স্বপ্নভ্রমণ - ৩ জেরুসালেম

Jan 08, 2017 10:27 am



বু ল বু ল স র ও য়া র

ধর্মের যে বিষয়গুলো রহস্যপূর্ণজ্জতা যুক্তিতে মেলে না বলেই অস্বীকার করার সহজ প্রবণতা আমাদের মজ্জাগত। পাশ্চাত্যবাসী এই বিষয়টি প্রাচ্যবাসীর মতো দেখে না। তারা এটাকে এড়িয়ে থাকলেও তাদের মধ্যে অস্বীকারের উন্মাদনা নেই। আমরা কেন জানি না, বেশি উন্নাসিক। কত কিছুই তো জীবনে যুক্তি মেনে চলে নাজ্জতাই বলেই কি তা মিথ্যা? শুধু আমার জ্ঞানে ‘সিদ্ধ’ নয় বলেই কি সব রহস্য ‘বুজরুকি’? নিশ্চয়ই নয়।


ফেরাউনের আমলে মিসরীয় জাদুবিদ্যা পৃথিবীতে যে বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল, তা কি এখনো কেউ পারে? পিরামিডের কত রহস্য, মায়া সভ্যতার কত সিম্বল, এখনো ইউএফওর মতো রহস্যাবৃত নয় কি? আমি না বুঝলেই যদি সব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে হয় তাহলে যে আগামী বলেই কিছু থাকে না! ভাবতে ভাবতে আমি সল-এর কুয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। অপ্রশস্ত ও অন্ধকার সিঁড়ির মুখ তালাবদ্ধ। বাইরে থেকে শুধু অস্পষ্ট সিঁড়ির ছায়া দেখা গেল। আমি কৌতূহলী হয়ে আরো মাথা ঝাঁকিয়ে দিতে চাইলাম গারদের ভেতর। পেছন থেকে আমার কলার টেনে ধরল সিকিউরিটি।


ঘোরের মধ্য থেকে আমি যেন বাস্তবে ফিরে এলাম। ভুলেই গেছিলাম যে এটা ইজরাইল এবং তার প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ‘বেয়াদবি’ করার চেষ্টা করছি আমি। আমার শরীরে সহসাই শীতল স্রোত বয়ে গেল। আমি নেমে এলাম লাল কার্পেটের পোর্টিকোয়।
গ্রুপে গ্রুপে মানুষ ঢুকছে। শ্রদ্ধা জানাচ্ছে এবং দোয়া পড়ছে। বোঝার উপায়ই নেই যে কে মুসলিম, আর কে খ্রিষ্টান। সবার মুখেই পরম কৌতূহল আর অপার বিস্ময়। বিশেষত পাহাড়ের চূড়া অর্থাৎ কালো পাথর যার নামেই ডোম-অব-রক নাম তা যেন পর্যটককে জাদু করে ফেলে। বলা হয়, এই পাথর থেকেই স্বর্গের দূরত্ব হ্রস্বতম। ইহুদি রাব্বি গতকাল আমায় সরল কণ্ঠেই বলছিলেন : নাহলে তোমাদের নবী মোহাম্মদও এ-পথ দিয়েই যাবেন কেন?


আমি বোবা হয়ে যাই তার যুক্তিতে। সত্যিই তো, বোরাক বেঁধে রাখার খুঁটি পর্যন্ত যেখানে বিদ্যমান যার মধ্যে আবার রশি ঢোকানোর ছিদ্র পর্যন্ত আছে তাকে আমি অস্বীকার করি কোন্ সাহসে?
আবু সুফিয়ানের ঘটনাটা আমার মনে পড়ল। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস যিনি পুরো বিশ্বের অর্ধেক রাজত্বের দাবিদার তার দরবারে গিয়ে পৌঁছেছে দীনহীন এক বেদুইন-আরব। হাতে ক্ষুদ্র এক পত্র। লিখেছেন আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ। জাজিরাতুল আরবের অচেনা নগরী ‘মক্কা’ থেকে। সেই ‘সাধারণ’ লোকের দাবি শুধু অভাবিতই নয়, আশ্চর্যও বটে। দাহিয়া কালবি জানতেন, এই দ্যূতিয়ালির বিপদ। সত্যের দাওয়াত বহনকারী কত বাহককেই না দাম্ভিক রাজা বাদশারা হত্যা করেছে।


