা তাকে পরিণত করে ‘অনন্য’। তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। তিনি তার জীবনীকার টমাস হাউসারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কখনো কি এমন কোনো যোদ্ধা ছিল যে কবিতা লিখত, রাউন্ডের ভবিষ্যদ্বাণী করত, সবাইকে হারাত, মানুষকে হাসাত, মানুষকে কাঁদাত এবং আমার মতো এত লম্বা ও এত সুন্দর ছিল? পৃথিবীর ইতিহাসের সূচনা থেকে কখনো আমার মতো কোনো যোদ্ধার আবির্ভাব ঘটেনি।’ তিনি একবার তার এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি আমাকে হারানোর স্বপ্ন দেখে থাকো, তবে ঘুম থেকে উঠে ক্ষমা চাও’। আর একবার তিনি মোহাম্মদ আলী নামক মুষ্টিযোদ্ধাকে চিনিয়ে দেয়ার জন্য যথার্থই নির্মম হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে শিরোপার দাবিদার আরনি টারেল বলেছিলেন, তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীর নতুন নামে স্বীকৃতি দেবেন না। আলী সেবার ইচ্ছে করেই লড়াইকে ১৫ রাউন্ড পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর বারবার অসহায় টারেলকে ঘুষিতে ঘুষিতে কাঁপিয়ে দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘বল, আমার নাম কী? বল আমার নাম কী?’


ক্রীড়াবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ মাত্রায় ফিট। আর তাই যেকোনো কঠিন আঘাতও সহ্য করে এগিয়ে যেতে পারতেন। অবশ্য এই সহ্য করার গুণের জন্য তাকে পরবর্তীকালে মূল্যটা দিতে হয়েছে বেশ চড়া। পারকিনসন রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি অতীতের ছায়া হিসেবেই বেঁচেছিলেন অনেক দিন। একসময়ের বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটি মধ্য বয়সের পর ঠিকমতো হাতটিও নাড়াতে পারতেন না, কথাও ঠিকমতো বলতে পারতেন না। কিন্তু অসহায় অবস্থাতেও নানা কাজের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছেন।
মুষ্টিযুদ্ধে তার শ্রেষ্ঠত্বের একটি নমুনা হলো তিনি ফলাফল কী হবে, তা চিন্তা না করেই জয়ের অদম্য ইচ্ছা নিয়ে লড়েছেন। তিনি জন্মেছিলেন লড়াই করার জন্য এবং জয়ের জন্য। তিনি যদি একটি আঘাত হজম করতেন, তবে দুটি কিংবা তিনটি আঘাত ফিরিয়ে দিতেন। আর এটাই এই মুষ্টিযোদ্ধার একটি বড় বৈশিষ্ট্য। তার স্টাইল ছিল প্রথাসিদ্ধ নিয়মনীতির বেশ বাইরে। প্রচলিত নিয়মে তিনি তার হাত দুটি দিয়ে মুখকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে দু’পাশে রাখতেন। প্রতিপক্ষের আঘাত থেকে রক্ষার জন্য তিনি অসাধারণ রিফ্লেক্স এবং রিচ (৮০ ইঞ্চি) ব্যবহার করতেন। প্রতিদ্বন্দ্বীকে ক্লান্ত করে পর্যুদস্ত করার কৌশলের দিকে তিনি বেশি মনোযোগী থাকতেন।


মোহাম্মাদ আলী নামে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি। ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির লুইসভিলে জন্মগ্রহণ করেন, তখন তার নাম ছিল ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে। ক্যাসিয়াস (সিনিয়র) এবং ওডেসার প্রথম ছেলে ছিলেন তিনি। তার পিতা ছিলেন পেইন্টার। মোহম্মদ আলী ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তার ছোট ভাই রুডলফও মুসলমান হলেন। তার নাম হয় রহমান আলী। আলীর মেয়ে লায়লা আলী পরবর্তীকালে মুষ্টিযুদ্ধে সুনাম অর্জন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে আলী চারবার বিয়ে করেছিলেন। ১৯৬৪ সালের ১৪ আগস্ট আলী বিয়ে করেন সনজি রোইকে। দুটি সন্তান হওয়ার পর ১৯৬৬ সালে এই বিয়ে ভেঙে যায়। তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী খালিদা ‘বেলিন্দা’ আলীকে বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১৭ আগস্ট। চারটি সন্তান হওয়ার পর তারা আলাদা হয়ে যান। ১৯৭৭ সালের ১৯ আগস্ট বিয়ে করেন ভেরোনিকা পোর্সে আলীকে। ১৯৮৬ সালে এই বিয়েও ভেঙে যায়। তার চতুর্থ ও শেষ স্ত্রী লনি উইলিয়ামস। ১৯৮৬ সালের নভেম্বরের এই বিয়েটি টিকে থাকে। তারা আসাদ নামে এক ছেলেকে দত্তক নেন। আলীর সন্তানরা হলেন : রাশিদা, জামিলা, মরিয়ম, মিয়া, খালিয়াহ, হানা, লায়লা, মোহাম্মদ জুনিয়র ও আসাদ।


