গুলশান হামলায় অর্থনীতিতে শঙ্কা

Aug 15, 2016 08:25 am


সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু


দৃশ্যপট-১.
গত ২৩ জুলাই বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানিলন্ডারিংয়ের (এপিজি) বার্ষিক সাধারণ সভা বাতিল। এতে ৪০০টি বিদেশী প্রতিনিধির অংশ নেয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশের পরিবর্তে এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে।

দৃশ্যপট-২
এশিয়া-প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের (অ্যাপনিক ৪২) সম্মেলন স্থগিত। বাংলাদেশের পরিবর্তে এটি এখন শ্রীলঙ্কা বা থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হবে। এতে ৪৫০ জন প্রতিনিধি অংশ নেয়ার কথা ছিল।
দৃশ্যপট-৩
বাংলাদেশে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সব কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা

দৃশ্যপট-৪
মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পে টেন্ডারপ্রক্রিয়া এক মাস পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ নিরাপত্তা, এখানে জাপানিদের ২৯ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা রয়েছে।

এই দৃশ্যপটের সবগুলোর সৃষ্টি হয়েছে গত ১ জুলাই গুলশানে অবস্থিত ‘হোলি আর্টিজান বেকারি’তে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে। এই হামলায় পাঁচজন জঙ্গি ছাড়াও ২০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিদেশীদের সংখ্যা ১৭। এই ১৭ জনের মধ্যে ১০ জন জাপানি এবং সাতজন ইতালির নাগরিক। যেসব জাপানি নিহত হয়েছেন তাদের সবাই ঢাকা মেট্রো রেলের পরামর্শক হিসেবে এখানে এসেছিলেন। আর ইতালীয়রা এখানে কাজ করতেন তৈরী পোশাক শিল্পে। এই নির্মম ঘটনার পর জাপান অনানুষ্ঠিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না দেয়া পর্যন্ত তারা আর কোনো পরামর্শককে এখানে পাঠাবে না।
একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় বাংলাদেশে বৈধভাবে প্রায় কুড়ি হাজার বিদেশী কাজ করেন। এদের মধ্যে বেশির ভাগ রয়েছেন তৈরী পোশাক শিল্পে। বাকিরা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।


গুলশান হামলার পর এসব বিদেশীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আবার অনেকে দ্রুত বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করছেন। এসব কারণে জাপানি কোম্পানি ফাস্ট রিটেইলিং তার কর্মীদের বাংলাদেশ সফর স্থগিত করে দিয়েছে। বিদেশী ক্রেতাদের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে আসছেন না। ফাইভ স্টার হোটেলে এখন বিদেশীদের সংখ্যা নামমাত্র। এমনকি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রেসিডেন্ট শিনিচি কিটোওকাব নিরাপত্তা শঙ্কায় ঢাকা সফর স্থগিত করেছেন। ৬ আগস্ট তার ঢাকা আসার কথা ছিলো।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ এসেছে, শীর্ষ রফতানিকারকেরাও বলছেন হোলি আর্টিজানে হামলার পর বিদেশী ক্রেতারা আর আসছেন না, উল্টো রফতানিকারকদেরই তাদের কাছে গিয়ে বৈঠক করতে হচ্ছে। এটা ঘটছে সব কারখানা মালিকের ক্ষেত্রেই। তবে তাদের কেউই এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলতে চাননি। কারণ সরকারের প্রভাবশালী মহল যদি মনোক্ষুণœ হয়! তারা প্রকাশ্যে বলে চলেছেন, সব কিছু ঠিকঠাকমতো চলছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। সব জায়গায় একটা গুমোট ভাব বিরাজ করছে। সব খরচাপাতি দিয়েও বিদেশী ক্রেতাদের এখানে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশের রফতানির সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা বলছেন, জুলাই-আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে স্কুল-কলেজগুলোতে ছুটি থাকে। ফলে এ সময়ে ওই সব দেশের ব্যবসায়ীরা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই দুই মাস ক্রেতারা আসেন কম। এর সঙ্গে গুলশান ট্র্যাজেডি যোগ হওয়ায় তাদের আগমন আরো কমে গেছে। তবে কোনো দেশের ক্রেতাই বাংলাদেশ থেকে পোশাকের অর্ডার বাতিল করছেন না। রফতানিকারকদের আশা, সরকারের নেয়া পদক্ষেপের ফলে সেপ্টেম্বর থেকে ক্রেতাদের আগমন বাড়তে পারে।