সামনে এসে দাঁড়াল আবু সুফিয়ান। নবী মুহাম্মদের নিকটতম আত্মীয়। ব্যবসা করছিলেন সিরিয়া, লেবানন, জর্দান ও ‘ইলিয়া’য় (জেরুসালেমে)। পরাক্রমশালী স¤্রাট হেরাক্লিয়াস জানতে চাইলেন, কে আছো তোমাদের মধ্যে এগিয়ে এসো যে নবী দাবিকারী মুহাম্মদ-বিন-আবদুল্লাহর সবচেয়ে নিকটজন।
সন্ত্রস্ত আবু সুফিয়ান সামনে এলেন।
তুমি তাকে কতটুকু চেন?
যতটুকু আমি আমার হাতকে চিনি, জাঁহাপনা।
সে কি ওয়াদা ভঙ্গকারী?
না, সম্রাট।
সে কি মিথ্যেবাদী?
প্রায়ই না, শুধু ধর্মবিশ্বাস ছাড়া।
কী বলতে চায় সে?
এক আল্লাহর বন্দেগি আর নামাজ।
সে কি ক্ষমতালোভী?
এখন পর্যন্ত না।
তোমাদের সাথে তার যুদ্ধ হয়েছে?
জি জাঁহাপনা।
কারা জেতে?
কখনো আমরা, কখনো সে।
তার বংশমর্যাদা কী?
সে উচ্চবংশীয়, সম্রাট।
সে ছাড়া তোমাদের মধ্যে আর কেউ নবী দাবি করেছে?
আমার জানা নেই, জাঁহাপনা।
তার পূর্বপুরুষ কেউ কি রাজা ছিল?
না।
কারা তাকে অনুসরণ করছে দরিদ্র, নাকি অভিজাত?
দরিদ্ররাই বেশি।
তাদের সংখ্যা বাড়ছে না কমছে?
বাড়ছে। দ্রুতই বাড়ছে।
তার অনুসারীদের কেউ কি দলত্যাগ করেছে?
না, সম্রাট।
সম্রাট স্বগতোক্তির মতো করে চিঠিটা আবার পড়লেন হে কিতাবধারীগণ, বিশ্বাস করো সেই বাণীতে : যার উৎস একই এবং পৌত্তলিকতায় লিপ্ত হয়ো না। মান্য করো না অন্য ‘অংশ’ এবং ‘অনুগত’ হও...।
সম্রাটের গম্ভীর-উচ্চারণে সভাসদদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল এবং আতঙ্কিত আবু সুফিয়ান ভাবলেন : এই হলুদ চামড়ার স¤্রাটও যদি মুহাম্মদকে ভয় পায়, আমাদের আর রক্ষা নেই...।

আমি আবারো সল-এর কুয়ার সামনে দাঁড়াই। এটি কি ইতিহাসের সেই সল, নাকি আত্মার ইংরেজি শব্দ সৌল। বেশির ভাগ ঐতিহাসিকেরা আত্মার মিথকেই সত্য মনে করে। জেরুসালেমবাসী আরো বলে : এটাই পৃথিবীর কেন্দ্র দুটি পাহাড়ি দাঁতালের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা প্রস্তরীভূত জিহবা। একটি খেজুরগাছের মতো দাঁড়িয়ে কোটি কোটি আত্মার আর্তনাদকে ধারণ করে যেন কিয়ামতের যে বিচার বসবে এই কিপাত-হাসেলায় (কুব্বাত আস ছাখরায়) তখন যেন মুক্তি পাওয়া যায় ইব্রাহিম ও মুহাম্মদের জননীদের আশিসে এমনই তাদের দাবি।
নানা রেওয়াতে বর্ণিত এই কাহিনী আমার মনকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়ে গেল। সলের কুয়ার রহস্য আজ-অব্দি গোপনই রয়ে গেছে। সেই আবু সুফিয়ানের অন্তরে কী ছিল তা আমরা জানি না, কিন্তু তার সন্তানদের অনেক কিছুই আমরা জানি। জানি, এই ডোম-অব-রক গড়েছেন তারই বংশধররা যা আজো পৃথিবীকে বিস্মিত করে রেখেছে এবং সুদূর চীনকেও টেনে এনেছে ভিন্ন-গ্রহ থেকে হারানো মানিক খুঁজে পেতে। অভিভূত আমার চোখ ভিজে গেল আবেগে।