তার মুষ্টিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে একটি চমৎকার কাহিনী বলা হয়ে থাকে। দুই ভাইয়ের শিক্ষাজীবন শুরু হয় একই সাথে। দু’ভাই আমেরিকার ডুভাল জেনারেল হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। আলীর বয়স তখন ছিল ১২ বছর আর ভাইয়ের বয়স ১০ বছর। এ সময় তাদের বাবা ৬০ ডলার দিয়ে একটা সুন্দর বাইসাইকেল কিনে দেন। দু’ভাই সাইকেলে চড়ে খুব ফুর্তি করে বেড়াতেন। দু’ভাই পালাক্রমে সাইকেল চালাতেন। ১৯৫৪ সালের ঘটনা। সেপ্টেম্বর মাসের এক সন্ধ্যায় দু’ভাই সাইকেলে করে এক প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলেন। সাইকেলটি রেখেছিলেন বাইরে। কিছুক্ষণ পরে এসে দেখেন, তাদের প্রিয় সাইকেলটি চুরি হয়ে গেছে। দু’ভাই তাতে বেশ দুঃখ পেয়েছিলেন। চোরকে পেটানোর বাসনায় মার্টিন (একই সাথে তিনি ছিলেন মুষ্টিযোদ্ধা প্রশিক্ষক) নামের এক পুলিশ অফিসারের কথাতেই আলী মুষ্টিযুদ্ধ শেখায় মনোযোগী হলেন। জন্ম হলো নতুন একজনের। পরবর্তী ২৭ বছর রিং মাতিয়ে রাখলেন তিনি।


১২ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় জিমে মুষ্টিযুদ্ধ শুরু করেন। ১৯৬০ সালের অলিম্পিক্সের জন্য নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ১০৮টি বাউট জেতেন, ৬ বার কেন্টাকি গোল্ডেন গ্লোভস চ্যাম্পিয়নশিপ এবং দু’বার জাতীয় ‘এএইউ’ শিরোপাও জয় করেন।
রোম অলিম্পিকে তিনি লাইট হেভিওয়েট বিভাগে স্বর্ণপদক জয় করেন। অ্যামেচার ক্যারিয়ারে এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ সাফল্য। কয়েক দিন পরই তিনি পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। মাত্র আটটি লড়াই এ জেতার পর তিনি ঠিক কত রাউন্ডে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেবেন, এমন ভবিষ্যদ্ববাণী করে রিংয়ে নামতে শুরু করলেন। ১৯৬০ সালের ২৯ আগস্ট প্রথম পেশাদার লড়াইয়ে আলী তার প্রতিদ্বন্দ্বী পুলিশ অফিসার টানি হানসাকারকে পরাজিত করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সময়কালে আলী ১৯টি লড়াইয়ে নেমে ১৫টি নকআউটসহ সবগুলোতেই জয়ী হন। এদের মধ্যে আর্চি মুর, ল্যামার ক্লার্কের মতো দুর্ধর্ষ মুষ্টিযোদ্ধাও ছিল। এদের হারিয়েই তিনি হেভিওয়েট শিরোপার দাবিদার হন।


এর মাঝেই দেশে বর্ণবাদের বিষাক্ত বাস্পে তার হৃদয়-মন পুড়ে গেছে। অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ী এই মুষ্টিযোদ্ধাকে একটি শ্বেতাঙ্গ রেস্তরাঁয় খাবার দিতে অস্বীকার করে। তিনি ওহিয়ো নদীতে তার পদক ছুড়ে দিয়ে প্রতিবাদ জানান (যদিও অনেকে এটাকে সত্য বলে মনে করেন না; তারা মনে করেন পদকটি তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন; ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি তাকে নতুন আরেকটি পদক প্রদান করে।)। পরবর্তীকালের অনেক বড় বড় প্রতিবাদের এটিই ছিল প্রথম।


১৯৬৪ সালের ২৫ ফেব্র“য়ারি বিশ্ব এক অবাক করা ঘটনা দেখল। এদিন দানবীয় শক্তির অধিকারী সনি লিস্টনকে হারিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপা জয় করেন। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে টার্নিং পয়েন্ট ছিল এটি। বলা যায়, জীবনের অন্যতম জুয়া তিনি এখানেই খেলেছেন। পরবর্তীকালে তিনি যে আরো অনেকবার অসম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়বেন, তার ভবিষদ্বাণী যেন ছিল এতে। অথচ তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ২২ বছর ৩৯ দিন। এক দিকে তার বয়স কম। সেই সাথে মাত্র কিছু দিন আগে হেনরি কুপারের সাথে লড়তে গিয়ে চোয়াল ভেঙে ফেলেছিলেন। লিস্টনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আলী জিতবেন, এটা খুব কম লোকই ভাবতে পেরেছিল। লড়াইয়ের আগে আলী তাকে ‘কুৎসিত বুড়ো ভাল্লুক’ হিসেবে খ্যাপাতেন। আর বারবার করে বলতে থাকলেন, তাকে ষ্ষ্ঠ রাউন্ডে নক আউট করবেন। এমনকি তিনি তার বাসার সামনে গিয়েও হইচই করেছেন।


