মিশ্র সংস্কৃতির দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা

Dec 17, 2016 08:18 am


লিয়াকত আলী


বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম, কারাভোগ ও অবশেষে সাফল্যের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নেলসন ম্যান্ডেলার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। স্বর্ণ ও হীরাসহ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটি আফ্রিকা মহাদেশের সর্বদক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। পশ্চিমে আটলান্টিকের এবং দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে ভারত মহাসাগরের ২৭৯৮ কিলোমিটার বা ১৭৩৯ মাইল উপকূল ঘেরা নয়নাভিরাম ভূখণ্ড নিয়ে এটি গঠিত। উত্তর-পশ্চিমে নামিবিয়া, উত্তরে জিম্বাবুয়ে ও বতসোয়ানা এবং উত্তর-পূর্বে রয়েছে মোজাম্বিক ও সোয়াজিল্যান্ড। দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব অংশের একটি অংশ নিয়ে রয়েছে লেসোথো রাজ্য, যার আয়তন ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় তিন গুণ।


ইতিহাস :

দক্ষিণ আফ্রিকায় যারা প্রথমে বসতি স্থাপন করে তারা স্যান নামে পরিচিত। এরপর আসে খৈ খৈ ও বান্টু ভাষার লোকজন। আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চল থেকে এরা যাযাবর হিসেবে এখানে আসে। ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে কেপ সাগরপথ আবিষ্কারের দেড় শ’ বছর পর ১৬৫২ খ্রিষ্টাব্দে হল্যান্ডের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে একটি বিশ্রামকেন্দ্র স্থাপন করে। পরে সেটাকেই কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে কেপটাউন শহর। তখন সেখানে বাস করত স্থায়ী জোনা ও জুলু সম্প্রদায়।


কেপটাউনে ইউরোপীয়দের আগমন ও বসতি স্থাপন বাড়তে থাকে। তবে অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত তা ছিল প্রায় ১৫ হাজার। স্থানীয় অধিবাসী ও বসতি স্থাপনকারীরা ১৭৯৫ সালে একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা চালায়। হল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স ইত্যাদি ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত লোকজন একসাথে এ প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু ব্রিটিশরা প্রবল হয়ে ওঠে এবং ১৮০৬ সালে কেপটাউনকে ব্রিটিশ উপনিবেশ করে নেয়। ১৮১৫ সালে নেপোলিয়ানের যুদ্ধের শেষে ব্রিটিশরা পুরো এলাকায় দখল প্রতিষ্ঠা করে এবং আরো পাঁচ হাজার বসতি স্থাপন করে। ইউরোপের অন্য বাসিন্দাদের তারা আফ্রিকার উত্তর ও পূর্ব দিকে বিতাড়িত করে। এদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২ হাজার। সেখানে গিয়ে তারা ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।


১৮৬৭ সালে সেখানে হীরক ও নয় বছর পরে স্বর্ণ খনি আবিষ্কৃত হয়। তখন যেমন বাইরের লোকদের আগমন বেড়ে যায়, তেমনি কেপ কলোনির প্রধানমন্ত্রী সেসিল রোডস চক্রান্ত আঁটতে থাকেন উত্তর ও পূর্বাঞ্চলকে একীভূত করে নেয়ার জন্য। আসলে এটা ছিল খনিজসম্পদ দখলে নেয়ার জন্য স্থানীয়দের সাথে ব্রিটিশ শক্তির সঙ্ঘাত। ১৯০২ সালে স্থানীয়রা পরাজিত হয়। তবুও ব্রিটিশরা এখানে সীমিত স্বায়ত্তশাসন দান করে এবং ১৯১০ সালে গঠিত হয় ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকা। আগের দুই প্রজাতন্ত্র এবং পুরনো কেপ ও নাটাল উপনিবেশ এ চারটি প্রদেশ নিয়ে এটা গঠিত হয়। অব্রিটিশ লুইস বোথা হন প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তবে ১৯১২ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস গঠিত হওয়ার পর আফ্রিকানদের মধ্যে সংগঠিত রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু হয়।