সম্রাট জাস্টিনিয়ানের (৫২৭-৫৬৫) ষষ্ঠ পুরুষ হেরাক্লিয়াসের ছিল অসাধারণ স্মরণশক্তি এবং জ্ঞানপিপাসা। যে চিঠি মূলত লেখা হয়েছিল বসরার শাসকের উদ্দেশ্যে সে-চিঠি বন্ধু ও গভর্নর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তার কাছে যিনি তখন জেরুসালেমে। সম্ভবত তিনিই ছিলেন শেষ রেমান সম্রাট যিনি ল্যাটিন ভাষাও জানতেন। সুতরাং চিঠির মাধ্যমে আগত নবী-দাবিকারী উম্মী মুহাম্মদকে যাচাই না করে তার উপায় ছিল না। তাই তিনি নির্দেশ ছিলেন, ও দিককার কাউকে পেলে নিয়ে এসো।


সৌভাগ্যক্রমেই, নবী মুহাম্মদের নিকটাত্মীয় এবং বংশ অহমিকায় দাম্ভিক আবু সুফিয়ানই সেই ব্যক্তি যাকে হাজির করা হয়েছিল জেরুসালেমের দরবারে এবং তিনি নিজেও বিব্রত ছিলেন সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে। নানা সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে আবু সুফিয়ান দুলছিলেন প্রকট সন্দেহে যদি সত্য কথা বলি, তাহলে মুহাম্মদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়; আর যদি মিথ্যা বলি, দলের কাছে আর গোত্রপতির সম্মান থাকে না। কারণ চিরাচরিত বেদুইন স্বভাবের সাথে মিথ্যার সম্পর্ক ততটুকু সূর্যের তাপের সাথে শিশিরের সম্পর্ক যতটুকু।
এই মাউন্ট টেম্পলের সামান্য উত্তরে জাফা গেট থেকে একটু পুবে ছিল স¤্রাটের প্রাসাদ। ইহুদিরা তখনো বিতাড়িত। অনেকে লুকিয়ে আছেন ব্যাবিলন থেকে দামেস্ক পর্যন্ত এলাকার আনাচে-কানাচে। দু’চারটি পরিবার রয়েছে জেরুসালেমের আশেপাশে। কিন্তু না আছে তাদের প্রভাব, না ধর্ম। তাদের তোরাহও উপেক্ষিত। অথচ এই তোরাহ নিয়েই গড়া হয়েছে বাইবেলের প্রধান অংশ যার নাম পুরাতন নিয়ম। কিন্তু যাদের কিতাব থেকে এসব নেয়া হয়েছে তাদেরই পাত্তা নেই।
আমি সল-এর কুয়ায় আবার নজর বুলাই। কিছু সিঁড়ির আভাস স্পষ্টই চোখে পড়ে। আসার আগে দেখেছি ওখানেও ঢোকা যায়। নামাজও পড়ে লোকে। এমনকি শুনেছি ওখানে একটি প্রাকৃতিক মিম্বারও আছে এবং বিস্ময়করভাবে তা দক্ষিণমুখী অর্থাৎ মক্কার দিকে মুখ করা।
কেউ কেউ বলেন, এটা ছিল আসলে সোলেমানের অস্ত্রাগার। কারো মতে গোপন সম্পদের ভাণ্ডার। তো সে যা-ই হোক, এই বিস্ময়কর গুহাতেই জমা হয় পৃথিবীর সব মানবাত্মা সপ্তাহে কিংবা মাসে এক দিন আর তারা সব নবীকে শ্রদ্ধা জানায় এ রকম হাজারো মিথ জেরুসালেমের সর্বত্র বিরাজমান। না এতে কেউ সন্দেহ করে, না কারো অবিশ্বাস প্রতিধ্বনি তোলো আক্রোশের। আর যে শহর বয়ে বেড়ায় প্রাচীনতম মানবসভ্যতার ইতিবৃত্ত তার দেয়াল তো হওয়া উচিত এমনই সহনশীল। কোন্ ধ্বনির কততম প্রতিধ্বনি তুলবে সে তা বোঝা দুই-দুইয়ে চার মেলানো তার্কিকের কাজ হলেও, সত্যানুসন্ধানীর কাজ হতে পারে না।