সব কিছ্ইু ছিল লিস্টনের অনুকূলে। তার পেশিবহুল দেহ,কুতকুতে চোখ, কারাগারের ঘানিটানার অভিজ্ঞতা ছিল তার। দয়া-মায়ার লেশমাত্র ছিল না তার চেহারায়। তা ছাড়া স্থানীয় পেটোয়া বাহিনীর সদস্য ছিল তিনি। মদ, জুয়া ছিল তার নিত্যসঙ্গী। মাফিয়া চক্রের সাথেও তার যোগাযোগ ছিল (১৯৭১ সালে তিনি যখন অখ্যাত এক ব্যক্তি হিসেবে মারা যান তখন তার সাথে এক কোয়ার্টার আউন্স হেরোইন, একটি পয়েন্ট ৩৮ বোরের রিভলবার পাওয়া গিয়েছিল)। সাধারণ কেউ তাকে হারানোর কথা কল্পনাও করত না। এর আগে তিনি মাত্র একবারই হেরেছিলেন। কিন্তু তারপর আরো ভয়ঙ্করভাবে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু বিশ্ব অবাক হয়ে প্রত্যক্ষ করল নতুন ঘটনা। অবশ্য রিংয়ে নেমে আলী তার ভয় পুরোপুরি গোপন করতে পারেননি। এই লড়াইয়ে মারাই যান কি না তাও তার মনে হয়েছিল। তবে ভয় তাকে চেপে ধরতে পারেনি। রিংয়ে তিনি লিস্টনকে ঘিরে নৃত্য করতে থাকলেন। ফলে লিস্টনের ঘুষিগুলো প্রায়ই বাতাসে আঘাত হানতে লাগল। অবশ্য প্রথম রাউন্ডে লিস্টনই প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন। পরের রাউন্ডগুলোও চলতে থাকল একইভাবে। পঞ্চম রাউন্ডে রহস্যজনক কিছু এসে আলীর চোখে পড়ল। অনেকে মনে করেন, লিস্টনের গ্লোভস থেকেই তা এসেছিল। এ সময় মনে হচ্ছিল, আলীর আশা শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আলী তার কথা রেখেছিলেন। ষষ্ঠ রাউন্ডে এমন মার দিলেন, লিস্টন আর এলেন না পরের রাউন্ডে খেলতে। অবিশ্বাস্যভাবে জিতে গেলেন আলী। আলী রিংয়ে নেচে নেচে ঘোষণা করতে লাগলেন, ‘আমিই বিশ্বের চ্যাম্পিয়ন’। তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমি বিশ্বকে কঁাঁপিয়ে দিয়েছি, আমি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছি।’


সত্যিই তিনি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কাঁপন এখনো থামেনি। পরে গুজব উঠেছিল, লিস্টন নিজেই মাফিয়াচক্রের চাপে হেরে গেছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি বাচ্চাছেলের কাছে পরাজয় স্বীকার করার মতো মানসিকতা লিস্টনের ছিল না। তাই তিনিই এই গুজবকে উসকে দিয়েছিলেন। তা ছাড়া যেসব পণ্ডিত আর সাবেক মুষ্টিযোদ্ধা আলীকে একটি পুঁচকে চাপাবাজ ছোকরা মনে করত, তারা সেই গুজবকে আরো বাড়িয়ে তুলেছিল। তবে খুব সম্ভবত অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে লিস্টন এই খেলার আগে নিজেকে তৈরি করেননি। তার খেসারত তাকে বেশ চড়াভাবে দিতে হয়েছিল।


দুই দিন পর বিশ্ব অবাক হয়ে আরেকটি সংবাদ শুনল। লিস্টনকে হারানোর চেয়েও এটি ছিল চাঞ্চল্যকর। খবরটি হলো তিনি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেছেন এবং নতুন নাম নিয়েছেন মোহাম্মদ আলী। নতুন এক কিংবদন্তির জন্ম হলো। আলী তার ক্যাসিয়াস ক্লে নামকে অভিহিত করলেন, ‘দাসত্ব নাম’ হিসেবে। বিশ্বক্রীড়াঙ্গনে একটি স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা হলো এভাবেই। প্রথমে তিনি এলিজা মোহাম্মদ ও ম্যালকম এক্সের নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশন অব ইসলামের’ সাথে জড়িয়েছিলেন। তবে পরবর্তীকালে তিনি তাদের সংশ্রব ত্যাগ করেন। তিনি কোরআন অধ্যয়ন করতে থাকেন এবং সুন্নি ইসলামের অনুসারীতে পরিণত হন।


যারা মনে করেছিল, আলীর লিস্টনকে হারানো স্রেফ একটি দুর্ঘটনা, তাদের জবাব দিতে বেশি দেরি হলো না। পরের বছরের (২৫ মে, ১৯৬৫) ফিরতি লড়াইয়ে প্রথম রাউন্ডের প্রথম মিনিটেই আলী তার দানবীয় প্রতিদ্বন্দ্বী লিস্টনকে নকআউট করে দিলেন। তার শ্রেষ্ঠত্বের নিরঙ্কুশ স্বীকৃতি মিলল। আগের ম্যাচটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল না বা পাতানো ছিল না, তাও প্রমাণিত হলো।


