কেরির সফর ও বিএনপি

Sep 20, 2016 10:56 am



মঈন উদ্দিন খান


আগস্টের শেষ সপ্তাহে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। তার এই সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনাকল্পনা ডানা মেলেছে। মার্কিন নির্বাচনের দুই মাস আগে হঠাৎ করে জন কেরির সফরের তালিকায় কেন বাংলাদেশ ছিল, তা নিয়ে সরকার ও বিরোধী মহলে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা স্থান পেয়েছে। সরকারি দল কেরির সফরকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ফসল হিসেবে দেখছেন। অন্য দিকে বিরোধী দল কেরিকে জানিয়েছেন বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার কথা।


সাদা চোখে ঢাকায় সংক্ষিপ্ত সফরকালে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে আলোচনায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থা দমনে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যাবোধগুলো সমুন্নত রাখার বার্তা দিয়েছেন। বিরোধী রাজনীতিকদের কাছে তিনি নিরাপদ গণতন্ত্রের জন্য বহুদলীয় পদ্ধতি ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আর নাগরিক সমাজ ও তরুণদের তিনি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্তের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার তাগিদ দেন। সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবেলা করতে গিয়ে বিরোধী দলগুলোর কণ্ঠরোধ এবং জনসমক্ষে বিতর্ক বন্ধ করার প্রলোভনের ফাঁদে পা না দিতে বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন জন কেরি।


ক্ষমতাসীনরা কেরির সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ ও সফল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দেয়া এবং অতিথি খাতায় কেরির লেখা মন্তব্যটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এটিকে তারা হিরোশিমায় নিহতদের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শ্রদ্ধা জানানোর সাথে তুলনা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে য্ক্তুরাষ্ট্রের ফেলা পারমাণবিক বোমায় হিরোশিমা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে অতিথির খাতায় কেরি লিখেছেন, এই ট্র্যাজেডি একটি মেধাবি ও সাহসী নেতৃত্বের পরিসমাপ্তি। তবে আজ বাংলাদেশ শেখ হাসিনার শক্তিশালী নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারি দলের বক্তব্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেয়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন কেরি। আর নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া প্রস্তাবগুলো সরকার খতিয়ে দেখছে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনের নিরিখেই এ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নেবে বলে কেরিকে জানানো হয়েছে।


তবে কেরির সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বৈঠক। খালেদা জিয়া ও জন কেরির মধ্যে ঠিক কী আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল রয়েছে। বিএনপির লক্ষ্য যেখানে দ্রুত জাতীয় নির্বাচন আদায়, সে প্রসঙ্গে কোনো ‘আশ্বাস’ মিলেছে কি না এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে বেশ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৈঠকে বিএনপির তরফ থেকে চলমান সঙ্কট নিরসনে একটি ‘গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু’ নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরলে, জন কেরি এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন বলে ঈঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বরাবরই গণতন্ত্রের পক্ষে, তারা কেবল জনগণের রায়কেই সমর্থন করে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র যাতে অক্ষুন্ন থাকে, সে বিষয়ে তারা আরো যত্নবান হবে।


বৈঠকে বিএনপির আলোচনার মূল বিষয় ছিল নির্বাচন ও গণতন্ত্র। জন কেরি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক কালে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন বলে খালেদা জিয়াকে এ সময় জানিয়েছেন। বিএনপি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি দক্ষ শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলে কেরি তাতে একমত পোষণ করেন। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রও ভূমিকা রাখতে পারে বলে খালেদা জিয়াকে জানান কেরি।


তবে আলোচনা যা-ই হোক, বর্তমান বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদের সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠক না করে খালেদা জিয়ার সাথে বৈঠক করায় বিএনপির মাঠপর্যায়ে এর যথেষ্ট প্রভাব পড়েছে।

 

বিএনপির ঈদ-পরবর্তী রাজনীতি
ঈদুল আজহার পর থেকে বিএনপি মূলত নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করবে এমন আভাসই পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের কেউ কেউ ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন হবে না, এমন কথা বললেও বিএনপির কাছে তথ্য রয়েছে, সরকার নির্ধারিত সময়ের আগে নির্বাচন দিতেও পারে। সে ক্ষেত্রে দলের অবস্থান কী হবে, নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো কী হবে, বিএনপি কোন অবস্থায় সে নির্বাচনে অংশ নেবে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঈদের পর আনুষ্ঠানিকভাবে হোমওয়ার্ক শুরু করবে বিএনপি।


আন্দোলন থেকে দূরে থাকা বিএনপি পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। দলটির নেতারা বলছেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। কিন্তু এটি নির্ভর করছে সরকারের আচরণের ওপর। সরকার যদি আবার একতরফা কোনো নির্বাচনের দিকে পা বাড়ায় তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তারা বলছেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনই পারে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্তি দিতে।


এ দিকে বিএনপি মাঠও গোছাচ্ছে। ৫০২ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের পর এখন বেশ কয়েকটি উপকমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব কমিটিতে আরো তিন শ’ নেতা জায়গা পাবেন। তৃণমূল সংগঠন গোছানোর কাজ এগিয়ে চলছে। জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত নতুন কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। হজ পালন শেষে দেশে ফিরে খালেদা জিয়া আরো কিছু সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানা গেছে।