পরে দেখেছি, মাত্র ৫ ফিট বাই ৮ ফিট সেই গুহার আরো অনেক রহস্য। কারো মতে, এর ওপর ঝুলন্ত পাথর আসলে ভূমি থেকে উৎক্ষিপ্ত পবিত্র পদচিহ্ন, যা মুহাম্মদের সাথেই যেতে চেয়েছিল ঊর্ধ্বাকাশে অনুমতি পায়নি বলে একটু উঁচুতে স্থির হয়ে আছে। কারো মতে, এখানেই সেই বিচারালয় বসবে এবং এই পাথরই হবে ‘চূড়ান্ত বিচারকের আসন’। কেউ বলেন, এই ছোট্ট এক ফালি শূন্যের মধ্যেই ছিল সেই অন্ধকার যা থেকে সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বভুবন।
যা-ই হোক, স্থানটির পেছন দিকে রয়েছে দুটো আলাদা খুপড়ি উত্তরে পাশেরটি হজরত ইব্রাহিমের নামে আর তার পশ্চিম পাশেরটি হজরত খিজিরের।

খিজিরের রহস্য আমি আজো বুঝে উঠতে পারিনি। আরবিতে শব্দটি এসেছে আল আখদার বা ‘সবুজ’ থেকে। যদিও মিথ প্রতিতুলনা করলে মনে হয় ইরানের ‘সোরাছ’, প্যালেস্টাইনের ‘জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট’, গিলগামেশের ‘হাচ্ছিত্র’ কিংবা ভারতীয় ‘বিষ্ণুর’ সাথেও হজরত খিজিরের মিল। কিন্তু সমগ্র মুসলিম বিশ্বে খিজিরকে প্রায় ‘নবী’র মর্যাদায় দেখা হয়। কারণ আঠারোতম সুরা (কাহাফ-এ) খিজিরকে বর্ণনা করা হয়েছে মুসা-নবীর চেয়েও জ্ঞানবান হিসেবে। চিত্তাকর্ষক এ গল্পটি প্রায় সবারই জানা যে দুনিয়ার সবচেয়ে জ্ঞানী কে? এ প্রশ্নের জবাবে মুসা বললেন : আমি যা আল্লাহ পছন্দ করেননি। সুতরাং সূত্রপাত হলো আল্লাহরই নির্দেশে সেই ‘জ্ঞানী ব্যক্তি’, যার নাম খিজির তার কাছেই দীক্ষা নেয়ার পালা। অনুতপ্ত মুসার সাথী হলো ‘ইউশা’। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে মৃত মাছের জীবিত হওয়া এবং সমুদ্রে গমন দেখেও ইউশা ঘটনা বলতে ভুলে গেলেন ঘুম-থেকে-ওঠা মুসাকে। এক দিন পরে সে কাহিনী শুনে মুসা ফিরে এলেন আগের স্থানে এবং সাক্ষাৎ পেলেন আলোকপ্রাপ্ত খিজিরের...।


আমি আত্মার কূপে দাঁড়িয়ে একা একাই হেসে উঠি। এখান থেকেই ছাদে উঠে গেছে একটি ফোকর যার পাশে সিঁড়ি আছে বলে মনে হয়। জেরুসালেমের অগণিত রহস্যের মতো এখানেও আছে খিজিরের ঘর এবং আমি নিজের আত্মার দিকে ‘আঙুল’ তুলে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করে পারি না যে, খিজিরও কি তাহলে প্যালেস্টাইনি? আমার গাইড অবলীলায় উত্তর দিলো : নিশ্চয়ই। দুই সমুদ্রের মিলনস্থান তো সিনাইয়ের শেষ বিন্দুতে; আর কোথায়? মন বলছিল তাকে বলি, কেন সেটা তো হতে পারে জিব্রাল্টার কিংবা কন্যাকুমারী কিন্তু পবিত্র স্থানের ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট হওয়ার ভয়ে একটি কথাও উচ্চারণ করলাম না। একবার এক উদারপন্থী কেরলের ধর্মগুরু হিন্দু দেবতা বিষ্ণুকেই ‘খিজির’ বলে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন আমাকে এবং তার সপক্ষে কোরানের বর্ণনাও তুলে ধরেছিলেন। আমি হতবাক হয়ে শুনেছিলাম তার কথা এবং বোম্বের হাজী আলী দরগায় বসে ভাবছিলাম যে জগতের ধর্মগুরুদের প্রায় সবাই ত্যাগে ও কর্মে প্রায় অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাদের ‘মালিকানা’ নিয়ে টানাটানির কমতি নেই।