এরপর আলী তার শিরোপা রক্ষার জন্য আরো আটটি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলেন (নভেম্বর, ১৯৬৫ থেকে মার্চ, ১৯৬৭ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত) ফ্লয়েড প্যাটারসন, জর্জ শুভালো, হেনরি কুপার, ব্রায়ান লন্ডন, কার্ল মিল্ডেনবার্গার, ক্লিভল্যান্ড উইলিয়ামস, আরনি টারেল ও জোরা ফোলের বিরুদ্ধে। এত অল্প সময়ে অন্য কোনো মুষ্টিযোদ্ধাকে এত বেশি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে দেখা যায়নি।
তার থেকে কেউ শিরোপা নিতে পারেনি। বরং রিংয়ের বাইরেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৬৭ সালের ২৮ এপ্রিল ভিয়েতনাম যুুদ্ধে যেতে অস্বীকার করায় আলীর শিরোপা কেড়ে নেয়া হলো। পরবর্তী সাড়ে তিন বছর তার লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত রাখা হলো। অথচ এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ ফর্মে থাকার সময়। ২৫ থেকে ২৮ বছর বয়সে তিনি তার শ্রেষ্ঠ সময়টি রিংয়ে নয়, কারাগারেই কাটিয়েছেন।
বিশ্ব মুষ্টিযোদ্ধা সংস্থা মার্কিন সরকারের ইচ্ছানুযায়ী একটি মিনি টুর্নামেন্টের আয়োজন করল। আর তার মাধ্যমে জো ফ্রেজিয়ারকে হেভিওয়েট শিরোপা দিয়ে দেয়া হলো। শিরোপা রক্ষার জন্য আলীকে সুযোগ দেয়া হলো না। অর্থাৎ আলী তার শিরোপা কোনো রিংয়ে হারাননি। বরং হারিয়েছেন নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে।


কারাগার থেকে মুক্তির পর ১৯৭০ সালে জেরি কোয়ারির বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে আলী তার প্রত্যাবর্তনের কথা জানিয়ে দিলেন। কিন্তু তদানীন্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জো ফ্রেজিয়ারের মোকাবেলায় সুবিধা করতে পারলেন না তিনি। ‘দি ফাইট অব দি সেঞ্চুরি’ নামে খ্যাত মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত ১৯৭১ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ১৫ রাউন্ডের সেই লড়াইয়ে অল্প পয়েন্টের ব্যবধানে হেরে গেলেন। এই লড়াইয়ের আগে পর্যন্ত দুজনই ছিলেন অপরাজিত। তাই এ নিয়ে বেশ আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আলী হাল ছাড়ার পাত্র নন। অবশ্য ফিরতি লড়াইয়ে নামার সুযোগ পেলেন না। তত দিনে জর্জ ফোরম্যান হেভিওয়েট শিরোপা জিতে নিয়েছে। তবে পরবর্তীকালে দু’বার ফ্রেজিয়ারকে হারিয়ে সেই পরাজয়ের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন। ফ্রেজিয়ারের কাছে পরাজয়ের পর আলী কেন নরটনের কাছেও হেরে গিয়েছিলেন। আলী শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছিলেন জর্জ ফোরম্যানকে হারিয়ে।