গুলশান হামলার পর বিদেশী ক্রেতারা যাতে ভয় না পান সে জন্য বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশন (বিজিবিএ) তাদের সব বিদেশী সদস্য ও ক্রেতার কাছে ই-মেইল পাঠিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘গুলশান ঘটনার পর বিদেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি, গার্মেন্ট ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব বিদেশীর শতভাগ নিরাপত্তা সরকার নিশ্চিত করবে। এ ব্যবসায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিদেশীরা বাংলাদেশ সফরকালে যেকোনো স্থানে চলাচলের ক্ষেত্রে পূর্ণ নিরাপত্তা পাবেন। পোশাক আমদানির উদ্দেশ্যে গার্মেন্ট কারখানা পরিদর্শন, মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠক বা আলোচনা করতে বাংলাদেশে আসা বিদেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’
বিজিবিএর মহাসচিব আমিনুল ইসলাম একটি পত্রিকায় বলেছেন, ‘আমাদের সব বিদেশী সদস্যকে ই-মেইল পাঠিয়ে বাংলাদেশ সফরকালে তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছি। গত দুই দিনে তিনটি বিদেশী ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসেছে। এদের মধ্যে একটি চলে গেছে, দু’টি আছে। তবে অনেক ক্রেতাই এখন আসছেন না।

 

ইভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেছেন, প্রায় সব গার্মেন্টের ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটছে, ক্রেতা আসছেন না। কারখানার মালিককে বিদেশে গিয়ে তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাকের ক্রেতারা উন্নত দেশের। তারা তাদের সরকারের কাছ থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ না পাওয়া পর্যন্ত আসতে আগ্রহী হবেন না। সে জন্যই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশীদের নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ সম্পর্কে জানিয়ে দূতাবাসগুলোতে চিঠি দেয়া উচিত। তাতে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে যে বিদেশীদের ওপর এ ধরনের হামলা আর হবে না।
একাধিকবার পুরস্কারপ্রাপ্ত ২৬টি পোশাক কারখানার মালিক হা-মীম গ্রুপের কর্ণধার এ কে আজাদ বলেন, ‘কোনো ক্রেতাই বাংলাদেশে আসছেন না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৮টি দেশ ও জাপানের ক্রেতারা একেবারেই আসছেন না। তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সভা করার জন্য এখন আমাদেরই বিদেশে যেতে হচ্ছে।’

এদিকে, গুলশানে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে চলতি মওসুমে তৈরী পোশাক রফতানিতে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলার ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশন (বিজিবিএ)-এর সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসাইন বাবুল। এক সংবাদ সম্মেলন করে তিনি জানিয়েছেন, ইতালির নাগরিক যারা নিহত হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশে পোশাক ব্যবসায়ের সাথে জড়িত ছিলেন। এসব ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় পোশাক রফতানি করতেন। এখন তাদের কারখানাগুলো নিষ্ক্রিয় রয়েছে। ফলে চলতি বছরে পোশাক রফতানি কমে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, জাপানি মালিকানাধীন পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিকোলা সূত্র জানিয়েছে, গুলশান ঘটনার কারণে তাদের সব ধরনের কর্মকর্তার বাংলাদেশ সফর স্থগিত করা হয়েছে।