বর্ণবাদের কুখ্যাতি
দক্ষিণ আফ্রিকা পুরোপুরি স্বাধীন ও প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে ৩১ মে ১৯৬১ সালে। কিন্তু ঔপনিবেশিককাল থেকে এখানে যে বর্ণবাদী আইন ও ব্যবস্থা চলে আসছিল, তার অবসান ঘটতে সময় নেয় আরো তিন দশকের বেশি। ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয়রাই ১৯১০ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিল। সাদাদের প্রাধান্য দিয়ে ও তাদের স্বার্থ অগ্রাধিকার দিয়ে আগে থেকেই বেশ কয়েকটি আইন ছিল। ১৯৩৬ সালে কালো ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। এরপর অর্ধশতাব্দী ধরে দক্ষিণ আফ্রিকার অশ্বেতাঙ্গ লোকদের পরিকল্পিত শ্বেতাঙ্গ এলাকা থেকে বিতাড়িত করা হয়। ১৯৫০ ও ১৯৮৬ সালে গ্রুপ এরিয়া অ্যাক্ট অনুযায়ী প্রায় ১৫ লাখ আফ্রিকানকে শহর এলাকা ছেড়ে গ্রামে গিয়ে বাস করতে বাধ্য করা হয়। সেখানে তারা নিপীড়ন ও দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করতে থাকে।


জাতীয়তাবাদীদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের সাথে দেশটিকে যোগ করেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী জ্যান ক্রিস্টিয়ান স্মাটস। যুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে জাতিসঙ্ঘ গঠিত হলে দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মানবাধিকার-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ঘোষণায় স্বাক্ষর করতে রাজি হলেন না। কেননা তখন তার দেশে প্রাধান্য ছিল বান্টু বা কালো আফ্রিকান, এশীয় ও অশ্বেতাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের প্রাধান্য। এই বর্ণবাদী নীতি বহাল রাখার জন্যই তিনি তাতে স্বাক্ষর করতে পারেননি।


দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৬১ সালে। কিন্তু তা কমনওয়েলথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেননা দেশটির বর্ণবাদী নীতির ব্যাপারে কমনওয়েলথ কঠোর আপত্তি জানিয়েছিল। শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যবাদী ন্যাশনাল পার্টি আরো তিন দশক শাসন চালিয়ে যায়। দলটি প্রথম ক্ষমতায় আসে ১৯৪৮ সালে।


১৯৬০ সালে শারপেসভাইলে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সময় ৭০ জন কালো মানুষকে হত্যা করা হয়। বর্ণবাদবিরোধী প্রধান সংগঠন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসকে (এএনসি) নিষিদ্ধ করা হয় এবং দলের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে ১৯৬৪ সালে গ্রেফতার করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কালো মানুষের প্রতিবাদ জোরালো হতে থাকে। ১৯৭৬ সালে কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত সোয়েটো শহরে অভ্যুত্থান শুরু হয়, যা অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের নির্মম দমন অভিযানে তখন প্রায় ৬০০ মানুষ নিহত হয়। এ দিকে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ১৯৬০ থেকে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ আরো জোরদার হয়। জাতিসঙ্ঘ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং অনেক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।


১৯৮৯ সালে পিডব্লিউ বোথার পরিবর্তে এফডব্লিউ ডি ক্লার্ক প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ শিথিল হতে থাকে। ডি ক্লার্ক এএনসি’র ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং নেলসন ম্যান্ডেলাকে ২৭ বছর পর কারাগার থেকে মুক্তি দেন।
১৯৯১ সালে ডি ক্লার্ক ও ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে একটি বহুবর্ণের ফোরাম গঠিত হয় কনভেনশন ফর ডেমোক্র্যাটিক সাউথ আফ্রিকা (সিওডিইএসএ) নামে এবং নতুন সংবিধান নিয়ে কাজ শুরু করে। ১৯৯৩ সালে অন্তর্বর্তী সংবিধান অনুমোদিত হয়। সে মতে বর্ণবাদের বিলোপ ঘটে এবং বহুবর্ণের সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা স্বীকৃতি পায়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বের সবচেয়ে নিবর্তনমূলক সমাজ থেকে গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ উত্তরণ ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ১৯৯৩ সালে ডি ক্লার্ক ও ম্যান্ডেলাকে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়।