জায়ারের (পরবর্তী নাম কঙ্গো) কিনসাসায় নক আউট করেন জর্জ ফোরম্যানকে। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয় লড়াইটি। আলী-ফোরম্যান লড়াইটি মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা লড়াইগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। এটির নাম দেয়া হয় ‘রাম্বল ইন দি জাঙ্গল’। আলীর বয়স তখন ৩২ বছর। বয়সের ভারে তার সেই ফুটওয়ার্ক আর হাতের কৌশল অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। অন্য দিকে ফোরম্যান তার সর্বোচ্চ ফর্মে। মাত্র ২৬ বছরের তাগড়া যুবক ফোরম্যান ৪০টি লড়াইয়ে অপরাজিত। এই লড়াইয়ে ফোরম্যান সহজেই জয়ী হবে বলে মনে করছিল অনেকেই। তা ছাড়া এর আগে মাত্র একজন দ্বিতীয়বার হারানো শিরোপা ফিরে পেয়েছিলেন। তাই ফোরম্যানের দিকেই পাল্লা ভারী ছিল। তবে আলীর অতি উৎসাহী মনোবল তার সমর্থকদের উজ্জীবিত করে তুললো। টান টান উত্তেজনার সৃষ্টি হলো।
আলী সেই লড়াইয়ে ‘দি রোপ-এ ডোপ’ কৌশল উদ্ভাবন করেন। আলী বুঝতে পেরেছিলেন আফ্রিকার তাপমাত্রার জন্য তিনি তার সেই নৃত্য অব্যাহত রাখতে পারবেন না। তাই তিনি ফোরম্যানকে ক্লান্ত করতে তাকে ঘুষি মারতে উদ্বুদ্ধ করেন। আলী ফোরম্যানের মারাত্মক ঘুষিগুলো হজম করেন অবলীলায়। ইতঃপূর্বে আর কোনো মুষ্টিযোদ্ধাই আলীকে এত বেশি আঘাত করতে পারেনি। কিন্তু দেখা গেল, আঘাত হজম করে আলী যতটা না কাহিল হয়েছেন, আঘাত করে করে ফোরম্যান তার চেয়ে বেশি ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়েছেন। ষষ্ঠ রাউন্ডে ফোরম্যানের ঘুষির শক্তি কমে এলো। সপ্তম রাউন্ডে আরো কম। অষ্টম রাউন্ড শেষ হওয়ার ৩০ সেকেন্ড আগে আলী তার চূড়ান্ত আঘাতটি হানেন। নিউট্রাল কর্নারে ফাঁদে ফেলে আলী অরক্ষিত ফোরম্যানকে ডান হাতে ঘুষি দিতে শুরু করেন। সম্ভবত তিনটি লেগেছিল। নিজ কর্নারে ফিরে আসার আগে ফোরম্যানের চোয়ালে ডান হাত সোজা চালিয়ে দেন। প্রতিরোধের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেন ফোরম্যান। রেফারি ১০ গোনার আগে পুরোপুরি উঠতে পারেননি ফোরম্যান। প্রায় এক দশক আগে জয় করা বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপাটি এভাবেই পুনরুদ্ধার করেন আলী। আলী আবার সম্রাট হলেন। এই লড়াইয়ের ধকল কাটাতে অনেক বছর লেগেছিল ফোরম্যানের। এমনকি পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য তাকে মুষ্টিযুদ্ধ থেকে অবসর নিতে হয়েছিল।


এই লড়ায়ের এক বছর পর আলী ফ্রেজিয়ারের মোকাবেলা করেন। ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত হয় লড়াইটি। নাম দেয়া হয় ‘থ্রিলা ইন ম্যানিলা’। অনেকের মতে, এটা মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ লড়াই। আর তার মাধ্যমেই সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন এবার তাকে ১৪ রাউন্ড লড়তে হয়েছিল। সেই সাথে তিনি এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় জয়ের পতাকা উড়ালেন। অর্থাৎ পুরো বিশ্বজয় করলেন তিনি। তার আগে কোনো ক্রীড়াবিদ এমন জয় পাননি।


টানা ১০ বার শিরোপা অক্ষুন্ন রাখার পর ১৯৭৮ সালের ১০ ফেব্র“য়ারি শিরোপা খোয়ান তার থেকে ১২ বছরের ছোট অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন লিয়ন স্পিনসকের কাছে। এটাও ছিল আকস্মিক একটি ঘটনা। আলী যখন সর্বজয়ী, তখন অখ্যাত এই অখ্যাত যোদ্ধার কাছে হেরে গেলেন। তবে আট মাস পর ফিরতি ম্যাচে তিনি স্প্রিঙ্ককে হারিয়ে তৃতীয় বারের মতো শিরোপা পুনরুদ্ধার করেন। এই প্রথম কেউ তৃতীয়বার হেভিওয়েট শিরোপা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলো। আলীর সেই লড়াইটি দেখতে সারা বিশ্ব টেলিভিশনের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। তখন তার বয়স ৩৬ বছর। এই জয়ের পরপরই তিনি অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। তবে দুই বছর পর (লাস ভেগাসে ১৯৮০ সালের ২ অক্টোবর) তিনি আবার ফিরে আসেন ল্যারি হোমসের কাছ থেকে শিরোপার পুনরুদ্ধারের জন্য। অবসরের ঘোষণা দেয়ার পর আলী পুরোপুরি ফ্যামিলিম্যানে পরিণত হন। হোমস ছিল তারই ছাত্র। তারুণ্যে আলীকেই আদর্শ মেনে মুষ্টিযুদ্ধে এসেছিলেন হোমস। তিনি চাচ্ছিলেন না আলীর ক্ষয়িঞ্চু শক্তিকে সবার সামনে মেলে ধরতে। তাই তিনি একটু অস্বস্তি নিয়েই গুরুকে মোকাবেলা করতে নামেন। আলী হয়তো ভেবেছিলেন, অলৌকিক কোনো ঘটনায় তিনি হয়তো জিতে যেতেও পারেন। কিন্তু তা হয়নি। আলী হেরে যান করুণভাবে। ১১ রাউন্ডে পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন আলী। তিনি সেদিন তার সেই জৌলুশ দেখাতে ব্যর্থ হন। তবে আলী এই বলে তৃপ্তি পেতে পারেন, তিনি নক আউট হননি। রিংয়ে তার শেষ দৃশ্যপট মঞ্চস্থ হয় আরো ১৪ মাস পর ১৯৮১ সালের ১১ ডিসেম্বর। এবারের প্রতিপক্ষ ছিলেন জ্যামাইকার ট্রেভর বারবিক। বাহামায় অনুষ্ঠিত লড়াইয়ে এবারো হেরে যান। ৪০ বছর বয়সে শেষবারের মতো রিং থেকে বিদায় নেন। এই দুটি পরাজয় তার বিশালত্বে তেমন প্রভাবই সৃষ্টি করতে পারেনি। হয়তো চাঁদের কলঙ্কের মতো একটু দাগ কেটে গেছে।