তবে এত কিছুর পর সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের ডেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে তাদের কোনো ভয় নেই, ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাও দেয়া হবে। গত ২৮ জুলাই বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাীয়দের সাথে বৈঠক করেন। সেখানে ব্যবসায়ীরা সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে বলেন সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। সব কিছু স্থিতিশীল রয়েছে। কোনো বিদেশী ক্রেতা চলে যায়নি এবং কোনো রফতানি আদেশও বাতিল হয়নি। কোনো কোনো মহল এসব নিয়ে মিথ্যে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। তবে এ ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে বিদেশী ক্রেতাদের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের এ আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আর আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকে জঙ্গি বিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা দিতে হবে।
বৈঠকে এফবিসিসিআই সভাপতি মাতলুব আহমাদ, মেট্রোপলিটন চেম্বার সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, স্কয়ার গ্রুপের তপন চৌধুরী, বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান, বিজেএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মইন উদ্দিন মিন্টু প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার ঘটনাকে ‘বৈশ্বিক সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, এখানে কোনো রাজনীতি টেনে আনা উচিত নয়। সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ সমস্যা মোকাবেলা করা হবে।
সন্ত্রাস ও জঙ্গি মোকাবেলায় সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রশংসা করে ব্যবসায়ীরা আরো বলেন, বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে এ ঘটনায় সরকার কী পদক্ষেপ নেয়। এটাই এখন মুখ্য বিষয়।
এফবিসিসিআই সভাপতি মাতলুব আহমাদ বলেন, ‘পহেলা জুলাই যে ঘটনা ঘটেছে এতে আমরা সবাই বিস্মিত হয়েছি। এ ধরনের ঘটনা আমরা ইতঃপূর্বে ফেস করিনি। এ ধরনের ঘটনার পর পৃথিবী দেখতে চায় সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনায় যেভাবে ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়েছেন এবং শক্তভাবে মোকাবেলা করেছেন এতে করে বিশ্ববাসীর কাছে এই মেসেজ পৌঁছে গেছে যে, বাংলাদেশ জঙ্গিবাদকে কোনো প্রশ্রয় দেবে না।
‘বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পূর্ণ স্বাভাবিক’ দাবি করে তিনি আরো বলেন, ‘জঙ্গি হামলার ঘটনা পরিবহন খাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। বিদেশীরাও কাজ করছে স্বাভাবিকভাবেই।’
মেট্রোপলিটন চেম্বার সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘জুলাইয়ের এক তারিখে যে ঘটনাটা ঘটেছে সেটা আজকের সমগ্র পৃথিবীর বাস্তবতা, এটা এখন বাংলাদেশে এসেছে। এত দিন এটা আমাদের মোকাবেলা করতে হয়নি, এখন করতে হচ্ছে। এ ঘটনায় বিদেশী ক্রেতারা যেটা দেখতে চাচ্ছে, সেটা হচ্ছে আমাদের রেসপন্সটা কী এবং আগামীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আমাদের রেসপন্সটা কেমন হবে? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটাই সরকারকে খুব বড় করে তুলে ধরতে হবে।’
‘নিরাপত্তার জন্য সরকার এখন যে সাপোর্টটা দিচ্ছে, এটা অনবরত দিয়ে যেতে হবে’ উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, সেটা শিল্পকারখানায় হোক বা রিটেল দোকানে হোক, ভবিষ্যতে স্কুলেও যদি প্রয়োজন হয়। আমাদেরকে আস্থাটা ধরে রাখতে হবে।’
বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান বলেন, ‘দেশের গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করার জন্যই এ শিল্পের ক্রেতাদেশের নাগরিকদের ওপর গুলশানে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে বলে আমি মনে করি।


নিরপেক্ষ বিশ্লেষকেরা বলেছেন, গুলশান ঘটনা বাংলাদেশে রফতানি বাণিজ্যে দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব ফেলবে তা নিশ্চিত বলা যায়। সহসা বিদেশীরা আগের মতো বাংলাদেশে আসবে না। কারণ কেউও চাইবে না নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য কোনো জায়গায় তারা প্রাণ হারাক। আর বিদেশীরা এখানে এলেও তাদের সব সময় একটি নিরাপত্তার বেড়াজালে থাকতে হবে। এটি তাদের স্বাভাবিক চলাচলকে ব্যাহত করতে পারে। এটি তাদের অস্বস্তিরও কারণ হতে পারে।