১৯৯৪ সালের নির্বাচনে ম্যান্ডেলা ও তার এএনসি ব্যাপক বিজয় লাভ করে। এটা ছিল দেশের প্রথম বহুবর্ণের নির্বাচন। তবে নতুন সরকার ন্যাশনাল পার্টি থেকে ছয়জন ও ইনকাথা ফ্রিডম পার্টি থেকে তিনজন মন্ত্রী নেয়। উল্লেখ্য, ইনকাথা কালোদেরই সংগঠন। কিন্তু ন্যাশনাল পার্টির সাথে তাদের সখ্য ছিল। এ জন্য এএনসি’র সাথে তাদের সঙ্ঘাত হয়েছিল। নতুন সংবিধান পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয় ১৯৯৬ সালে।


১৯৯৭ সালে ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে গঠিত ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন ১৯৬০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে শুনানি শুরু করে এবং যারা অপরাধ স্বীকার করবে তাদের ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দেয়। ডি ক্লার্ক ও ম্যান্ডেলাসহ নেতারা তখন কমিশনের সামনে উপস্থিত হন। এভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে দক্ষিণ আফ্রিকা।


সরকার ও রাজনীতি
দক্ষিণ আফ্রিকার রয়েছে তিনটি রাজধানী শহর। তিনটির মধ্যে সবচেয়ে বড় কেপটাউন আইনসভার রাজধানী। প্রিটোরিয়া প্রশাসনিক ও ব্লোয়েমফন্টেইন বিচারিক রাজধানী। দক্ষিণ আফ্রিকার পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষের নাম ন্যাশনাল কাউন্সিল অব প্রভিন্সেস যা ৯০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়। নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য ৪০০। নিম্নকক্ষের সদস্যরা জনসংখ্যার ভিত্তিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। অর্ধেক সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় তালিকা থেকে, আর অর্ধেক প্রাদেশিক তালিকা থেকে। উচ্চকক্ষ গঠিত হয় প্রত্যেক প্রদেশ থেকে দশজন সদস্য নিয়ে। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যার তারতম্য বিবেচ্য নয়। প্রতি পাঁচ বছর পর নির্বাচন হয়। নিম্নকক্ষে সরকার গঠিত হয় এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হন প্রেসিডেন্ট।


১৯৯৪ সালে বর্ণবাদ বিলুপ্তির পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রাধান্য বজায় রেখেছে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বা এএনসি। তবে বর্ণবাদ চালু করেছিল যে ন্যাশনাল পার্টি, সেটার পুনর্গঠিত সংগঠন নিউ ন্যাশনাল পার্টি ২০০৫ সালের এপ্রিলে এএনসি’র সাথে একীভূত হয়ে যায়। ২০০৯ সালের নির্বাচনে এএনসি থেকে বেরিয়ে যাওয়া কংগ্রেস অব পিপল শতকরা ৭ দশমিক ৪ ভাগ এবং জুলু ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকারী ইনকাথা ফ্রিডম পার্টি শতকরা ৪ দশমিক ৬ ভাগ ভোট পেয়েছে। এএনসি’র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স পেয়েছে শতকরা ১৬ দশমিক ৭ ভাগ ভোট। ফলে এএনসি’র ভোটের পরিমাণ শতকরা ৭০ ভাগেই রয়ে গেছে, যা প্রথম থেকে ছিল।


