ট্রাম্পের জয়ে বদলে যাবে পুরো দুনিয়া

Nov 09, 2016 11:33 am

 

পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প জয়ী হতে পারেন, এমন আশায় থাকা লোকের সংখ্যা একেবারে কম ছিল না; কিন্তু তবুও একটা বড় অংশের মনে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত হিলারি ক্লিনটনই জয়ী হবেন। হিলারির জয় মানে ছিল, দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে ধারার সৃষ্টি করেছিল, সেটা কোনো-না-কোনোভাবে মোটামুটিভাবে অব্যাহত থাকবে; কিন্তু ট্রাম্পের জয়ে সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় সবখানেই এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবেই অনুভূত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সব কিছুই ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার মানসিকতা যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পারে। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের আলোকে ট্রাম্পের আমলে সম্ভাব্য বিশ্বপরিস্থিতির রূপরেখা নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ

 

ন্যাটো
ট্রাম্প অনেক আগেই বলেছিলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ২৮ জাতির ন্যাটো তাদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করছে না। যুক্তরাষ্ট্র এই সংস্থার ৭৩ ভাগ অর্থ প্রদান করছে। এটা অযৌক্তিক। নিরাপত্তা ভোগ করতে হলে সবাইকেই যার যার ব্যয়ভার বহন করতে হবে। ট্রাম্প সোজাসাপ্টাভাবে নির্বাচনের আগেই বলে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সারা দুনিয়ার পুলিশ হতে পারে না। তার এই ধারণা ন্যাটোর জন্য হুমকির কারণ হতে পারে। তারা যদি বেশি অর্থ দিয়েই নিরাপত্তা কিনতে হয়, তবে কেন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব মেনে নেবে। তারা নিজেদের মতো করে পথ চলার চেষ্টা করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

 

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া
বারাক ওবামা চেষ্টা করেছিলেন, ব্রিটেন যাতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থেকে যায়। তার চেষ্টা সফল হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাবনা ওবামার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মতে, ব্রেক্সিটের জয় মানে জনগণ আবার সীমান্ত চায়। অর্থাৎ জোটবদ্ধ থাকার ধারণা পাল্টে যেতে পারে এখন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অখণ্ড থাকলে লাভ হতো যুক্তরাষ্ট্রের। অভিন্ন ফ্রন্ট হিসেবে রাশিয়া, চীন এবং অন্যদের মোকাবেলা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হয়; কিন্তু ট্রাম্প সেটা মানেন না। ফলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আরো ভগ্নদশা প্রায় নিশ্চিত।

 

বিদেশে সেনা মোতায়েনে পরিবর্তন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে আরেকটি বিশেষ পরিবর্তন হতে পারে। সেটা হলো বিদেশে মার্কিন সেনা কমে যেতে পারে। এত দিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের মোড়ল হিসেবে বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে রাখত; কিন্তু ট্রাম্প এই ধারণায় বিশ্বাসী নন। সবার ওপর খবরদারি করার দরকার নেই। কেউ যদি তার স্বার্থে মার্কিন সেনা রাখতে চায়, তবে সে জন্য তাকে অর্থ দিতে হবে। তিনি আগেই বলে দিয়েছিলেন, ‘আমরা দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিকে রক্ষা করছি, তাই আমাদের সামরিক ব্যয়ের জন্য অবশ্যই এসব দেশের সাথে আলোচনা করব।’ তিনি আরো বলেছেন ‘সৌদি আরবের মতো বিশ্বের কয়েকটি ধনী দেশকেও আমরা রক্ষা করছি। আমরা তাদের রক্ষা করলেও বিনিময়ে কিছুই পাচ্ছি না। আমরা এখন তাদের সাথে সামরিক চুক্তি, ব্যবসায়িক চুক্তি করব।
তার এই বক্তব্যের রেশ ধরে বলা যায়, ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যদি সমঝোতায় না পৌঁছে, তবে এসব অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ সাশ্রয় করবে। এই অর্থ অনেক কল্যাণকর খাতে ব্যয় করতে পারবে। আবার এসব দেশও নিজেদের প্রতিরক্ষার ওপর জোর দেবে, কিংবা নতুন মিত্র খুঁজবে। তা না পারলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই চুক্তি করবে। এখানে যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি হিসেবে থাকছে না, অনেকটা সিপাহি বিদ্রোহ-পূর্ববর্তী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে পরিণত হবে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। ইসরাইলের প্রতি আগে থেকেই তার ভালো সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প মনে করেন, সেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। কাউকে আগে থেকেই ভালো লোক এবং কাউকে মন্দ লোক হিসেবে অভিহিত করতে চান না তিনি। নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন, ইসরাইল এবং তার প্রতিবেশীদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জোর দেবেন। ফিলিস্তিনি সমস্যা তিনি আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে চান।

 

ইরান
ইরানের সাথে চুক্তি করে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের একটি পরিবর্তন এনেছিলেন বারাক ওবামা। ট্রাম্প মনে করেন, ইরানের পরমাণু হুমকি একটি বড় ধরনের সমস্যা। ইরানের সাথে পাশ্চাত্যের চুক্তিটি যথাযথ হয়নি বলে মনে করেন। ফলে এই চুক্তি এখন বাতিল করতে চাইতে পারেন। ইরানের ওপর নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। তা হলে মধ্যপ্রাচ্যে আবার নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এটা কেবল ইরানেই সীমিত থাকবে না। চুক্তি হওয়ার পর ইউরোপের অনেক দেশের সাথেই ইরান বিভিন্ন বাণিজ্যিক সমঝোতা করেছে। এখন এক দিকে ইউরোপের প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ভর্তুকি দেবে না, আবার ইরানের সাথে চুক্তিও রাখবে না, এমন অবস্থায় তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আগের মতো না-ও মানতে পারে। সে ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।

 

আইএস ও সিরিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের আইএস এবং সিরিয়া নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে তিনি ভালোভাবেই কাজ করতে পারবেন বলে জানিয়েছিলেন। সেটা যদি হয়, তবে কেবল আইএস বা সিরিয়া নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই নতুন সমীকরণ দেখা যেতে পারে।

 

চীনের সাথে সম্পর্ক
ওবামার আমলে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বেশ জটিল হয়ে পড়েছিল। ট্রাম্প এই সম্পর্কে পরিবর্তন আনবেন বলে ধারণা করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া নীতিই বদলে যাবে। হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় এশিয়াকে ভরকেন্দ্র হিসেবে ধরে যে নীতি প্রণয়ন করেছিলেন, তা অব্যাহত ছিল। ট্রাম্প যে তা মানবেন না সেটা বলাই বাহুল্য।
ব্যবসায়ী ট্রাম্প চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থেকে সুবিধা আদায় করতে চাইতে পারেন। তা হলে তিনি চীনের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে চাইতেই পারেন। কেবল চীনের সাথেই নয়, উত্তর কোরিয়ার সাথেও আলোচনা শুরু করা সম্ভব বলে তিনি আগেই আভাস দিয়েছিলেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে আগেই তিনি বন্ধু বলে ঘোষণা করেছিলেন। সব মিলিয়ে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে এশিয়ায়।