বিশ্ব ইতিহাসে সাড়া জাগানো আরো অনেক মুষ্টিযোদ্ধাই আছেন। তবুও আলী একটি ব্যতিক্রম নাম। তিনি নিছক পেশিশক্তির জোরেই জয়ী হননি। রিংয়ে তিনি যে কৌশলের পরিচয় দিতেন, সেখানেই তার শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত। তিনি আগে নিজে আঘাত না হেনে, প্রতিপক্ষকেই উসকানি দিতেন আঘাত করার। নানা উত্তেজনাকর কথা বলে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতেন। তার পায়ের কারুকাজ আর ঘুরেফিরে প্রতিপক্ষের ঘুষিগুলোকে এড়িয়ে যেতেন। ‘প্রজাপতির মতো নৃত্য আর মৌমাছির মতো হুল ফুটাতেন’ তারপর। খুব সহজেই লড়াই শেষ করতে দিতেন না। এ কারণেই যারা খেলা দেখতে আসত, তারা উপভোগ করতে পারত। মুষ্টিযুদ্ধ যে শুধু দানবীয় একটি খেলা নয়, এটিও একটি শিল্প, তিনিই প্রথম এবং শেষবারের মতো সবাইকে বুঝিয়ে দেন।


আলী মানেই প্রচলিত রীতিনীতির বাইরে নতুনত্বকে আহ্বান করার একটি নাম। ইসলাম ধর্মগ্রহণ করাটা তার জন্য খুব একটা সহজ ঘটনা ছিল না। আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিষ্টধর্মের জয়জয়কার। বর্ণবাদ সুগভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে তিনি খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণকে অভিহিত করলেন, ‘মূলে’ ফিরে যাওয়া হিসেবে। তিনি তার আগের পরিচয়কে দাসত্বের দাসখত হিসেবেও অবহিত করলেন। তার এই ঘোষণায় অনেক দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে গেল। শুধু শ্বেতাঙ্গরাই তার শত্র“তে পরিণত হয়নি, তার স্বগোত্রের তথা কালো খ্রিষ্টানরাও তার বিরোধিতায় অবতীর্ণ হলো। তবে তিনি সাহস হারালেন না। নতুন দুয়ার নিজেই খুললেন। সেটি ছিল আফ্রিকা আর মুসলিম বিশ্বের দরজা। তার আফ্রিকা সফর ছিল একটি অনন্যসাধারণ ঘটনা। এই প্রথম আমেরিকার কোনো ক্রীড়াবিদ আফ্রিকা নামে কোনো মহাদেশের কথা সরাসরি স্বীকার করলেন। সারা বিশ্বে যখন আধিপত্যবাদের শিকল ছেঁড়ার আন্দোলন চলছে, তখন তাদের মাঝে তার উপস্থিতি ছিল একটি বিরাট ঘটনা। আমেরিকার মিডিয়া তার এই সফরকে ঢেকে রাখতে চেষ্টার ত্রুটি করেনি। ঔপনিবেশিক যাঁতাকল থেকে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত আফ্রিকান দেশগুলোতে তার আগমন ছিল একটি অভূতপূর্ব বিষয়। তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অথচ তাদের মতো কালো মুসলমানকে নিজেদের মধ্যে পেল। অধিকন্তু তিনি আফ্রিকায় তার পূর্বপুরুষের অস্তিত্বের কথাও জানালেন। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘মুষ্টিযুদ্ধ রক্তপিপাসু কিছু লোকের সন্তুষ্টি ছাড়া কিছুই নয়। আমি আর ক্যাসিয়াস ক্লে নই। কেন্টাকির এক নিগ্রো হিসেবে আমি বিশ্বের, কৃষ্ণাঙ্গ বিশ্বের। পাকিস্তান, আলজেরিয়া, ইথিওপিয়ায় সব সময় আমার বাড়ি আছে। টাকার চেয়ে এটা অনেক বেশি।’ ঘানায় প্রেসিডেন্ট এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা কোয়ামে এনক্রুমা তাকে বরণ করে নেন। এটাই ছিল কোনো রাষ্ট্রনেতার সাথে তার প্রথম কোলাকুলি। মার্কিন কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের আলীর সাথে হ্যান্ডশেক করতে আরো এক দশক সময় লেগেছিল।