পররাষ্ট্র ও সামরিক বিভাগ
বর্ণবাদ অবসানের পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আফ্রিকার অন্যান্য দেশের সাথে বিশেষ করে সাউদার্ন আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট কমিউনিস্টি (এসএডিসি) ও আফ্রিকান ইউনিয়নের সাথে সমন্বয় করে চলা। গত এক দশকে আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি সঙ্ঘাত নিরসনে দক্ষিণ আফ্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যেমন বুরুন্ডি, কঙ্গো, কমরোস ও জিম্বাবুয়ের সঙ্ঘাত। তা ছাড়া বর্ণবাদ অবসানের পর ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা আবার কমনওয়েলথে যোগ দেয়। প্রজাতন্ত্র হওয়ার আগে যখন ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকার নাম ছিল, তখন তা ছিল জাতিসঙ্ঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং জাতিসঙ্ঘ সনদের ভূমিকা লিখেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার তখনকার প্রধানমন্ত্রী জ্যান স্মাটস। দক্ষিণ আফ্রিকা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য ছিল ২০০৭ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত। ২০০৬ সালে বার্মা সরকারকে সমালোচনা করে আনা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ও ২০০৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সমালোচনার পাত্র হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা গ্রুপ সেভেনটি সেভেন-এর সদস্য এবং ২০০৬ সালে সভাপতি ছিল। তা ছাড়া সাউথ আটলান্টিক পিস অ্যান্ড কো-অপারেটিভ জোন, সাউদার্ন আফ্রিকান কাস্টমস ইউনিয়ন, ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন, ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড, জি টুয়েন্টি ও জিএইট প্লাস ফাইভের সদস্য।
সাউথ আফ্রিকান ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স বা দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে চারটি শাখায় বিভক্ত করা হয় সেনা, বিমান, নৌ ও মেডিক্যাল বাহিনী নামে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরক্ষা বাহিনী আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৯৭০-এর দশকে দেশটি পরমাণু কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং ১৯৭৯ সালে তা সম্ভবত আটলান্টিক মহাসাগরে পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। আফ্রিকার শুধু এ দেশটিই পরমাণু অস্ত্র নির্মাণে সফল হয়। তবে এ দেশটিই প্রথমে স্বেচ্ছায় পরমাণু কর্মসূচি বাদ দেয় এবং ১৯৯১ সালে পরমাণু বিস্তাররোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।


অর্থনীতি
কেপটাউন এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। জাতিসঙ্ঘের শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী দক্ষিণ আফ্রিকা একটি মধ্য আয়ের দেশ। এখানে রয়েছে প্রচুর সম্পদ। তেমনি এখানকার অর্থ আইন, যোগাযোগ, জ্বালানি ও যাতায়াতব্যবস্থা বেশ উন্নত। এখানকার স্টক এক্সচেঞ্জটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশটির একটি। ২০০৭ সালে জিডিপি’র দিক দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান ছিল ২৫তম। তবে বেকারত্বের হার অনেক বেশি এবং আয়ের বৈষম্য ব্রাজিলের প্রায় সমান। দক্ষিণ আফ্রিকা এ মহাদেশের সবচেয়ে বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারী দেশ। পর্যটনের জন্য দেশটি খুব প্রসিদ্ধ এবং রাজস্বের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে পর্যটন খাত থেকে।


আফ্রিকার দেশগুলো ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকার বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের সাথে। প্রধান রফতানি দ্রব্য খাদ্যশস্য, হীরক, ফল, স্বর্ণ, ধাতব ও খনিজ দ্রব্য, চিনি ও উল। আমদানির এক-তৃতীয়াংশজুড়ে থাকে যন্ত্রপাতি ও যানবাহন। অন্যান্য আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে কেমিক্যাল সামগ্রী, উৎপাদিত পণ্য ও পেট্রোলিয়াম।


কৃষি
দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষি খাত অত্যন্ত উন্নত। কৃষিপণ্য এখানকার অন্যতম উল্লেখযোগ্য রফতানি দ্রব্য। সারা দেশে প্রায় এক হাজার কৃষি সমবায় ও কৃষি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং গত পাঁচ বছরে কৃষিজ রফতানি ছিল মোট রফতানির ৮ শতাংশ। কৃষি শিল্পে প্রায় ১০ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়। তবে আফ্রিকার অন্যান্য অংশের চেয়ে তা কম। জিডিপিতে কৃষির অবদান শতকরা ২ দশমিক ৬ ভাগ। অবশ্য অনুর্বরতার কারণে মাত্র শতকরা সাড়ে তের ভাগ জমিতে কৃষিকাজ করা যায়। মাত্র ৩ শতাংশ জমি অতি উর্বর।