হজরত খিজিরের কাহিনী কোরানে যেভাবে এসেছে এবং হাদিস কর্তৃক ব্যাখ্যাত হয়েছে তাতে তার পরিচয় অনুধাবন করা সত্যিই কষ্টকর। যেমন, আমার কায়রোর সেই রুমমেট আরতাক আমাকে নিশ্চিতভাবেই বুঝিয়ে দেয় নূহ নবী আর্মেনিয়ার নবী আর তার নৌকা সফর শেষও হয়েছে পর্বত আরারাতে। আমি তাকে যতই বলি হিমালয় তো শুধু ভারতের নয় নেপাল, চীন, পাকিস্তান এমনকি আফগানিস্তানেরও তাতে হিস্যা আছে ততই সে ক্রুদ্ধ হয়ে বলে, আরবরা আমাদের ইতিহাস চুরি করেছে আর তোমরা অন্ধভাবে তাকেই অনুসরণ করছো।
এ এক অসমাপ্ত বিতর্ক। খ্রিষ্টান, ইহুদি এবং সিরাতে ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুসারেও হজরত আদমের জন্ম খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার বছরের দিকে হওয়ার কথা। অথচ তারও প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ভারতের মধ্যপ্রদেশে, দশ হাজার বছর আগে স্পেনের আলতামিরা এবং পঁয়ত্রিশ হাজার বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের গুহায় আঁকা নানা ছবি বিশেষত গরু, হরিণ এবং মানুষের নানা ভঙ্গিমার খোদাই চিত্র বা অঙ্গারচিত্র এখনো দৃশ্যমান।
প্রশ্ন কেউ করতেই পারে যে আদমই কি তাহলে প্রথম মানুষ নাকি, এই সভ্যতার প্রথম?
তো সেই হজরত খিজিরের গুহা এখানে থাকার কারণ, তিনি কানানাইটদের নবী এবং ইসরাইলিদেরও এমন দাবির মুখে আমি নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করি। হাজার বিতর্ক, লক্ষ কূটতর্ক আর শর্তসহ যুদ্ধের পরেও যে ডোম-অভ-রকের নিচে অনন্ত রহস্যময় ‘ওয়েল-অব-সোলস’-এ আমি এসে দাঁড়াতে পেরেছি সেই তো অনেক।


ডোম-অভ-রকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আমি ভাবি এর আশ্চর্য ইতিহাস। মানবজাতীর প্রাচীনত্বই তাকে অহঙ্কারী করে, নাকি মানুষ গর্বোদ্ধত হয় পরাক্রমে আমার কাছে তা পরিষ্কার নয়। তবে যেকোনো সভ্যতার নিচে অর্থাৎ অতীত ঘাঁটলে মানুষ যা পায় তাকে কিংবদন্তি বলা হোক কিংবা মিথ পেছনে একটা সত্য থাকেই। পরিবর্তন যদি খুব দ্রুততার সাথে ঘটে, তাহলে এটিকে আমরা বলি গুজব; একটু ধীরে ঘটলে কিংবদন্তি; আর অনেক পুরুষ পরে মিথ। কিন্তু যতই সময়ের সাথে তা বিকৃত হোক না কেন রাজার ছেলে হাতির কান নিয়ে জন্মাক কিংবা ঘোড়ার কান নিয়ে তার যে একটা ছেলে হয়েছিল তা তো আর মিথ্যে নয়। বাঙালির হাসির গল্পে ছয় আর সাত তেরো, নামালাম তিন; হাতে রইলো এক সেই ‘হাতের এক’ বড় বউর হোক বা না হোক, কোথাও তো নিশ্চয়ই রাখতে হয়; নইলে পরের গণনা মিলবে কী করে?


বিজ্ঞানের সাথে এখানেই বিশ্বাসের সংঘর্ষ। যেমন আমার মনে প্রশ্ন জাগল এরপর হেরাক্লিয়াস কী করলেন? সেই যে দাহিয়া কালবির বয়ে আনা পত্র যা বসরার গভর্নর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ভ্রমণরত সম্রাটের কাছে জেরুসালেমে; কারণ তিনিই ছিলেন বাইজেন্টিয়াম-স¤্রাটের প্রতিনিধি এবং যা ছিল পরিষ্কার সতর্কীকরণ। কেন, মহাপ্রতাপশালী রোম-সম্রাট সেই গজিয়ে ওঠা ধুম্রকুণ্ডলী দেখেও চুপ করে বসে রইলেন?