আলী আসলে রিংয়ের বাইরেই সবচেয়ে বড় লড়াইটিতে লড়েছেন। যে দেশে তিনি থাকেন, সে দেশের প্রভুদের বিরুদ্ধেই তিনি আন্দোলন করেছেন।
১৯৬৬ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করা সামান্য কোনো ঘটনা ছিল না। ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করার জন্য তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বলা হলো। তিনি ঘোষণা করেন, “তারা কেন আমাকে ইউনিফর্ম পরে বাড়ি থেকে এক হাজার মাইল দূরে যেতে বলবে এবং বাদামি লোকদের ওপর বোমা ও বুলেট ফেলতে বলবে, যখন লুইসভিলে তথাকথিত নিগ্রো মানুষদের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করা হচ্ছে? ভিয়েতকঙের সাথে আমার কোনো বিবাদ নেই। কোনো ভিয়েতনামি আমাকে কখনো ‘নিগার’ বলে ডাকেনি।” তিনি অস্বীকার করলেন সরাসরি। এমনকি তিনি যদি সেদিন চুপচাপ থাকতেন, তবুও তার ওপর এত চাপ আসত না। কিন্তু আলী তা করলেন না। আলীকে প্রথমে নিজ দেশে নিষিদ্ধ করা হলো। তিনি টরন্টো, ফ্রাংকফ্রুট, লন্ডনে (দুবার) শিরোপা রক্ষা করলেন। এতে তার লাভই হলো। তার ফ্যানের সংখ্যা বহির্বিশ্বে বাড়তেই থাকল। কিন্তু দেশে তিনি এমন সমস্যায় পড়লেন, যা তার আগে কোনো ক্রীড়াবিদ পড়েননি। মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একমাত্র আমেরিকান হিসেবে তার অবস্থান পরাশক্তিটির জন্য ছিল এক মহা অস্বস্তিকর ব্যাপার। এক কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমান তরুণ বিশ্বের অন্যতম পরক্রমশালী, শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিষ্টান দেশটির সমালোচনা করবে, আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করবে, তা কোনোমতেই সহ্য করা যায় না। তাই সামরিক বাহিনী তাকে যুদ্ধে পাঠাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলো। আইনজীবীরা তাকে কারারুদ্ধ করার ফন্দি আঁটল। মিডিয়া তাকে তরুণ আমেরিকানদের জন্য সবচেয়ে কদর্য উদাহরণ হিসেবে চিত্রিত করল। তাকে তার অবস্থান থেকে সরিয়ে আনার জন্য অনেক কিছুই করা হলো। অবশ্য ফাঁকে ফাঁকে লোভনীয় নানা প্রস্তাব দিয়ে তাকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টাও কম করা হয়নি। এমনকি সামরিক বাহিনী থেকে এমন প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল, আলী যদি শুধু নাম লেখান, তবেই যথেষ্ট। তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করতে পারবেন, প্রদর্শনী লড়াইয়ে নামতে পারবেন। এমনকি চাইলে পেশাদার লড়াইয়ে নামতে পারবেন। কিংবা অসুস্থতার ভান করে দুই কুলই রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু আলীর সেই এক কথা, ‘যুদ্ধ করা আমার জন্য কোনো ব্যাপার নয়। আমার বিবেক সায় দিলে আমি সহজেই রণাঙ্গনে যেতে পারতাম।’ তিনি বললেন, ‘তারা যখন লুইসভিলের তথাকথিত নিগ্রোদের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করছে, তখন কেন তারা আমাকে ভিয়েতনামের বাদামি মানুষের বিরুদ্ধে বোমা আর বুলেট বর্ষণ করতে বলছে? আমি আমার বিশ্বাস আর অবস্থানে অটল থেকে কিছুই হারাব না। আমি চার শ’ বছর কারাগারে থাকতে পারি।’


তার এই প্রত্যয়ে তার নিজের ভবিষ্যৎই ফ্যাকাসে বলে মনে হলো। তিনি শিরোপা হারালেন, কারারুদ্ধ হলেন, কোটি কোটি ডলার থেকে বঞ্চিত হলেন। মনে হলো, আলী একটি বিস্মৃত নাম। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। পরে আলীর কথাই ঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন যে ভুল ছিল, তা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। আর তিনি ফিরেছেন রাজসিকভাবে। এটা যে কত বড় জয়, তা এক কথায় কি প্রকাশ করা যায়?