মিশ্রজাতির দেশ
বিচিত্র সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ও নৃতত্ত্বের পাঁচ কোটির বেশি জনসংখ্যা দক্ষিণ আফ্রিকায়। সবশেষ আদমশুমারি হয় ২০০১ সালে। এরপর হবে ২০১১ সালে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাসিন্দাদের পাঁচটি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীতে ভাগ করা হয়। ২০০৬ সালের মাঝামাঝি প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী কালো আফ্রিকান ৭৯ দশমিক ৫, সাদা ৯ দশমিক ২, অশ্বেতাঙ্গ আফ্রিকান ৮ দশমিক ৯ এবং ভারতীয় বা এশীয়দের পরিমাণ শতকরা ২ দশমিক ৫ ভাগ। বিগত দশকে প্রধানত অভিবাসনের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার জনসংখ্যা বাড়লেও ২০০৮ সালে এখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল .৫০১ শতাংশ (অভিবাসনসহ)। এখানে প্রায় ৫০ লাখ অবৈধ অভিবাসী রয়েছে। এদের প্রায় ৩০ লাখ জিম্বাবুয়ে থেকে আসা। এ জন্য মে ২০০৮ সাল থেকে এখানে বেশ কয়েকটি অভিবাসীবিরোধী দাঙ্গা হয়েছে।


সমাজ ও সংস্কৃতি
দক্ষিণ আফ্রিকার বাসিন্দাদের নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের কারণে এখানে কোনো একক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। খাদ্যের বৈচিত্র্যই পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণের বিষয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার কালো বাসিন্দারা এখনো বেশির ভাগই বাস করে গ্রামে। এরা প্রায়ই দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটায়। অবশ্য বর্তমানে প্রচুরসংখ্যক কালো মানুষ শহুরে হয়ে উঠছে। ফলে ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি থেকে তারা পশ্চিমা সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছে। শহুরে লোকরা ইংরেজিতে কথা বলে। তবে তাদের নিজস্ব ভাষাও রয়েছে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রায় পুরোটা শ্বেতাঙ্গ। ইদানীং কালোরা তাতে যুক্ত হচ্ছে দ্রুতগতিতে। তেমনি অশ্বেতাঙ্গ ও ভারতীয় বা এশীয়রাও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।


শিক্ষা
বর্ণবাদের সময় কালো মানুষরা শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতো। এখন সে অবস্থা নেই। এখানে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ইংরেজির পাশাপাশি স্থানীয় ভাষায়ও শিক্ষাদান করা হয়ে থাকে। শিক্ষা খাতে জিডিপি’র ব্যয় প্রায় শতকরা ৫ দশমিক ৪ ভাগ।


ভাষা
বহু ভাষার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। এগারোটি ভাষা সরকারিভাবে স্বীকৃত। আরো আটটি ভাষা বেসরকারিভাবে স্বীকৃত। তবে ইংরেজি সাধারণভাবে শিক্ষা ও দাফতরিক কাজে ব্যবহৃত হয়।


ধর্ম
২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এখানকার শতকরা ৭৯ দশমিক ৭ ভাগ মানুষ খৃষ্টান। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর মধ্যে রয়েছে মুসলিম ১ দশমিক ৫ শতাংশ, হিন্দু ১ দশমিক ৩ শতাংশ। শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম অনুসরণ করে না।
ঔপনিবেশিক যুগের আগে এখানে ইসলাম তেমন পরিচিত ছিল না। তবে অশ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানদের মধ্যেই মুসলমান বেশি। এদের পূর্বপুরুষরা এক সময় ইন্দোনেশিয়া থেকে এখানে দাস হিসেবে আসে বলে জানা যায়। অন্য মুসলমানরা প্রধানত ভারত থেকে আগত। তবে ইসলাম এখানকার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম। কালো মুসলমানদের সংখ্যা ১৯৯১ সালে ছিল মাত্র ১২ হাজার। ২০০৪ সালে তা ছয় গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৭৪ হাজার ৭০০।