না। তা তিনি করেন নি। বরং জ্যোতিষশাস্ত্রে গভীর আস্থাশীল হেরাক্লিয়াস ফিরে গেলেন সিরিয়ার হোমস শহরে যা তার আরেকটি প্রাদেশিক রাজধানী। যাওয়ার আগে তিনি তার আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে সব জানিয়ে চিঠি লিখলেন রোমে। সেই বন্ধুও ছিলেন জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এবং স¤্রাট তাকে জানান তার অদ্ভুত স্বপ্নের কথা রাতে যা তিনি দেখেছিলেন আকাশের তারামণ্ডল বিচার করার পর যে খৎনা করা জাতীর মধ্যেই পৃথিবীর নেতা আবির্ভূত হয়েছেন। বিষয়টি তাকে ভয়ানক বিচলিত করলেও যাজকরা এই বলে তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে যে এত শুধু ইহুদিদের মধ্যে চলে। সুতরাং সব ইহুদির সন্তানকে জবাই করলেই তো সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু অন্তর্দর্শী সম্রাট উপমা টানলেন মুসার এবং ইসার। ঠেকানো গেছে সেই নবীদের বিজয়?


দরবারিরা চুপ করে রইলে তিনি বললেন যাও; দেখে আসো ওই আরব দল যার নেতা আবু সফিয়ান তাদের অবস্থা কী?
কোটাল ও পাইক-পেয়াদারা ছুটল আবার সেই কাফেলাকে ধরে আনতে। দেখা গেল তাদের অনেকেই সারকামসাইজড অথচ তারা কোনো নবীর অনুসারী নন। ইহুদিও নন।
তাহলে কারা? কাদের মধ্যে আসছেন তিনি?
আবু সুফিয়ান জানালেন তার গোত্রের কথা। আদিকাল থেকেই যেখানে খৎনার প্রথা চালু রয়েছে। এমনকি নারীদের মধ্যেও।
আর কেউ এটা করে?
সম্ভবত ওপারের লোকেরা করে জানাল আবু সুফিয়ান।
ওপার মানে?
ওপার মানে আবিসিনিয়া, সম্রাট। নাজ্জাসির রাজ্য।
আরব কাফেলাকে মুক্তি দিলেন হেরাক্লিয়াস, কিন্তু তার মনের দ্বিধা কাটল না। তাই বিশ্বস্ত বন্ধুর কাছে রোমে চিঠি পাঠিয়ে পথ ধরলেন হোমসের।
ইবনে আল নাতুন তখন জেরুসালেমের গভর্নর। তিনি একান্তে জানতে চাইলেন : হে স¤্রাট, আমাদের করণীয় কী হবে?
সম্রাট সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে বললেন, হে নাতুর যখন তুমি বিভ্রান্ত হওয়ার মতো ধোঁকায় পড়বে; নিজের অন্তরের কাছে নতজানু হও। বুদ্ধিমান লোকেরা তাই করে।
অরোনটাছ নদীর সেই সময়কার নাম ছিল নহর আল-আচ্ছি। আচ্ছি মানে বিদ্রোহী। ঐতিহাসিকরা জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে এটাই একমাত্র নদী যার প্রবাহ দক্ষিণ থেকে উত্তরে তাই এর নাম বিদ্রোহী। নামে যা-ই হোক না কেন, সে তার বাঁকে বাঁকে স্থান দিয়েছে নানা ঐতিহাসিক নগরীকে যেমন হোমস যা এখনো সিরিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম নগরী আর ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভূমধসাগর থেকে একমাত্র এই নদী ধরেই ঢোকা যায় সিরিয়া-জর্দান-তুরস্কে। আর এ নগরীর নারীদের সৌন্দর্যের খ্যাতি এত ভুবনভোলানো যে বিশাল বাইজেটিয়াম সাম্রাজ্যের রানী হয়েছিলেন হোমসের চার সুন্দরী জুলিয়া দোম্মা, জুলিয়া সেইসা, জুলিয়া মাম্মেয়া ও জুলিয়া সোমিয়া। পাশের পালমিরা-ও সমান খ্যাতিমান যার শাসক (রোমের) রানী জেনোবিয়াও ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন নানা বিস্ময়কর কীর্তিকলাপের জন্য এবং যিনি সম্রাট অর্লিয়ানের কাছে পরাজিত হয়ে রাজ্য হারিয়েছিলেন খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের শেষার্ধে।
সেই যা-ই হোক, হোমসের আরেকটি খ্যাতি বিশ্ববিশ্রুত এবং কিছুটা করুণও বটে। ইতিহাসের সর্বোচ্চ বীর খালিদ বিন ওয়ালিদ এখানেই তার জীবনের শেষ সাতটি বছর নীরব অভিমানে কাটিয়ে দেনযার নামে প্রতিষ্ঠিত খালিদ-বিন-ওয়ালিদ মসজিদ এখনো হোমসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।