অন্য দিকে ফ্রেজিয়ার ও ফোরম্যানের বিরুদ্ধে তার জয় কেবল মুষ্টিযুদ্ধেই সীমিত থাকেনি। এসব লড়াইকে স্রেফ মুষ্টিযুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করা হলে ভুল হবে। চামড়ায় কালো হলেও এই দু’জন ছিলেন আসলে শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সরকারের, খ্রিষ্টান ধর্মের প্রতিনিধি (এখানে তা একটি বিশ্বাসের নাম নয়, এটা আগ্রাসী সংস্কৃতির প্রতিভূ বিবেচনা করেছেন অনেকে। আর আলীর ইসলাম ছিল সেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা সংস্কৃতি)। ভিয়েতনামে আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানানোর কারণে আলীর শিরোপা কেড়ে নিয়ে দেয়া হয়েছিল ফ্রেজিয়ারকে। তাকে তখন মার্কিন সরকারের অনুকূলে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। অধিকন্তু তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান খ্রিষ্টান। ১৯৬৮ সালে মেক্সিকো অলিম্পিকে মার্কিন বর্ণবাদী নীতির বিরুদ্ধে পদকজয়ী দুই অ্যাথলেটিক টমি স্মিথ ও জন কার্লোস কালো দস্তানা পরে করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তখন মুষ্টিযুদ্ধে স্বর্ণজয়ী ফোরম্যান এফবিআইয়ের পরামর্শক্রমে মার্কিন পতাকা দুলিয়েছেন। তিনিও ছিলেন নিষ্ঠাবান খ্রিষ্টান। তাই এ দু’জনের বিরুদ্ধে তার জয় ছিল প্রচলিত ও পরাক্রমশালী শক্তি ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই বিজয়। কিনসাসায় ফোরম্যানের বিরুদ্ধে লড়ার আগে মোহাম্মদ আলী টিভি ক্যামেরার সামনে বলেন, ‘আমি আল্লাহর জন্য এবং আমার জনগণের জন্য লড়ছি। আমি টাকার জন্য বা খ্যাতির জন্য লড়ছি না। আমি আমার জন্য লড়াই করছি না। আমি কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের উন্নতির জন্য, যেসব কৃষ্ণাঙ্গের ভবিষ্যৎ নেই, যেসব কৃষ্ণাঙ্গ মদ আর মাদকাসক্তিতে ডুবে রয়েছে, তাদের জন্য লড়ছি। আমি আল্লাহর হয়ে কাজ করছি।’
এটিও সহজ কোনো ঘোষণা ছিল না। তিন আরো বলেন, ‘এই ফোরম্যান খ্রিষ্টানত্ব, আমেরিকা এবং সেই পতাকার প্রতিনিধিত্ব করছে, আমি তাকে ছেড়ে দেব না। সে কুকুরের মাংসের প্রতিনিধিত্ব করছে।’


তিনি তার ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। আর পেরেছিলেন বলেই তাকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছে সবাই। যে আলীকে একদিন যে শ্বেতাঙ্গ রেস্তোরাঁয় খেতে দেয়া হয়নি, সেখানে তিনি হয়েছিলেন পরম আকাক্সিক্ষত ব্যক্তি। যে দেশ তাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল, সেই আমেরিকাতেই আলী সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েছেন। যে পদকটি তিনি ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন একদিন, সেটি আবার নতুন করে তাকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে। সাদা কালো, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নাম হলো আলী। ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিক গেমসের মশাল প্রজ্বলনের সম্মানটি তাকেই দেয়া হয়। আলী যখন মশালটি প্রজ্বলন করেন, তখন অনেককেই আবেগে কেঁদে ফেলেন। তবে অনেকেই বলে থাকে, পারকিনসন রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আলী যখন করুণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন, তখনই সাদা আমেরিকা তাকে পুরোপুরি গ্রহণ করেছে।


চলৎশক্তি হারিয়ে ফেললেও সবাই তাকে কাছে পেতে চায়। আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, পোপ, দালাই লামা সবাই তাকে আগ্রহভরে গ্রহণ করে। তৃতীয় বিশ্বে তিনি ক্রমাগত ছুটে চলেছেন নানা মিশনে। এমনকি ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে কয়েকজন মার্কিন পণবন্দীকে মুক্তির জন্য তিনি আলোচনা জন্য সাদ্দাম হোসেনের কাছে যান।


আলীর মুষ্টিযুদ্ধ জীবনকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটিকে ধরা যেতে পারে, মুষ্টিযুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে অলিম্পিক স্বর্ণলাভ এবং হেভিওয়েট শিরোপা বিজয়। তারপরের ধাপটি হলো এক মানবতাবাদী নেতার আত্মপ্রকাশ। এই পর্যায়ে তিনি আফ্রিকা জয় করেছেন, মূলে প্রত্যাবর্তন করেছেন, যুদ্ধবিরোধী ভূমিকা পালন করেছেন তথা সর্বগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন। তারপর তৃতীয়পর্যায়ে তিনি হারানো সম্মান পুনরুদ্ধার করেছেন, এক নতুন যোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আর সব শেষে তিনি বিশ্ব নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তা ছাড়া শান্তি, সামাজিক দায়িত্ব, সম্মান এবং ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য তিনি কেন্টাকির লুইসভিলে নির্মাণ করেছেন মোহাম্মদ আলী সেন্টার। প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত এই কেন্দ্রটি ২০০৫ সালে উদ্বোধন করা হয়।


আলী শেষজীবনে বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন। যেখানেই যান, বাঁধভাঙা সংবর্ধনা পেয়েছেন। এত কিছুর পরও তীক্ষ্ন রসবোধ হারিয়ে ফেলেননি। মুষ্টিযুদ্ধে তার গড়া রেকর্ড অক্ষুন্ন থাকেনি। কিন্তু মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব, উজ্জ্বল তারকা হিসেবে তিনি বিশ্বের যে উচ্চতায় উঠতে পেরেছেন, তা তার আগে কেউ পারেনি, হয়তো পরেও কেউ পারবে না। তিনি যে প্রত্যয় নিয়ে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছিলেন, তাতে এই সম্মান কেবল তারই প্রাপ্য।